Friday, January 30, 2026

ওসমান হাদী: কুখ্যাত জুলাই দাঙ্গাবাজ থেকে জামায়াতের কাল্ট ফিগার তৈরির গল্প

Share

ওসমান হাদীর মৃত্যুর পর যে জোয়ার এসেছে, তাতে ভেসে যাওয়াটাই এখন সবচেয়ে সহজ। কিন্তু কিছু প্রশ্ন তো থেকেই যায়। যে মানুষটা সারাজীবন মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করে গেলেন, যুদ্ধাপরাধীদের শহীদ বলে প্রচার করলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটা গেইট চার রাজাকারের নামে নামকরণের দাবি তুললেন, তাকে নিয়ে এই যে হৈচৈ, এর পেছনের রাজনীতিটা কী? সংসদ ভবনের সামনে জানাজা, নজরুলের পাশে সমাধি, এসবের আয়োজনটা যে নিছক ব্যক্তির প্রতি সম্মান নয়, সেটা বোঝার জন্য খুব বেশি বুদ্ধির দরকার নেই।

জামায়াতে ইসলামীর একটা সমস্যা ছিল দীর্ঘদিন। তাদের কোনো নেতাই জনপ্রিয় কাল্ট ফিগার হয়ে উঠতে পারেননি। গোলাম আযম থেকে শুরু করে মতিউর রহমান নিজামী, সবাই ছিলেন বিতর্কিত। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়ানোর কলঙ্ক তাদের প্রত্যেকের গায়ে লেগে আছে। মানুষ ভুলতে চায়নি, ভুলতে দেয়নি। কিন্তু ওসমান হাদী ছিলেন ভিন্ন ধাঁচের। তিনি সরাসরি রাজনীতি করেননি, করেছেন ওয়াজ। ইসলামের নামে যা বলেছেন, মানুষ তাই শুনেছে। তার বক্তব্যের ভেতরে যে বিষ লুকিয়ে ছিল, সেটা অনেকেই ধরতে পারেননি। কিংবা ধরতে চাননি।

এই লোক কখনো ভারতের বিরুদ্ধে কথা বলতে ক্লান্ত হননি, কিন্তু পাকিস্তানের ব্যাপারে একেবারে নীরব। ১৯৭১ সালে যারা এই দেশের মানুষকে হত্যা করেছে, যারা নারীদের ধর্ষণ করেছে, তাদের প্রতি তার কোনো ক্ষোভ নেই। বরং যারা ওই নরহত্যায় সহায়তা করেছে, তাদেরকে তিনি শহীদ মনে করতেন। ২০১৩ সালে গণজাগরণ মঞ্চ যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে শাহবাগে জড়ো হলো, তখন ওসমান হাদী গড়ে তুললেন ইনকিলাব মঞ্চ। এই মঞ্চের উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার, যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে জনমত তৈরি করা। রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের বিধান রাখার দাবি জানানো, যেন কাদের মোল্লার মতো যুদ্ধাপরাধীরা ফাঁসি থেকে বেঁচে যেতে পারে।

এই সবকিছু জানা সত্ত্বেও তার মৃত্যুর পর যে মহাসমারোহ হলো, সেটা দেখে অবাক হতে হয়। মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটা বড় অংশ, যারা নিজেদের শিক্ষিত মনে করেন, তারাও তার জানাজায় অংশ নিলেন। সামাজিক মাধ্যমে তাকে নিয়ে প্রশংসার বন্যা বয়ে গেল। এই ঘটনাটা আসলে একটা সফল রাজনৈতিক প্রজেক্টের ফলাফল। জামায়াত বুঝেছিল যে সরাসরি রাজনীতি করে তারা জনপ্রিয় হতে পারবে না। তাই তারা ধর্মের আবরণে একটা মানুষকে গড়ে তুলেছে, যিনি তাদের আদর্শকে ছড়িয়ে দেবেন কিন্তু নিজে দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকবেন। এবং সেই প্রজেক্ট পুরোপুরি সফল হয়েছে।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে যা ঘটল, সেটা কোনো স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থান ছিল না। এটা ছিল সুপরিকল্পিত একটা অভিযান। বিদেশি অর্থায়ন ছিল, জঙ্গি সংগঠনের সহায়তা ছিল, সামরিক বাহিনীর একাংশের মদদ ছিল। নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা হলো। ক্ষমতায় বসানো হলো মুহাম্মদ ইউনূসকে, যিনি সুদ নিয়ে ব্যবসা করেছেন দরিদ্র মানুষের ঘাড়ে চেপে। আর তার পাশে দাঁড় করানো হলো জামায়াতে ইসলামীকে, যে সংগঠন ১৯৭১ সালে এই দেশের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল।

এই পুরো ঘটনার সাথে ওসমান হাদীর সম্পর্ক কী? সম্পর্কটা গভীর। তিনি যে আদর্শ প্রচার করেছেন, তা জামায়াতের আদর্শ। তিনি যে ইতিহাস অস্বীকার করেছেন, তা জামায়াতের ইতিহাস। তার মৃত্যুকে কাজে লাগিয়ে জামায়াত তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করেছে। তরুণ প্রজন্মের একটা অংশকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। যারা হয়তো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ঠিকমতো জানে না, তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে যে ১৯৭১ সালের যুদ্ধ আসলে ভারতের ষড়যন্ত্র ছিল, পাকিস্তান ভাঙার জন্য একটা চক্রান্ত ছিল।

