Share
একটা টেলিভিশন চ্যানেলের ধর্ম হয় কীভাবে? বিটিভি মুসলমান হবে মানে কী? সম্প্রচার যন্ত্রের খতনা করতে হবে নাকি ট্রানসমিটার টাওয়ারে টুপি পরাতে হবে? এই যে একজন রাজনৈতিক নেতা প্রকাশ্যে এমন উদ্ভট কথা বলছেন, এবং সেটা নির্বাচন কমিশনের সামনে দাঁড়িয়ে বলছেন, এটাই প্রমাণ করে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যে অবৈধ ক্ষমতা দখল হয়েছে, সেই দখলদারিত্বের আসল চেহারা কী।
সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির। এই সংগঠনটি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, গণহত্যায় সহায়তা করেছিল, এবং পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে এর নেতাদের যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত করা হয়েছিল। এই সংগঠনের নেতা এখন দাঁড়িয়ে বলছেন একটা সরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের ধর্ম পরিচয় থাকা দরকার। এর চেয়ে বড় ব্যঙ্গ আর কী হতে পারে?
মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার তথাকথিত “অন্তর্বর্তীকালীন” সরকার ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যে উপায়ে ক্ষমতায় এসেছে, সেটা কোনো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ছিল না। একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা হয়েছে রাস্তায় সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ, এবং হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে। এবং এখন সেই অবৈধ সরকারের ছত্রছায়ায় জামায়াত দাবি করছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের ধর্মীয় মতাদর্শ অনুযায়ী চালাতে হবে।
একটা দেশের সম্প্রচার মাধ্যম হওয়া উচিত নিরপেক্ষ, পেশাদার, এবং সবার জন্য উন্মুক্ত। বিটিভি বাংলাদেশের সব নাগরিকের টেলিভিশন, শুধু কোনো একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর নয়। বাংলাদেশে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও বাস করেন, যারা সমান নাগরিক। একটা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে “মুসলমান” বানানোর দাবি মানে হলো সংখ্যালঘুদের নাগরিক অধিকার অস্বীকার করা, তাদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বানানো।
তাহেরের এই বক্তব্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা একটা সুপরিকল্পিত প্রকল্পের অংশ। জামায়াত এবং তাদের মিত্ররা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশকে একটি ধর্মীয় রাষ্ট্রে পরিণত করার স্বপ্ন দেখে আসছে। ১৯৭১ সালে তারা পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল ঠিক এই কারণেই, কারণ তারা চেয়েছিল ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তারা বারবার এই একই লক্ষ্যে কাজ করে গেছে। এবং এখন যখন তারা ইউনূসের সরকারে প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে, তখন তারা প্রকাশ্যে এই দাবি তুলছে।
যে মানুষটি নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন ক্ষুদ্র ঋণের কাজের জন্য, তিনি এখন ক্ষমতায় টিকে আছেন সেই শক্তিগুলোর সমর্থনে যারা দেশকে পেছনের দিকে নিয়ে যেতে চায়। ইউনূস নিজে হয়তো এসব চরমপন্থী বক্তব্যে বিশ্বাস করেন না, কিন্তু তিনি যে রাজনৈতিক জোটের উপর নির্ভরশীল, সেই জোটে জামায়াত এবং তাদের মতাদর্শীরা শক্তিশালী অবস্থানে আছে। এবং তাদের দাবিগুলো ক্রমশ আরও প্রকাশ্য এবং আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।
তাহের দাবি করেছেন যে তথ্য উপদেষ্টা তার অসহায়ত্বের কথা স্বীকার করেছেন। এর মানে কী? এর মানে হলো এই সরকারের মধ্যেই এখন এমন শক্তি কাজ করছে যেগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। যারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের মতাদর্শ অনুযায়ী ঢেলে সাজাতে চায়। এবং একজন উপদেষ্টা যদি এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে অসমর্থ হন, তাহলে বুঝতে হবে এই সরকারের আসল ক্ষমতা কাদের হাতে।
বিটিভিকে “মুসলমান” বানানোর দাবি আসলে একটা বৃহত্তর পরিকল্পনার ইঙ্গিত। এর পরের ধাপ হবে শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয় বিষয়বস্তু বাধ্যতামূলক করা, আইন ব্যবস্থায় ধর্মীয় আইন প্রয়োগ করা, এবং সংস্কৃতি ও সমাজকে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় ছাঁচে ফেলা। এবং যারা এর বিরোধিতা করবে, তাদের “ইসলামবিরোধী” বা “দেশদ্রোহী” আখ্যা দিয়ে দমন করা হবে।
