Friday, January 30, 2026

পিটার হাস, এক্সন মবিল আর একটি পরিকল্পিত ক্যু: কেন উৎখাত করা হলো শেখ হাসিনাকে?

Share

বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা জয় ছিল জনগণের সম্পদের ওপর জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই। ২০১০ সালে যখন এই প্রক্রিয়া শুরু হয়, তখন ভারত আর মিয়ানমার কেউই আন্তর্জাতিক আদালতে যেতে চায়নি। কারণ তারা জানত, এই সমুদ্রসীমা যদি বাংলাদেশের হাতে আসে তাহলে এই অঞ্চলে তাদের আধিপত্য টিকবে না। কিন্তু ২০১২ সালে মিয়ানমার আর ২০১৪ সালে ভারতের বিরুদ্ধে মামলায় জয়ের ফলে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের প্রায় ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটার সামুদ্রিক এলাকার ওপর সার্বভৌম অধিকার পেয়ে যায়। এই বিশাল সমুদ্র এলাকায় শুধু তেল-গ্যাস নয়, ইলমেনাইট, রুটাইল, জিরকনের মতো ভারী খনিজ বালু রয়েছে যা পুঁজিবাদী বাজারে কোটি কোটি ডলারের সম্পদ। গভীর সমুদ্রে গ্যাস হাইড্রেটের মজুত আছে যা বহুজাতিক তেল কোম্পানিগুলোর লোভের কেন্দ্রবিন্দু।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, সমুদ্রসীমা জয়ের বারো বছর পরেও কেন সেখান থেকে কিছু তোলা গেল না? কারণ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আর তাদের দালাল বহুজাতিক কোম্পানিগুলো চেয়েছিল এই সম্পদের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ। তারা চায়নি যে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে স্বচ্ছ বিডিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই কাজ করুক। তারা চেয়েছিল আনসলিসিটেড চুক্তি, যেখানে জনগণের সম্পদের ওপর তাদের একচেটিয়া দখল থাকবে।

২০১৫ সালে যখন ২৬টি অফশোর ব্লক ঘোষণা করা হলো, তখন থেকেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের চর কনোকোফিলিপস আর ইউরোপীয় পুঁজির দালাল স্ট্যাটঅয়েল বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করল। তারা জানত এই সম্পদ যদি জনগণের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে তাদের লুটপাট বন্ধ হয়ে যাবে। ২০১৭ সালে তারা সরে যাওয়ার নাটক করল। আসলে তারা অপেক্ষা করছিল কখন বাংলাদেশের জনগণের সরকারকে উৎখাত করে তাদের পছন্দের দালাল সরকার বসানো যাবে।

এদিকে বাংলাদেশ সরকার ধাপে ধাপে এগিয়ে যাচ্ছিল। ২০১৮ সালে সিসমিক সার্ভে, ২০১৯ সালে প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্র্যাক্টের সংস্কার, ২০২১ সালে নতুন মডেল চুক্তি, ২০২২ সালে নিলাম ঘোষণা। প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে স্বচ্ছভাবে এই সম্পদ উত্তোলনের জন্য। ২০১৮ সালে মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল চালু হলো, যেটা ছিল সমুদ্র থেকে সম্পদ উত্তোলনের অবকাঠামোর প্রথম ধাপ। পেট্রোবাংলা ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট ক্ষমতার আরেকটি টার্মিনাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সবকিছু প্রস্তুত হয়ে যাচ্ছিল। জনগণের সম্পদ জনগণের হাতে আসার পথ পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছিল।

কিন্তু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এটা মেনে নিতে পারেনি। এক্সন মবিল এসেছিল ৩০ বিলিয়ন ডলারের প্রলোভন নিয়ে। কিন্তু তাদের শর্ত ছিল, কোনো বিডিং হবে না, কোনো প্রতিযোগিতা হবে না। তারা একাই সব ব্লকে কাজ করবে। ৩০ বিলিয়ন ডলার মানে শুধু অর্থ নয়, এর মানে হলো মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, এর মানে হলো বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বিলিয়ে দেওয়া, এর মানে হলো জনগণের সম্পদকে সাম্রাজ্যবাদী লুটেরাদের হাতে তুলে দেওয়া। শেখ হাসিনা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে বিডিং করবে। যে সর্বোচ্চ দাম দেবে, সে কাজ পাবে। এটাই ছিল জনগণের স্বার্থ রক্ষার একমাত্র পথ।

২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে এক্সন মবিল বারবার তদবির করল। মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস প্রায় হুমকির সুরে চাপ দিল। কিন্তু শেখ হাসিনা বললেন, নির্বাচনের পরে কথা হবে। এপ্রিল-মে মাসে এসে তিনি চূড়ান্ত উত্তর দিলেন, এবং সেটা ছিল ‘না’। এই ‘না’ ছিল সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশের স্পষ্ট অবস্থান। এই ‘না’ মেনে নিতে পারেনি সিআইএ, মেনে নিতে পারেনি পেন্টাগন, মেনে নিতে পারেনি ওয়াশিংটনের যুদ্ধবাজ চক্র।

