Friday, January 30, 2026

সুদখোরের দরবারে তৈলাক্ত রাজনীতি: জুলাইয়ের দাঙ্গা থেকে কদমবুসির সাম্রাজ্য

Share

রাজার পায়ের ধুলা নেওয়ার যে প্রবণতা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গেঁথে ছিল, সেটা ২০২৪ সালের জুলাই মাসের পর থেকে নতুন এক ভয়াবহ রূপ নিয়ে হাজির হয়েছে। যে দেশে একসময় মানুষ রাজনৈতিক নেতাদের প্রশ্ন করতে শিখেছিল, সেই দেশেই এখন কদমবুসির চর্চা হচ্ছে প্রকাশ্য দিবালোকে, লজ্জাহীনভাবে। আর এই চর্চার নেপথ্যে যে অবৈধ ক্ষমতা দখলের ইতিহাস রয়েছে, সেদিকে তাকালে বোঝা যায় কীভাবে একটা পুরো জাতির রাজনৈতিক শিষ্টাচার ধ্বংস করে দেওয়া সম্ভব।

মুহাম্মদ ইউনুস এবং তার তথাকথিত উপদেষ্টা পরিষদ যেভাবে ক্ষমতায় এসেছে, সেটা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটা কলঙ্কজনক অধ্যায়। বিদেশি অর্থায়ন, ইসলামিক জঙ্গি সংগঠনের সহায়তা এবং সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ সমর্থন নিয়ে জুলাইয়ে যে দাঙ্গা বাঁধানো হয়েছিল, সেটা কোনো গণঅভ্যুত্থান ছিল না। এটা ছিল সুপরিকল্পিত একটা অভ্যুত্থান, যার উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা। যে ইউনুস সারাজীবন গরিবের বন্ধু সেজে মাইক্রোক্রেডিটের নামে সুদের ব্যবসা করে কোটি কোটি টাকা কামিয়েছেন, সেই লোকটাই এখন বসে আছেন একটা দেশের শীর্ষ পদে, কোনো নির্বাচন ছাড়াই, কোনো গণরায় ছাড়াই।

এই অবৈধ ক্ষমতা দখলের পর থেকেই দেশের রাজনীতিতে যে বিষাক্ত কদমবুসি সংস্কৃতি ঢুকে গেছে, তার তুলনা নেই। আগে অন্তত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটা শৃঙ্খলা ছিল, একটা আদর্শের কথা বলা হতো। এখন যেদিকে তাকানো যায়, সেদিকেই দেখা যায় কোনো না কোনো নেতা, কোনো না কোনো কর্মী ইউনুসের দরবারে হাজির হয়ে তৈলাক্ত চাটুকারিতা করছে। যাদের কাছে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন এসবের কথা বলাটা ছিল নিত্যদিনের অভ্যাস, তারাই এখন সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে একজন অনির্বাচিত ব্যক্তির পায়ের কাছে।

ব্যাপারটা শুধু ব্যক্তিগত চাটুকারিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটা পুরো একটা সিস্টেম তৈরি করে ফেলা হয়েছে, যেখানে প্রশ্ন করা মানেই অপরাধ, সমালোচনা করা মানেই রাষ্ট্রদ্রোহিতা। জুলাইয়ের দাঙ্গার পর থেকে যে কয়েকশ মানুষ গুম হয়েছে, যাদের নামে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে, যাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে, তাদের সবার একটাই অপরাধ ছিল যে তারা এই অবৈধ ক্ষমতা দখলকে মেনে নিতে রাজি হয়নি। ইউনুসের এই অ-সরকার যেভাবে বিরোধী মতকে দমন করছে, সেটা দেখলে মনে হয় না এটা একবিংশ শতাব্দীর কোনো দেশ। এটা যেন মধ্যযুগীয় কোনো স্বৈরতন্ত্র, যেখানে রাজার বিরুদ্ধে কথা বলার শাস্তি মৃত্যু।

