ইউনূসের সহায়তায় জঙ্গিঘাঁটিতে পরিণত হচ্ছে বাংলাদেশে

Share

আবারও জঙ্গিঘাঁটিতে পরিণত হচ্ছে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। আর এর পেছনে রয়েছে আমেরিকান পরিকল্পনা। বাস্তবায়ন করছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস। সম্প্রতি আফগান তালেবান সরকারের শীর্ষ নীতিনির্ধারক মোল্লা নুর আহমদ নুর ওরফে মোল্লা জাওয়ান্দি এক সপ্তাহ ধরে ঢাকায় অবস্থান করছেন এবং বিভিন্ন কওমি মাদ্রাসা ও ব্যক্তিগত বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন। তবে তার সফর সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকার, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা আফগান দূতাবাস কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে অবগত নয় বলে জানিয়েছে।

সূত্র অনুযায়ী, তিনি খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হকসহ কয়েকজন আলেম ও রাজনীতিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং নিষিদ্ধ সংগঠন হুজির সন্দেহভাজন নেতাদের উপস্থিতিও লক্ষ্য করা গেছে। তার সফর ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকি ও কূটনৈতিক জটিলতার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে আসন্ন নির্বাচন, অস্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ভারত–পাকিস্তান–আফগানিস্তান সম্পর্কের টানাপড়েনের প্রেক্ষাপটে।

বাংলাদেশ–আফগানিস্তান চেম্বার অব কমার্সের চেয়ারম্যান আবু সায়েম খালেদ তাকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানান এবং তার উদ্যোগে একটি সমাবেশও হয়, যেখানে হুজি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতির অভিযোগ উঠেছে। সব মিলিয়ে, অনুমতি ও স্বচ্ছতা ছাড়া এমন একজন তালেবান নেতার বাংলাদেশ সফর দেশীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিতে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।

এই পরিস্থিতির মধ্যে কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদে বিস্ফোরণে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া মাদ্রাসা থেকে দুটি তৈরি বোমা, পাঁচটি ইলেকট্রিক বোমা সদৃশ বস্তুসহ বোমা তৈরির প্রচুর উপকরণ উদ্ধার হওয়ার তথ্য দিয়েছে পুলিশ। মামলার বিষয়ে প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে রোববার আদালতে পুলিশ বলেছে, বিস্ফোরণের আগের ‘রাতজুড়ে বসে বসে বোমা বানিয়েছেন মাদ্রাসাটির পরিচালক শেখ আল আমিন’। সূত্র বলছে, ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের দিকে এখন চোখ পুরো বাংলাদেশের। আর এই সুযোগে দেশের জঙ্গি কার্যক্রম আরও শক্ত করার পাঁয়তারা করা হচ্ছে।

রাজধানী ঢাকায় মাথায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার কয়েক দিন পর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র এবং ছাত্র আন্দোলনের নেতা শরীফ ওসমান হাদি। তার এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গুরুতর অভিযোগের সৃষ্টি হয়েছে। ওসমান হাদির ভাই শরীফ ওমর হাদি সরাসরি বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দিকে আঙুল তুলেছেন। তার দাবি, আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্ধারিত জাতীয় নির্বাচন ভণ্ডুল করতেই এই সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, ওসমান হাদিকে হত্যার মূল পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে জামায়াত। সূত্র মতে, গত মাসের শেষের দিকে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পারওয়ারের ছেলে সালমান ওসমান হাদির সাথে তার ঘাতকের পরিচয় করিয়ে দেন।

সূত্র বলছে, ওসমান হাদি মূলত পাকিস্তানের আইএসআই এজেন্ট ছিলেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের শীর্ষ নেতা ছিলেন। তার নির্বাচন কেন্দ্রিক অর্থায়নও করেছিল জামায়াত নেতা ড. মাসুদ। অভিযোগ উঠেছে, মার্কিন নির্দেশেই জামায়াত তাদের এই এজেন্টকে হত্যা করেছে যাতে দেশজুড়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা যায়। হাদির মৃত্যুর পর দুটি সংবাদমাধ্যমে আগুন দেওয়া হলেও সেনাবাহিনী বা জাতিসংঘ কোনো উচ্চবাচ্য করেনি। উল্টো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দেশজুড়ে চলা এই মব বা ধ্বংসযজ্ঞে প্রচ্ছন্ন সমর্থন দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

কেন বাংলাদেশে ভোট চায় না আমেরিকা? বিশেষজ্ঞদের মতে, ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার মূলত যুক্তরাষ্ট্রের একটি দীর্ঘমেয়াদী ভূ-রাজনৈতিক নীলনকশার অংশ। আমেরিকা চায় বাংলাদেশ যেন তাদের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির (আইপিএস) অনুসারী হয়ে চীনের প্রভাব মোকাবিলা করে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মিয়ানমারে চীন-সমর্থিত গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে কৌশলগত অবস্থান নিতে মরিয়া।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে একটি ‘খ্রিস্টান রাজ্য’ গঠনের ষড়যন্ত্রের আশঙ্কাও জোরালো হচ্ছে, যা পূর্ব তিমুরের ঘটনার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সতর্ক করেছিলেন যে, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের অংশ নিয়ে এমন একটি রাষ্ট্র গঠন এবং বাংলাদেশে মার্কিন এয়ার বেজ স্থাপনের প্রস্তাব এসেছিল।