তারপরই শুরু হলো ষড়যন্ত্র। জুলাই ২০২৪-এ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল সুপরিকল্পিত সহিংসতা। এটা কোনো স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন ছিল না। এর পেছনে ছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অর্থায়ন, ছিল জামায়াত-শিবির ও অন্যান্য প্রতিক্রিয়াশীল জঙ্গি সংগঠনের সশস্ত্র তৎপরতা, ছিল সেনাবাহিনীর একটি অংশের সক্রিয় মদদ। এটা ছিল একটি পরিকল্পিত সামরিক অভ্যুত্থান, যার উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে একটি পুতুল সরকার বসানো। এবং সেই পুতুলের মুখ হিসেবে বেছে নেওয়া হলো ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে।

এই সুদী মহাজন, এই এনজিওবাজ বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবী, এই গ্রামীণ ব্যাংকের মালিক যিনি দরিদ্র মানুষের রক্ত চুষে সাম্রাজ্যবাদীদের কাছ থেকে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন, তাকে বসানো হলো অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে। ইউনূস কে? তিনি সেই ব্যক্তি যিনি মাইক্রোক্রেডিটের নামে দরিদ্র মহিলাদের ঋণের জালে আটকে তাদের শ্রম শোষণ করেছেন। তিনি সেই ব্যক্তি যিনি দারিদ্র্য দূরীকরণের কথা বলে দরিদ্রদের আরও দরিদ্র করেছেন। তিনি সেই ব্যক্তি যার গ্রামীণ ব্যাংক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও ইউরোপীয় পুঁজি কোটি কোটি ডলার মুনাফা তুলে নিয়ে গেছে। ইউনূস হলেন বুর্জোয়া শ্রেণীর প্রতিনিধি, যিনি গরিবের মুক্তির কথা বলে আসলে সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ রক্ষা করেন।

তার সাথে যুক্ত হয়েছে বিএনপি-জামায়াতে ইসলামি। বিএনপি, যে দল ক্ষমতায় এসে দেশের সম্পদ লুট করেছে, যাদের আমলে হাওয়া ভবন থেকে দেশ চলত, যাদের হাতে রক্তাক্ত হয়েছে হাজারো প্রগতিশীল মানুষ। জামায়াত, যে সংগঠন ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, যারা পাকিস্তানি হানাদারদের সাথে মিলে গণহত্যা চালিয়েছিল, যারা এখনও সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে মেহনতি মানুষকে বিভক্ত করে রাখতে চায়। এই প্রতিক্রিয়াশীল জোট এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদের চাবি হাতে পেয়েছে।

অভ্যুত্থানের পরপরই কী ঘটল? পিটার হাসের কোম্পানি মহেশখালীতে এলএনজি সরবরাহের কাজ বাগিয়ে নিল। এটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। পিটার হাস, যিনি ছিলেন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ প্রতিনিধি, যিনি বাংলাদেশে সিআইএ-এর তৎপরতা তদারকি করতেন, যিনি জুলাইয়ের দাঙ্গার অন্যতম রূপকার, তিনি এখনও মহেশখালীতে আছেন। দেশে যত অস্থিরতা, যত রক্তপাত, তিনি বাংলাদেশ ছাড়েননি। কারণ তার মিশন শেষ হয়নি। তার মিশন হলো বাংলাদেশের সমুদ্র সম্পদ মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া।

এই একই কায়দা সাম্রাজ্যবাদীরা প্রয়োগ করেছে ভেনিজুয়েলায়। প্রথমে বলেছিল মাদক চোরাচালান বন্ধ করতে হামলা করছে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে উৎখাতের চেষ্টা করার পর সব মুখোশ খুলে গেছে। এখন তারা খোলাখুলি বলছে ভেনিজুয়েলার তেল-গ্যাস খনি তাদের দখলে থাকবে। ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের মিথ্যা অজুহাতে হামলা করে তেলক্ষেত্র দখল করেছে। লিবিয়ায় গণতন্ত্র রক্ষার নামে গাদ্দাফিকে হত্যা করে দেশটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে, আর তেল লুট করে নিয়ে গেছে। আফগানিস্তানে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে বিশ বছর দখল করে রেখেছিল। বাংলাদেশেও একই খেলা চলছে।