এই বিষয়ে যে একটা পরিকল্পনা আছে, সেটা বোঝা যায় প্যাটার্ন দেখলে। রবীন্দ্রনাথকে ঠেকাতে নজরুলকে দাঁড় করানো হয়, যদিও নজরুল নিজেই রবীন্দ্রনাথের ভক্ত ছিলেন। আরজ আলী মাতুব্বরকে ঠেকাতে আরিফ আজাদকে জনপ্রিয় করা হয়, যদিও আরজ আলী ছিলেন প্রকৃত মুক্তচিন্তার মানুষ। বেগম রোকেয়াকে ছোট করতে কখনো আয়েশা সিদ্দিকা, কখনো ফয়জুন্নেসাকে সামনে আনা হয়। একাত্তরকে ঠেকাতে চুয়াত্তরকে মহিমান্বিত করা হয়। এই সবই একই ধরনের কৌশল, যা বারবার প্রয়োগ করা হচ্ছে।

ওসমান হাদী সেই কৌশলের একটা অংশ। তাকে দিয়ে জামায়াত এমন একটা কাল্ট তৈরি করেছে যা তাদের রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে বহুগুণ। শুধু তাই নয়, সেক্যুলার শক্তির বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে এই সুযোগে। প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানট, এগুলো যে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু এখন এদের বিরুদ্ধে এমন একটা বিদ্বেষ তৈরি হয়েছে যে মানুষ এগুলোকে শত্রু মনে করে। এই বিদ্বেষটা কোথা থেকে এলো? কারা তৈরি করলো? উত্তরটা সহজ, যাদের স্বার্থে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ধ্বংস দরকার, তারাই করেছে।

এখন যে স্রোত বইছে, তার বিরুদ্ধে কথা বলাটা সহজ নয়। যে মানুষ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কথা বলবে, তাকে ভারতের দালাল বলা হবে। যে মানুষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাইবে, তাকে বলা হবে আওয়ামী লীগের লেজুড়। এই পরিস্থিতিতে চুপ করে থাকাটাই নিরাপদ। কিন্তু চুপ করে থাকলে তো সত্যটা চাপা পড়ে যাবে। তাই যতটুকু সম্ভব, বলতে হবে। লিখতে হবে। মানুষকে জানাতে হবে যে যা হচ্ছে, তা কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। এটা একটা রাজনৈতিক চাল, যার মাধ্যমে এই দেশের ইতিহাসকে বদলে দেয়ার চেষ্টা চলছে।

ওসমান হাদীর মৃত্যু স্বাভাবিক হতে পারে, কিন্তু তার মৃত্যুকে ঘিরে যে রাজনীতি হচ্ছে, সেটা মোটেও স্বাভাবিক নয়। যে মানুষ মুক্তিযুদ্ধকে স্বীকার করতেন না, তাকে জাতীয় বীরের মর্যাদা দেয়া হচ্ছে। যে মানুষ যুদ্ধাপরাধীদের শহীদ বলতেন, তার জানাজা হচ্ছে সংসদ ভবনের সামনে। এই সবকিছুর পেছনে একটা স্ক্রিপ্ট আছে, একটা পরিকল্পনা আছে। এবং সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী ওসমান হাদীর মৃত্যুও ছিল একটা ধাপ।

এখন প্রশ্ন হলো, যারা এই সত্যটা জানেন, তারা কী করবেন? চুপ করে বসে থাকবেন, নাকি কথা বলবেন? বলতে গেলে বিপদ আছে, সেটা ঠিক। কিন্তু না বললেও তো বিপদ আছে। যদি এভাবেই চলতে থাকে, তাহলে আগামী প্রজন্ম জানবে না যে ১৯৭১ সালে আসলে কী হয়েছিল। তারা জানবে না যে মুক্তিযুদ্ধ কী ছিল, কেন ছিল। তারা জানবে বিকৃত ইতিহাস, যেখানে যুদ্ধাপরাধীরা শহীদ, আর মুক্তিযোদ্ধারা ভারতের দালাল। এই বিকৃতিটা ঠেকাতেই হবে। যে কোনো মূল্যে।

তাই যতটুকু সম্ভব, বলতে হবে। সাধারণ মানুষের ভাষায়, সহজ করে। যাতে সবাই বুঝতে পারে। এই লেখাটাও সেই চেষ্টারই একটা অংশ। জানি না কতটা কাজে লাগবে। হয়তো অনেকে পড়বেন না। যারা পড়বেন, তাদের অনেকেই হয়তো মানবেন না। কিন্তু অন্তত চেষ্টা করা যায়। চুপ করে বসে না থেকে অন্তত কিছু তো বলা যায়। কারণ এভাবে চুপ করে থাকলে ইতিহাস ক্ষমা করবে না।

আরো পড়ুন

সদ্য প্রকাশিত