বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের নতুন অধ্যায়: যখন রাষ্ট্রযন্ত্রই সন্ত্রাসের আশ্রয়দাতা

Share

পাকিস্তানের মাটিতে তেহরিক-ই-তালেবানের হয়ে লড়াই করতে গিয়ে বাংলাদেশি তরুণদের একের পর এক মৃত্যু আর গ্রেফতারের খবরগুলো আসলে একটা বিশাল সত্যের ছোট্ট প্রকাশ মাত্র। আসল ভয়ংকর বিষয়টা হলো, যে দেশে এই জঙ্গি নেটওয়ার্ক বছরের পর বছর ধরে তাদের শিকড় গেড়ে বসেছিল, সেই দেশেরই রাষ্ট্রক্ষমতা এখন দখল করে বসে আছে ঠিক একই ধরনের মতাদর্শে বিশ্বাসী একটা গোষ্ঠী। আর এটা কোনো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নয়, এটা খোদ পুলিশের নথি আর সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের নির্মম বাস্তবতা।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে যা ঘটেছে, সেটাকে যতই ছাত্র আন্দোলন বলে চালানোর চেষ্টা করা হোক না কেন, ঘটনার পেছনের আসল শক্তিগুলো এখন আর লুকানো নেই। একটা নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করার জন্য পরিকল্পিত দাঙ্গা, যেখানে বিদেশি অর্থায়ন ছিল, ইসলামি জঙ্গি সংগঠনগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল, আর নিরাপত্তা বাহিনীর একাংশের নীরব সমর্থন ছিল। ফলাফল কী দাঁড়ালো? ক্ষমতায় এসে বসলেন মুহাম্মদ ইউনূস, যার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে জামায়াতে ইসলামী আর তাদের সমমনা জেহাদি সংগঠনগুলো। যে মানুষটা নোবেল পুরস্কার পাওয়া অর্থনীতিবিদ হিসেবে খ্যাতি পেয়েছিলেন, তিনি এখন হয়ে গেছেন এমন একটা ক্যু সরকারের মুখ, যার অবৈধতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগই নেই।

পুলিশের মামলার এজাহারে যে তথ্যগুলো উঠে এসেছে, সেগুলো পড়লে গা শিউরে ওঠার কথা। ইঞ্জিনিয়ার ইমরান হায়দার নামের এক ব্যক্তি বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশ থেকে টিটিপির জন্য জনবল সংগ্রহ করে গেছেন। প্রকাশ্যে বায়তুল মোকাররমের সামনে ব্যানার টাঙিয়ে মুজাহিদ সংগ্রহের ঘটনা ঘটেছে এই দেশে। জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্কীয়ার মতো সংগঠন, যাদের সরাসরি আল-কায়েদার সাথে যোগসূত্র আছে, তারা নির্বিঘ্নে কাজ করে গেছে। এসব ঘটনা কি রাতারাতি ঘটেছে? না। এগুলো সম্ভব হয়েছে কারণ এই দেশে এমন একটা রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, যেখানে জঙ্গিবাদের আদর্শিক সমর্থকরা নিজেদের শক্তি সঞ্চয় করার সুযোগ পেয়েছিল।

জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা নিয়ে আলাদা করে বলার কিছু নেই। এই সংগঠনটার ইতিহাস তো সবারই জানা। একাত্তরে গণহত্যায় অংশ নেওয়া যুদ্ধাপরাধীদের সংগঠন, যারা কখনোই বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে মন থেকে মেনে নেয়নি। তারা স্বপ্ন দেখে এক ধরনের ইসলামি খিলাফতের, যেখানে আধুনিক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কোনো স্থান নেই। আর এখন জুলাইয়ের ঘটনার পর তারা পেয়ে গেছে নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুবর্ণ সুযোগ। প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের লোক বসানো হয়েছে, শিক্ষা ব্যবস্থায় তাদের প্রভাব বাড়ছে, আর যে সংগঠনগুলো আগে আন্ডারগ্রাউন্ডে কাজ করতো, তারা এখন একরকম খোলামেলা তৎপরতা চালাতে পারছে।

মজার ব্যাপার হলো, যে সামরিক বাহিনীর কথিত নিরপেক্ষতার আড়ালে এই পুরো ক্যু সম্পন্ন হলো, তারা কিন্তু জানতো এর পেছনে কারা আছে। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোকে তথ্য দিয়ে আসছিল টিটিপি নেটওয়ার্ক সম্পর্কে। কিন্তু সেই তথ্যের ভিত্তিতে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার বদলে কী হলো? জুলাইয়ে যখন দেশজুড়ে দাঙ্গা হচ্ছিল, যখন সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র চলছিল, তখন নিরাপত্তা বাহিনীর একাংশ নীরব দর্শক হয়ে রইলো। কেউ কেউ তো সরাসরি সহযোগিতাই করলো।

এখন যে সরকার ক্ষমতায় বসে আছে, তার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানেই রাষ্ট্রদ্রোহী হয়ে যাওয়া। মুহাম্মদ ইউনূস, যিনি ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে গরিব মানুষকে আরও গরিব করার ব্যবসা করেছেন বছরের পর বছর, তিনিই এখন রাষ্ট্রের প্রধান উপদেষ্ঠা। আর তার পেছনে শক্তি জোগাচ্ছে জামায়াত আর তাদের সহযোগী সংগঠনগুলো। যে দেশে একসময় জঙ্গিবাদ দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হতো, সেই দেশে এখন জঙ্গিবাদের মদদদাতারাই রাষ্ট্রযন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করছে। এর চেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি আর কী হতে পারে?

