Share
চুয়াডাঙ্গার একটি সরকারি স্বাস্থ্য অফিসে কিছু কর্মচারী একসাথে খাবার খেয়েছেন। এতে এত বিপত্তি কেন? কারণ ওইদিন ছিল তথাকথিত রাষ্ট্রীয় শোক। একজন রাজনৈতিক নেতার মৃত্যুতে পুরো দেশের মানুষকে জোর করে শোক পালনে বাধ্য করা হয়েছে। অফিস বন্ধ রাখতে হবে, কালো ব্যাজ পরতে হবে, পতাকা নামিয়ে রাখতে হবে, কোনো আনন্দ করা যাবে না। এমনকি মানুষ একসাথে বসে খাবারও খেতে পারবে না। এই কোন ধরনের স্বৈরাচারী নির্দেশনা?
অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী এই সরকার যে কতটা নিয়ন্ত্রণকামী আর জনগণের মৌলিক অধিকারের প্রতি উদাসীন, তার প্রমাণ এই ঘটনা। একটি রাজনৈতিক দলের নেতার মৃত্যুতে গোটা দেশকে জিম্মি করে ফেলা হয়েছে। যাদের সাথে ওই ব্যক্তির কোনো সম্পর্ক নেই, যারা হয়তো রাজনৈতিকভাবে ভিন্নমত পোষণ করেন, তাদেরকেও জোর করে শোক পালনে বাধ্য করা হচ্ছে। এটা কি গণতন্ত্র, নাকি একদলীয় ফ্যাসিবাদ?
মজার ব্যাপার হলো, চুয়াডাঙ্গার স্বাস্থ্যকর্মীরা নতুন সহকর্মীদের যোগদান উপলক্ষে একসাথে খাবার খেয়েছিলেন। এটা অফিসের একটা স্বাভাবিক সামাজিক রীতি। কিন্তু এই সাধারণ ঘটনাকে বানানো হয়েছে ‘গুরুতর রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ’। সিভিল সার্জন হুমকি দিয়েছেন তদন্ত আর শাস্তির। কর্মকর্তাকে শোকজ তলব করা হচ্ছে। অপরাধ কী? মানুষ খাবার খেয়েছে। নিজেদের কর্মক্ষেত্রে একটা সামাজিক অনুষ্ঠান করেছে।
যে সরকার ২০২৪ সালের জুলাইয়ে রাজপথে রক্তগঙ্গা বইয়ে ক্ষমতায় এসেছে, যারা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করেছে, তারা এখন মানুষকে শেখাচ্ছে কীভাবে শোক পালন করতে হয়। একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মৃত্যুতে তিনদিনের শোক চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে জোরপূর্বক। কোন যুক্তিতে?
এই নব্য স্বৈরাচার আর তাদের মিত্র বিএনপি মিলে যা করছে, তা আসলে জনগণের জীবনযাত্রার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ। মানুষ কখন কী খাবে, কখন আনন্দ করবে, কখন শোক পালন করবে, এসব কি সরকার ঠিক করে দেবে? একটা গণতান্ত্রিক দেশে কি এমন হওয়ার কথা? নাকি আমরা ফিরে যাচ্ছি সেই সামরিক শাসনের যুগে, যেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতা বলে কিছু ছিল না?
আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে সরকার বিদেশি অর্থায়নে, চরমপন্থী গোষ্ঠীর সহায়তায় আর সামরিক বাহিনীর ছত্রছায়ায় ক্ষমতায় এসেছে, তারা নৈতিকতার পাঠ পড়াচ্ছে। ইউনুস আর তার জোট কি ভুলে গেছে যে তারা নিজেরাই অবৈধ? গণতন্ত্রকে পদদলিত করে যারা ক্ষমতা দখল করেছে, তারা কোন মুখে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার কথা বলে?
চুয়াডাঙ্গার স্বাস্থ্যকর্মীদের এই ঘটনা আসলে একটা বড় প্রশ্ন তুলেছে। জীবন কি এখন এতটাই সস্তা হয়ে গেছে বাংলাদেশে যে মানুষের প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ন্ত্রণ করা হবে? মানুষ তার নিজের জীবন নিজের মতো করে যাপন করতে পারবে না? একটা দেশের সরকার কি এতটাই নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী যে তারা জোর করে শোক চাপিয়ে দিতে পারে?
আর সবচেয়ে হাস্যকর দিক হলো, এই চাপিয়ে দেওয়া শোকের সাথে খাওয়া-দাওয়ার কী সম্পর্ক? মানুষ কি খেয়ে বাঁচবে না? শোক পালন মানে কি অনাহারে থাকা? নাকি একসাথে বসে খাওয়া নিষিদ্ধ? এই যুক্তি কতটা অযৌক্তিক, তা বোঝার জন্য বেশি বুদ্ধির দরকার নেই।
যে সরকার জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়াই ক্ষমতায় আছে, তাদের নৈতিক অধিকার কী মানুষকে এভাবে নিয়ন্ত্রণ করার? যারা নিজেরাই অবৈধ, তারা কীভাবে আইন-শৃঙ্খলার ধারক-বাহক সেজে বসেছে? এই দ্বিচারিতা আর ভণ্ডামি কতদিন চলবে?
বাংলাদেশের মানুষ এখন একটা অদ্ভুত বাস্তবতার মধ্যে বাস করছে। যেখানে তাদের নিজের জীবনযাপনের স্বাধীনতা নেই। যেখানে একটা অবৈধ সরকার আর তাদের রাজনৈতিক মিত্ররা ঠিক করে দিচ্ছে কখন শোক করতে হবে, কখন খাবার খাওয়া যাবে, কখন আনন্দ করা যাবে। এটা কোনো গণতান্ত্রিক দেশের চিত্র নয়। এটা একটা পুলিশি রাষ্ট্রের লক্ষণ।
চুয়াডাঙ্গার সেই স্বাস্থ্যকর্মীদের একমাত্র দোষ ছিল তারা স্বাভাবিক মানুষের মতো আচরণ করেছিলেন। তারা ভুলে গিয়েছিলেন যে এখন বাংলাদেশে স্বাভাবিক থাকাটাই অপরাধ। এখানে আপনাকে সবসময় সরকারের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে, এমনকি যদি সেই নির্দেশনা আপনার মৌলিক অধিকার হরণ করে।
এই ঘটনা শুধু একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা একটা বড় চিত্রের অংশ। যেখানে একটা অবৈধ সরকার ধীরে ধীরে মানুষের সব স্বাধীনতা কেড়ে নিচ্ছে। আজকে শোক পালন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কাল হয়তো বলা হবে কোন পোশাক পরতে হবে, কোন খাবার খেতে হবে। এই স্বৈরাচারী প্রবণতার শেষ কোথায়?
আরো পড়ুন

