Friday, January 30, 2026

পোশাক শিল্প ধ্বংসে মরিয়া ইউনুস কার স্বার্থে? : সুঁতো নিষেধাজ্ঞার আসল ফায়দা তো লুটছে ভারত!

Share

দেশের তৈরি পোশাক শিল্প যখন আন্তর্জাতিক বাজারের মন্দা, ক্রয়াদেশ হ্রাস আর জ্বালানি সংকটের চাপে হাঁপিয়ে উঠছে, ঠিক তখনই ইউনুসের তথাকথিত ‘উপদেষ্টা পরিষদ’ এসেছে নতুন বিপদ নিয়ে। ১০ থেকে ৩০ কাউন্ট সুতার আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে পড়বে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

জুলাইয়ের রক্তাক্ত দাঙ্গার পর অবৈধভাবে ক্ষমতায় বসা এই সরকার যেন দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করার পরিকল্পনা নিয়েই এগোচ্ছে। একের পর এক এমন সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, যা দেশের স্বার্থ রক্ষা করার বদলে বরং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর স্বার্থ হাসিলে বেশি মনোযোগী বলে মনে হচ্ছে। নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে যারা ক্ষমতায় এসেছে, তাদের কাছে দেশের কোটি কোটি মানুষের ভাগ্য নিয়ে খেলা করাটা হয়তো কোনো বিষয়ই না।

বিজিএমইএ আর বিকেএমইএ স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের রফতানি ঝুঁকির মুখে পড়বে। কিন্তু এসব সংগঠনের আহাজারিতে কান দেওয়ার মতো সময় কি আছে ইউনুস গংয়ের? তারা যে ব্যস্ত দেশটাকে তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত করতে। স্বাধীনতার পর যেই অবস্থা থেকে দেশ উঠে দাঁড়িয়েছিল, তাকে আবার সেই অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে চায় বলেই মনে হচ্ছে।

তৈরি পোশাক শিল্প দেশের মোট রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি জোগান দেয়। প্রত্যক্ষ আর পরোক্ষভাবে কয়েক কোটি মানুষের জীবিকা এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এসব বাস্তবতা কি ইউনুসের কাছে কোনো মূল্য রাখে? যে ব্যক্তি নিজের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করতে দেশব্যাপী দাঙ্গা লাগিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, তার কাছে দেশের গরিব মানুষের কর্মসংস্থান কতটুকু গুরুত্ব পাবে, সেটা আন্দাজ করা কঠিন কিছু না।

চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর সময়ে তৈরি পোশাক রফতানি কমেছে ২.৬৩ শতাংশ। শুধু ডিসেম্বর মাসেই রফতানি হ্রাস পেয়েছে ১৪.২৩ শতাংশ। এই পরিস্থিতিতে কাঁচামালের দাম আরও বাড়লে কী হবে? আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, এটা পরিষ্কার। কিন্তু অবৈধ সরকারের কাছে এসব হিসাব-নিকাশ কি কোনো বিষয়?

সুতা আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দেশীয় স্পিনিং খাত রক্ষা করা যাবে, এই যুক্তি যারা দিচ্ছে তারা হয় বাস্তবতা বোঝে না, নয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে দেশের ক্ষতি করতে চায়। স্পিনিং খাত তৈরি পোশাক শিল্পের ওপরই নির্ভরশীল। দেশে উৎপাদিত সুতার ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশই যায় রফতানিমুখী পোশাক কারখানায়। পোশাক শিল্পে ক্রয়াদেশ কমে গেলে স্পিনিং খাতও বাঁচবে না। কিন্তু এই সহজ হিসাব ইউনুসের উপদেষ্টারা বোঝেন না, নাকি বুঝতে চান না?

পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা বলেছেন, তারা আমদানিকৃত সুতার তুলনায় সর্বোচ্চ ২০ সেন্ট পর্যন্ত বেশি দাম দিয়ে দেশীয় সুতা কিনতে রাজি। কিন্তু বাস্তবে দেশীয় মিলগুলো ৩৫ থেকে ৬০ সেন্ট পর্যন্ত বেশি দামে সুতা বিক্রি করছে। যেখানে ভারতীয় উৎপাদকরা ৩০ কাউন্টের এক কেজি সুতা ২.৬০ ডলারে দিচ্ছে, সেখানে দেশীয় মিল চাইছে প্রায় ৩ ডলার। এই পার্থক্যটা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে প্রতিদিন। কিন্তু এসব বিষয়ে কি ভাবনা আছে অবৈধ সরকারের?

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে ভারত। ভারত একই সঙ্গে ১০-৩০ কাউন্ট সুতা আর গ্রে কাপড়ের প্রধান সরবরাহকারী। নিষেধাজ্ঞা দিলে ভারতীয় সরবরাহকারীরা দাম বাড়িয়ে দেবে, আর বাংলাদেশকে উচ্চমূল্যে আমদানি করতে হবে। আর এটাই কি আসল উদ্দেশ্য? ভারতের স্বার্থে কাজ করতে গিয়ে দেশের শিল্পকে ধ্বংস করা?