টিটিপিতে যোগ দেওয়া বাংলাদেশি তরুণদের গল্পগুলো শুনলে বোঝা যায় কতটা সুসংগঠিতভাবে এই নেটওয়ার্ক কাজ করছে। ওমরাহর নামে সৌদি আরব যাওয়া, সেখান থেকে পাকিস্তান, তারপর আফগানিস্তান। প্রাথমিক প্রশিক্ষণ বাংলাদেশেই দেওয়া হয়, তারপর বাছাই করা লোকদের পাঠানো হয় পাকিস্তানে। আর এই পুরো প্রক্রিয়াটা চলছিল বছরের পর বছর ধরে। যারা এই কাজ করছিল, তাদের মধ্যে কেউ কেউ তো পুলিশের হাতে আগেও ধরা পড়েছিল, আবার ছাড়া পেয়ে গিয়ে আবার একই কাজে লেগে গেছে।

এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কী? যে দেশে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে বসে আছে জঙ্গিবাদের আদর্শিক সমর্থকরা, সেই দেশে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কতটুকু? যে নামসর্বস্ব রাজনৈতিক দল আর সুদখোর মহাজনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা জামায়াতের মতো সংগঠনগুলো এখন প্রকৃত ক্ষমতাধর, তারা তো নিজেদের শক্তিশালী করার জন্য জঙ্গি নেটওয়ার্কগুলোকে আরও বেশি ছাড় দেবে, এটাই স্বাভাবিক। আর সামরিক বাহিনী, যারা এই পুরো প্রক্রিয়ায় সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে, তারা কি এখন হঠাৎ করে জঙ্গিবাদ দমনে সক্রিয় হয়ে উঠবে? সেটা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই।

বিদেশি অর্থায়ন নিয়ে আলাদা করে বলার দরকার আছে। এই ধরনের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পেছনে বিদেশি শক্তির হাত থাকে, এটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু যখন সেই বিদেশি অর্থায়ন জঙ্গিবাদের সাথে যুক্ত সংগঠনগুলোর মাধ্যমে আসে, তখন বিষয়টা আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। জুলাইয়ের দাঙ্গার পেছনে যে টাকা খরচ হয়েছে, সেই টাকা কোথা থেকে এসেছে? কারা সরবরাহ করেছে সেই অর্থ? আর কেনই বা তারা এমন একটা পরিবর্তন চেয়েছিল যেখানে জামায়াতের মতো সংগঠন ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসবে?

এখন বাংলাদেশ এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে রাষ্ট্রযন্ত্রই হয়ে উঠেছে জঙ্গিবাদের আশ্রয়দাতা। যে পুলিশ আগে জঙ্গি ধরতো, তাদেরই এখন নির্দেশ আসছে এমন সরকারের কাছ থেকে, যার পেছনে রয়েছে জঙ্গিবাদের মদদদাতারা। বিচার ব্যবস্থা, প্রশাসন, শিক্ষা, সবকিছুতেই ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ছে এই মতাদর্শের প্রভাব। আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এই পুরো প্রক্রিয়াটা চলছে একরকম খোলাখুলিভাবেই। কারণ যারা এর বিরুদ্ধে কথা বলার কথা, তারা হয় নীরব, নাহয় তাদের নীরব করে দেওয়া হচ্ছে।

পাকিস্তানের মাটিতে মরে যাওয়া দুজন বাংলাদেশি তরুণের ঘটনা আসলে একটা বিশাল সমস্যার ক্ষুদ্র নমুনা। আসল সমস্যা হলো বাংলাদেশে এখন যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে এই ধরনের ঘটনা শুধু বাড়বে, কমবে না। যতদিন জামায়াতের মতো সংগঠনগুলো ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকবে, ততদিন জঙ্গিবাদ বিস্তার লাভ করবে। আর যে অবৈধ সরকার এখন ক্ষমতায় আছে, তারা তো এই বিস্তারে বাধা দেওয়ার কোনো ইচ্ছাই রাখে না, বরং উল্টো তারাই এর সুবিধাভোগী।

এই দেশের মানুষ কি জানে যে তাদের রাষ্ট্রক্ষমতা এখন কাদের হাতে? সুদী মহাজন আর জঙ্গিবাদের মদদদাতাদের হাতে। যে দেশ একসময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করতো, সেই দেশেই এখন ক্ষমতায় আছে যুদ্ধাপরাধীদের সংগঠন আর তাদের সহযোগীরা। এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে?

আরো পড়ুন

সদ্য প্রকাশিত