একাধিক সূত্রের দাবি, নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে এই ষড়যন্ত্রে ‘প্রক্সি নেতা’ হিসেবে ব্যবহার করছে আমেরিকা। তাকে জাতিসংঘ মহাসচিব করার প্রলোভন দিয়ে পশ্চিমা স্বার্থ রক্ষায় ব্যবহার করা হচ্ছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই বাংলাদেশে অস্থিরতা সৃষ্টি, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পে বাধা এবং মিয়ানমারের বিদ্রোহীদের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশে আগামী বছর সংঘাতের আগাম শঙ্কা জানিয়ে রেখেছে আমেরিকান থিঙ্ক ট্যাংক কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (সিএফআর)। তাদের প্রিভেন্টিভ প্রায়োরিটি সার্ভে ২০২৬ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে টায়ার–৩ বা মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় রাখা হয়েছে, যেখানে আগামী বছরে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সহিংসতার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করা হয়েছে।

সিএফআর-এর মতে, জাতীয় নির্বাচন বিলম্ব বা স্থগিত হওয়া, শাসনতান্ত্রিক সংকট এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর জনগণের আস্থাহীনতা বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। এই শূন্যতার সুযোগ নিয়ে ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠী সক্রিয় হলে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঝুঁকি বাড়বে।

রাজনৈতিক অস্থিরতা অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে—বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগ, তৈরি পোশাক শিল্প ও সরবরাহ ব্যবস্থায়। পাশাপাশি মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ ও রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। প্রতিবেদনটি মূলত মার্কিন নীতিনির্ধারকদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে তৈরি হলেও এতে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি ইঙ্গিত দেয় যে, দেশটির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিকভাবে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

জুলাইতে জঙ্গি তৎপরতা ফের প্রমাণিত

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নামে এক ষড়যন্ত্রের টোপ দিয়েছিল জামায়াত ও বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন। আর তাতেই বাংলাদেশ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়। এই অভিযোগ এতদিন আওয়ামী লীগ করে আসলেও এখন সেটি দিবালোকের মতোই সত্য।

আজ রোববার জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন আট রাজনৈতিক দলের জোটে যুক্ত হয়েছে আরও দুটি রাজনৈতিক দল। নতুন যুক্ত হওয়া দল দুটি হচ্ছে– কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি) ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। আর এরমধ্য দিয়ে প্রমাণিত হলো জামায়াতে গুপ্ত অংশই ছিল এনসিপি। এরাই সেই রাজাকারের বংশধর যারা শেখ হাসিনার একটি বক্তব্যকে বিকৃত করে শিক্ষার্থীদেরকে ভুল বুঝিয়েছিল।

জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদেরের ফেসবুক স্ট্যাটাসে এ ঘটনা আরও স্পষ্ট হয়েছে। তিনি ফেসবুক পোস্টে লেখেন, আগস্টের ৫ তারিখ রাতে জামাত নেতার বাসায় মিটিং দিয়ে যেই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, সেটা আজকে এসে পূর্ণতা পাইছে। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় যারা নিরলস পরিশ্রম করেছেন, তাদেরকে জানাই অভিনন্দন। তবে নাহিদ ইসলাম’রা মানুষের আবেগ নিয়ে এইভাবে প্রতারণা না করলেও পারতেন।

এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবির নেতা বর্তমান ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম দাবি করেছেন, এই আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ, হাসনাত আবদুল্লাহ এবং সারজিস আলম শিবিরের সঙ্গে আলোচনা করে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেনও একই কথা বলেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, আন্দোলনের জনপ্রিয় স্লোগান “তুমি কে আমি কে রাজাকার রাজাকার” ছিল শিবিরের কনসেপ্ট থেকে উদ্ভূত, যা সরকারের সমর্থকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়। এই অভিযোগগুলো সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের উপর প্রশ্ন তোলে।

জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের পেছনে জামায়াতে ইসলামী, ড. মুহাম্মদ ইউনুস এবং আন্তর্জাতিক মহলের একটি গোপন ষড়যন্ত্র ছিল বলে দাবি করা হয়। তাদের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা। জামায়াতের ছাত্র সংগঠন শিবির এই আন্দোলনকে কাজে লাগিয়ে তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছে। ড. ইউনুসের নাম আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, যিনি আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিরোধে জড়িত ছিলেন।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দাবি ছিল সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার সংস্কার। এটি ২০২৪ সালের ১ জুলাই শুরু হয় এবং পরে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। নাহিদ ইসলাম দাবি করেন এটি ছিল সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। কিন্তু শিবিরের মতো জঙ্গি সংগঠনগুলো আন্দোলনকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করেছে। “তুমি কে আমি কে রাজাকার রাজাকার” স্লোগানটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে অপব্যবহার হিসেবে দেখা হয়, যা ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। শিবির ও জামায়াত সাধারণ শিক্ষার্থীদের আবেগকে কাজে লাগিয়ে সহিংসতা উসকে দিয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া সহিংসতা, জঙ্গিদের ভূমিকা দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এটি এক ভয়াবহ অধ্যায় যেখানে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন এবং বহিরাগত ষড়যন্ত্রের ছায়া জটিলভাবে মিশে আছে। দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও সার্বভৌমত্বের জন্য এটি গভীর সংকটের সূচনা করেছে।

আরো পড়ুন

সদ্য প্রকাশিত