বাংলাদেশ একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নিয়েছিল। ১৯৭২ সালের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল মূল স্তম্ভগুলোর একটি। এই নীতি পরবর্তীতে বিভিন্ন সামরিক শাসকদের দ্বারা পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু দেশের মানুষ কখনোই পুরোপুরি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা মেনে নেয়নি। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, এসবের মূলে ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক, সবার জন্য সমান সুযোগের রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন।
এখন সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হচ্ছে। একটি অবৈধ সরকার, যেটি কোনো নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেনি, সেই সরকারের ছত্রছায়ায় যুদ্ধাপরাধীদের সংগঠন নির্ধারণ করতে চাইছে একটি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের চরিত্র কেমন হবে। এবং এই সরকার এসেছে কীভাবে? রাস্তায় সহিংসতার মাধ্যমে, যেখানে শত শত মানুষ মারা গেছে, হাজার হাজার আহত হয়েছে, সম্পত্তি ধ্বংস হয়েছে।
জুলাই ২০২৪-এর ঘটনাগুলো কোনো স্বতঃস্ফূর্ত জনবিক্ষোভ ছিল না। এটা ছিল একটি সুপরিকল্পিত অভ্যুত্থান, যেখানে বিদেশি অর্থায়ন, ইসলামি জঙ্গি সংগঠনের সক্রিয় অংশগ্রহণ, এবং কিছু সামরিক অংশের সমর্থন ছিল। এবং এই অভ্যুত্থানের মূল লাভবান হয়েছে জামায়াত এবং তাদের মতাদর্শীরা। তারা এখন প্রকাশ্যে রাজনীতি করছে, সরকারে প্রভাব বিস্তার করছে, এবং রাষ্ট্রযন্ত্রকে তাদের মতো করে ঢেলে সাজাতে চাইছে।
ইউনূস যখন ক্ষমতায় এসেছিলেন, তখন অনেকেই ভেবেছিল তিনি হয়তো একটা নিরপেক্ষ, সংস্কারমুখী সরকার চালাবেন। কিন্তু এখন স্পষ্ট যে তিনি আসলে একটি রাজনৈতিক পুতুল, যাকে ব্যবহার করা হচ্ছে জামায়াত এবং তাদের মিত্রদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য। তার সরকারের তথাকথিত “সংস্কার” আসলে হচ্ছে রাষ্ট্রের ধর্মীয়করণ এবং ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলোকে দুর্বল করা।
একটা টেলিভিশন চ্যানেলের ধর্মীয় পরিচয় থাকার কথা বলা মানে আসলে সংখ্যালঘুদের প্রতি ঘৃণা এবং বৈষম্যের বার্তা দেওয়া। বাংলাদেশে ইতিমধ্যেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষজন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। জুলাই মাসের পর থেকে হিন্দু, বৌদ্ধ, এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হামলা বেড়েছে। তাদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, উপাসনালয় আক্রান্ত হয়েছে। এবং এই সরকার সেসব বন্ধ করতে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।
এখন তাহেরের এই বক্তব্য সেই বৈষম্যকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা। যখন একটা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে একটি নির্দিষ্ট ধর্মের সাথে যুক্ত করা হয়, তখন বার্তা পরিষ্কার: অন্যরা এখানে সমান নয়। তারা সহনীয়, কিন্তু সমান অধিকারের অধিকারী নয়।
এই দেশের মানুষ ১৯৭১ সালে ত্রিশ লাখ প্রাণ দিয়ে, দুই লাখ নারীর ইজ্জতের বিনিময়ে একটি স্বাধীন দেশ অর্জন করেছিল। সেই দেশ ছিল সবার, সব ধর্মের, সব জাতিসত্তার। আর এখন সেই দেশকে একটি সংকীর্ণ ধর্মীয় রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টা চলছে। এবং যারা এই চেষ্টা করছে, তারা হলো ঠিক সেই মানুষজন যারা ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল।
বিটিভির “ধর্মান্তরণ”-এর দাবি হাস্যকর শোনালেও এটা অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ এটা দেখায় যে দখলদার সরকার এবং তাদের মিত্ররা কতটা সাহসী হয়ে উঠেছে। তারা এখন আর লুকিয়ে কাজ করছে না, প্রকাশ্যে তাদের এজেন্ডা ঘোষণা করছে। এবং কেউ তাদের আটকাচ্ছে না।
ইউনূসের সরকার যদি সত্যিই গণতন্ত্র এবং সংস্কারে বিশ্বাস করত, তাহলে তারা এই ধরনের বক্তব্যের তীব্র নিন্দা করত। কিন্তু তারা নীরব। এবং সেই নীরবতাই সবচেয়ে বড় প্রমাণ যে এই সরকার আসলে কাদের হাতের পুতুল।
আরো পড়ুন