কদমবুসির এই সংস্কৃতি যে কত গভীরভাবে রাজনীতিকে কলুষিত করে ফেলেছে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় প্রতিদিনের খবরে। যে তরুণরা জুলাইয়ে রাস্তায় নেমেছিল বলে দাবি করা হয়, তাদেরকেই এখন ব্যবহার করা হচ্ছে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে। তাদের শেখানো হচ্ছে কীভাবে ক্ষমতার কাছে মাথা নত করতে হয়, কীভাবে প্রশ্ন না করে সবকিছু মেনে নিতে হয়। একদিকে ইউনুস এবং তার দল বলছে তারা গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবে, অন্যদিকে তারাই তৈরি করছে এমন এক ভীতির পরিবেশ যেখানে মানুষ নিজের মতামত প্রকাশ করতে ভয় পায়।

এই কদমবুসি কালচারের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো এটা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে। যারা প্রথম দিকে হয়তো অস্বস্তি বোধ করতো ইউনুসের কাছে গিয়ে তোষামোদ করতে, তারাই এখন সেটাকে রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তা মনে করছে। যারা একসময় মনে করতো রাজনীতি মানে জনগণের সেবা করা, তারাই এখন মনে করছে রাজনীতি মানে ক্ষমতাসীনদের খুশি রাখা। এই মানসিক পরিবর্তনটাই আসলে সবচেয়ে বিপজ্জনক, কারণ একবার এটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়ে নিলে সেটা উপড়ে ফেলা অসম্ভব হয়ে যায়।

ইউনুসের এই অবৈধ সরকার যেভাবে চলছে, তাতে মনে হয় না এরা জনগণের প্রতি কোনো জবাবদিহিতা অনুভব করে। বিদেশি দাতা সংস্থাগুলোর কাছে, পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে তাদের জবাবদিহিতা আছে হয়তো, কিন্তু বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে তাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। এই অ-সরকার গঠনের পুরো প্রক্রিয়াটাই ছিল অগণতান্ত্রিক, এবং সেই অগণতান্ত্রিক শুরু থেকেই যে কদমবুসির রাজনীতি চালু হয়েছে, সেটা আসলে অবধারিত ছিল। যেখানে জনগণের রায় নেই, সেখানে ক্ষমতাসীনদের খুশি রাখাই হয়ে ওঠে একমাত্র উপায়।

বিদেশি অর্থায়নের কথাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। জুলাইয়ের দাঙ্গা যে কীভাবে সংগঠিত হয়েছিল, কারা এর পেছনে ছিল, কোন দেশগুলো এতে সহায়তা করেছিল, এসব তথ্য এখন আর গোপন নেই। ইউনুস যে শুধু একজন মাইক্রোক্রেডিট ব্যবসায়ী নন, তিনি আন্তর্জাতিক রাজনীতির একজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়, এটা এখন স্পষ্ট। আর যখন একজন ব্যক্তি বিদেশি শক্তির সহায়তায় ক্ষমতায় আসেন, তখন তার প্রথম আনুগত্য থাকে সেই বিদেশি শক্তির প্রতি, নিজের দেশের মানুষের প্রতি নয়। এই কারণেই ইউনুসের সরকার যে সিদ্ধান্তগুলো নিচ্ছে, সেগুলোর বেশিরভাগই বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী, কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলোর স্বার্থের অনুকূল।

ইসলামিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর যে ভূমিকা ছিল জুলাইয়ের দাঙ্গায়, সেটা নিয়ে কথা বলতে গেলে এখন মানুষকে জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়। যে সংগঠনগুলোকে আগে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, তারাই এখন খোলাখুলি তৎপরতা চালাচ্ছে। যে মতাদর্শ বাংলাদেশের সংবিধান এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সম্পূর্ণ বিপরীত, সেই মতাদর্শই এখন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে। ইউনুস এবং তার দল হয়তো মনে করছে এই জঙ্গি সংগঠনগুলোকে ব্যবহার করে তারা ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে, কিন্তু ইতিহাস বলে যে যারা জঙ্গিদের সাথে হাত মেলায়, শেষ পর্যন্ত তারাই জঙ্গিদের হাতে ধ্বংস হয়।