এই সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কাছে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন সবই হলো ভেলকিবাজি। তাদের আসল উদ্দেশ্য হলো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর প্রাকৃতিক সম্পদ লুট করা। তারা জানে যে জনগণের সরকার থাকলে এই লুটপাট সম্ভব নয়। তাই তারা অভ্যুত্থান ঘটায়, পুতুল সরকার বসায়, আর তারপর চুক্তির নামে জনগণের সম্পদ লুট করে নিয়ে যায়। এক্সন মবিল চায় বাংলাদেশের সমুদ্র ব্লকে একচেটিয়া অধিকার। তারা চায় না কোনো বিডিং হোক, কারণ বিডিং হলে অন্য দেশের কোম্পানিও আসতে পারে, আর তাতে তাদের একচেটিয়া লুটপাট ব্যাহত হবে। তারা চায় আনসলিসিটেড চুক্তি, যেখানে বাংলাদেশ সরকার কোনো শর্ত আরোপ করতে পারবে না।

৩০ বিলিয়ন ডলার শুনতে অনেক টাকা মনে হলেও এটা আসলে একটা ফাঁদ। এই ৩০ বিলিয়ন দিয়ে তারা বাংলাদেশের সমুদ্রে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে। এর মানে হলো মার্কিন নৌবাহিনী বঙ্গোপসাগরে স্থায়ী উপস্থিতি। এর মানে হলো চীন ও ভারতের মধ্যে ভারসাম্যে মার্কিন হস্তক্ষেপ। এর মানে হলো বাংলাদেশকে মার্কিন সামরিক কৌশলের অংশ বানানো। এর মানে হলো দেশের সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেওয়া। আর সবচেয়ে বড় কথা, এই ৩০ বিলিয়ন থেকে যে তেল-গ্যাস তারা তুলবে, তার বাজারমূল্য হবে কয়েক লক্ষ কোটি ডলার। অর্থাৎ তারা ৩০ বিলিয়ন বিনিয়োগ করে তুলে নেবে শত শত বিলিয়ন ডলার। এটাই হলো সাম্রাজ্যবাদী লুটপাটের হিসাব।

ইউনূস এই চুক্তি স্বাক্ষর করেই ক্ষমতা দখল করেছে। একজন সুদী মহাজন, যিনি সারাজীবন গরিবদের শোষণ করে মুনাফা কামিয়েছেন, তিনি এখন পুরো দেশের সম্পদ বিদেশি পুঁজিপতিদের হাতে তুলে দিতে চলেছেন। বিএনপি-জামায়াত, যারা সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি করে, যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী, তারা এখন জনগণের সম্পদ লুটপাটের অংশীদার হতে চলেছে। এই অবৈধ সরকার, যে সরকারের কোনো গণভিত্তি নেই, যে সরকার সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে, তারা কী করে এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারে?

বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষ, কৃষক, শ্রমিক, মধ্যবিত্ত, যারা এই দেশের আসল মালিক, তাদের কোনো মতামত নেওয়া হয়নি। পার্লামেন্ট নেই, নির্বাচন নেই, গণতন্ত্র নেই। কিন্তু চুক্তি হচ্ছে। এটাই হলো বুর্জোয়া শাসনের চরিত্র। জনগণের সম্পদ লুটপাটের জন্য তাদের গণতন্ত্রের দরকার হয় না।

বাংলাদেশের প্রগতিশীল শক্তি, দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল, ট্রেড ইউনিয়ন, ছাত্র সংগঠন, সকলকে এখন ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এই সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। ইউনূস সরকার ও তার পৃষ্ঠপোষক মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মুখোশ খুলে দিতে হবে। জনগণকে বুঝিয়ে দিতে হবে যে তাদের সমুদ্র সম্পদ লুট হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। দেশকে মার্কিন উপনিবেশে পরিণত করা হচ্ছে।

ইতিহাস আমাদেরকে দেখিয়েছে, তৃতীয় বিশ্বের যেসব দেশে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তাদের পুতুল সরকার বসিয়েছে, সেসব দেশের জনগণ চরম দুর্দশার মধ্যে পড়েছে। ইরাকের জনগণ আজও যুদ্ধ ও ধ্বংসের মধ্যে বাস করছে। লিবিয়া ভেঙে টুকরো হয়ে গেছে। আফগানিস্তান ধ্বংস হয়ে গেছে। বাংলাদেশও কি সেই পথে যাবে? জনগণের সম্পদ কি লুট হয়ে যাবে আর জনগণ কেবল দেখে যাবে?

না। এই লুটপাট বন্ধ করতে হবে। বাংলাদেশের সমুদ্র সম্পদ বাংলাদেশের জনগণের। এই সম্পদ থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়ে দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থানের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। এই সম্পদ বিদেশি পুঁজিপতিদের মুনাফার উৎস হতে পারে না। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার দালাল ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিটি সচেতন নাগরিককে সোচ্চার হতে হবে।

সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম দীর্ঘ ও কঠিন, কিন্তু জনগণের শক্তি অপরাজেয়। যতদিন এই দেশে শ্রমজীবী মানুষ আছে, ততদিন সাম্রাজ্যবাদী লুটপাট টিকে থাকতে পারবে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হলে এই অবৈধ সরকার ও তার বিদেশি প্রভুদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে এখনই।

আরো পড়ুন

সদ্য প্রকাশিত