জুলাইয়ের দাঙ্গার পর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে, কারা এর পেছনে ছিল। বিদেশি শক্তির ইন্ধন, জঙ্গি সংগঠনের সহায়তা আর সামরিক বাহিনীর সমর্থন নিয়ে যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তাদের প্রতিটি সিদ্ধান্তে দেশের স্বার্থের চেয়ে বিদেশি প্রভুদের স্বার্থ বেশি প্রতিফলিত হচ্ছে। এটা কি নিছক কাকতালীয়?

বাংলাদেশে ব্যবহৃত প্রায় ৯৫ শতাংশ সার্টিফায়েড তুলা আসে ভারত থেকে। এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে অর্ডার সরিয়ে নেবে। তখন কী হবে কয়েক কোটি শ্রমিকের? তাদের পরিবারের কথা কি ভাবা হয়েছে? নাকি এসব মানুষ ইউনুস গংয়ের কাছে নিছক পরিসংখ্যান মাত্র?

ট্যারিফ কমিশনের সঙ্গে আলোচনা চলমান থাকা অবস্থায়ই এই সুপারিশ চূড়ান্ত করার চেষ্টা চলছে। পোশাক শিল্পের মতামত শোনার প্রয়োজন বোধ করছে না কেউ। এটাই হলো গণতন্ত্রের নমুনা, যা ইউনুস আর তার দল প্রতিষ্ঠা করতে চায়? জনগণের মতামত উপেক্ষা করে, শিল্প মালিকদের আহাজারি অগ্রাহ্য করে একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়াই কি নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা?

গ্রে কাপড় আমদানি বাড়বে, দেশীয় নিটিং কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাবে, ছোট আর মাঝারি উদ্যোক্তারা ধ্বংস হবে। এটা এখন আর ধারণা না, বাস্তব সম্ভাবনা। কিন্তু এসব নিয়ে কি মাথাব্যথা আছে সুদী মহাজন ইউনুসের? যার কাছে দেশের গরিব মানুষেরা ঋণের জালে আটকে থাকা ছাড়া আর কিছু না, তার কাছে শিল্প-কারখানা বন্ধ হওয়া হয়তো কোনো সমস্যাই না।

বিজিএমইএ আর বিকেএমইএ বিকল্প সমাধান দিয়েছে। গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, যৌক্তিক সুদের হার, সহজ ঋণপ্রবাহ, উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানোর জন্য নীতি সহায়তা। কিন্তু এগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে তো দেশের মঙ্গল চিন্তা করতে হয়। অবৈধ সরকারের কাছে সেটা আশা করাটাই হাস্যকর।

দেশ ধ্বংস না করা পর্যন্ত ইউনুস গংয়ের থামাথামি নেই, এটা এখন পরিষ্কার। প্রতিটি সিদ্ধান্ত দেশকে আরও গভীর সংকটে ঠেলে দিচ্ছে। অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার এই পরিকল্পনা হয়তো কোনো বৃহত্তর পরিকল্পনারই অংশ। বিদেশি প্রভুদের আদেশ পালন করতে গিয়ে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দেওয়ার এই প্রবণতা আর কতদিন চলবে?

জুলাইয়ের রক্তের দাগ এখনও শুকায়নি। হাজারো পরিবার সন্তান হারানোর শোকে কাতর। আর সেই শোককে পুঁজি করে যারা ক্ষমতায় এসেছে, তারা এখন দেশের অর্থনীতির ঘাড়ে ছুরি চালাচ্ছে। এর চেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা আর কী হতে পারে?

সুতা আমদানি বন্ধ করলে স্পিনিং মিল বাঁচবে, এই যুক্তি ধোপে টিকবে না। কারণ পোশাক শিল্প ধ্বংস হলে স্পিনিং মিলেরও বাজার থাকবে না। এটা এত সহজ অঙ্ক যে একজন সাধারণ মানুষও বুঝতে পারে। কিন্তু ইউনুসের তথাকথিত বিশেষজ্ঞ উপদেষ্টারা কেন বুঝছে না? নাকি তারা বোঝার চেষ্টাই করছে না?

প্রশ্ন উঠছে, এই সিদ্ধান্ত কার স্বার্থে? দেশের না, বিদেশি কোনো শক্তির? ভারত লাভবান হবে, দেশীয় শিল্প ধ্বংস হবে, কয়েক কোটি মানুষ বেকার হবে। এর পরেও যদি এই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে আর কী প্রমাণ লাগবে যে অবৈধ সরকারের লক্ষ্য দেশ উন্নয়ন নয়, ধ্বংস?

সময় এসেছে চোখ খোলার। যে সরকারের বৈধতা নেই, সেই সরকারের সিদ্ধান্তেও স্বচ্ছতা নেই। জনগণের স্বার্থও নেই। যা আছে, তা কেবল বিদেশি প্রভুদের আদেশ পালনের তৎপরতা। আর দেশের মানুষকে দাবিয়ে রাখার অপচেষ্টা।

আরো পড়ুন

সদ্য প্রকাশিত