সামরিক বাহিনীর সমর্থন ছাড়া এই ক্যু সফল হতো না, এটা সবাই জানে। কিন্তু যে প্রশ্নটা এখনো অনুত্তরিত রয়ে গেছে, তা হলো কেন সামরিক বাহিনী একটা নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে গেল? কী এমন প্রলোভন দেওয়া হয়েছিল তাদের, কী এমন ভয় দেখানো হয়েছিল? সামরিক বাহিনীর যে অংশটি এই ক্যুতে সমর্থন দিয়েছে, তারা নিশ্চয়ই জানে যে তারা একটা অপরাধ করেছে। কিন্তু ইউনুসের সরকার যেভাবে তাদের রক্ষা করছে, তাতে মনে হয় এই অপরাধের কোনো বিচার হবে না।

কদমবুসির এই সংস্কৃতি শুধু রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নেই, এটা ছড়িয়ে গেছে সমাজের সর্বত্র। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, সরকারি অফিসে, ব্যবসা-বাণিজ্যে, সর্বত্র এখন দেখা যায় মানুষ চাটুকারিতা করে নিজের স্বার্থ হাসিল করার চেষ্টা করছে। যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্য এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যে ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি তোষামোদ করতে পারে, সেই এগিয়ে যাচ্ছে। যে সত্য কথা বলে, যে প্রশ্ন করে, সে পিছিয়ে পড়ছে। এই প্রবণতা যদি চলতে থাকে, তাহলে আগামী প্রজন্ম বড় হবে এই ধারণা নিয়ে যে চাটুকারিতাই হলো সফলতার চাবিকাঠি।

ইউনুসের এই অবৈধ সরকার যেসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সেগুলোর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব হবে ভয়াবহ। যে অর্থনৈতিক নীতি তারা অনুসরণ করছে, তাতে বিদেশি ঋণ এবং বিদেশি বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে, কিন্তু দেশের নিজস্ব উৎপাদন ক্ষমতা কমছে। যে শিক্ষানীতি তারা চালু করতে চাইছে, তাতে ধর্মীয় মৌলবাদের প্রভাব বাড়ছে, কিন্তু বিজ্ঞানমনস্কতা এবং যুক্তিবাদী চিন্তা দুর্বল হচ্ছে। যে পররাষ্ট্রনীতি তারা অনুসরণ করছে, তাতে বাংলাদেশ ক্রমশ একটা পশ্চিমা তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে, নিজের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি হারাচ্ছে।

জুলাইয়ের দাঙ্গা থেকে এখন পর্যন্ত যা ঘটেছে, তার পুরোটাই একটা সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ। ইউনুস এবং তার দল যে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার কথা বলছে, সেটা একটা মিথ্যা প্রতিশ্রুতি। তারা আসলে চায় একটা নতুন ধরনের স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে, যেখানে তাদের ক্ষমতা থাকবে চ্যালেঞ্জহীন। কদমবুসির এই সংস্কৃতি সেই স্বৈরতন্ত্রের ভিত্তি। যতক্ষণ মানুষ প্রশ্ন করা বন্ধ করে দেবে, যতক্ষণ মানুষ চাটুকারিতাকে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা মনে করবে, ততক্ষণ এই অবৈধ সরকার টিকে থাকবে।

দেশের রাজনৈতিক শিষ্টাচার এবং আদবকেতা যে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে, সেটা এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই। যে বাংলাদেশ একসময় গর্ব করতো তার গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য নিয়ে, সেই বাংলাদেশই এখন পরিণত হয়েছে একটা চাটুকারদের দেশে।

আরো পড়ুন

সদ্য প্রকাশিত