Share
বাংলাদেশে মাদ্রাসায় শিশু যৌন নির্যাতনের ঘটনা নতুন না। নতুন শুধু রামপুরার আব্দুল্লাহ। কিন্তু আব্দুল্লাহর আগেও এই দেশে অসংখ্য আব্দুল্লাহ ছিল। তাদের কেউ লাশ হয়েছে, কেউ বেঁচে আছে ভেতরে ভেতরে মরে যেতে যেতে। এই ধারাবাহিকতা এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে পত্রিকায় এখন আর মাদ্রাসার ঘটনা প্রথম পাতায় আসে না। ভেতরের পাতায়, ছোট্ট একটা বক্সে, “বলৎকার” শব্দ দিয়ে সারা হয়।
“বলৎকার” শব্দটা নিজেই একটা অপরাধ। এই শব্দ ব্যবহার করে মিডিয়া প্রতিদিন যা করছে সেটা হলো একটা দশ বছরের শিশুর সাথে যা হয়েছে সেটাকে অন্য একটা ক্যাটাগরিতে ফেলে দেওয়া। যেন এটা ধর্ষণের মতো ভয়াবহ না। যেন এটা কম গুরুতর। আধুনিক আইনি কাঠামোয়, যেসব দেশে শিশু সুরক্ষাকে সিরিয়াসলি নেওয়া হয়, সেখানে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ একটা শিশুর দিকে যৌন ইঙ্গিতে তাকালেও সেটা শিশু যৌন নির্যাতন। সেখানে শাস্তি হয়, রেজিস্ট্রি হয়, সমাজে তার আর জায়গা থাকে না। আর এই দেশে হুজুর একটা দশ বছরের বাচ্চাকে ধর্ষণ করে হত্যা করে, পত্রিকায় ছোট্ট করে লেখা হয় “বলৎকারের পর মৃত্যু”, মানুষ পড়ে পাশ কাটিয়ে যায়।
এই ভাষার রাজনীতিটা আকস্মিক না। এটা তৈরি করা হয়েছে, লালন করা হচ্ছে, কারণ এই ভাষা দিয়ে অপরাধকে ছোট রাখা যায়, আর অপরাধীকে বাঁচানো যায়।
এখন প্রশ্নটা হলো, কারা এই অপরাধীদের বাঁচায়?
জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক কাঠামো বাংলাদেশে যেভাবে দাঁড়িয়ে আছে, তার মূল ভিত্তি মাদ্রাসা নেটওয়ার্ক। কওমি, হাফেজি, আলিয়া, এই তিনটা ধারার মাদ্রাসায় জামায়াতের রাজনৈতিক ও আর্থিক প্রভাব দশকের পর দশক ধরে বজায় আছে। শিবির তৈরি হয়েছে মাদ্রাসার ছাত্র থেকে। জামায়াতের স্থানীয় নেতারা মাদ্রাসাকে ব্যবহার করেছে প্রভাব বিস্তারের জায়গা হিসেবে। এই সম্পর্কটা কেউ লুকিয়ে রাখেনি, এটা প্রকাশ্যেই আছে। তাহলে মাদ্রাসায় যখন শিশু ধর্ষণ হয়, হত্যা হয়, জামায়াত চুপ থাকে কেন? কারণ এই নেটওয়ার্কটা তাদের। এখানে মুখ খুললে নিজের ঘর তো আগে পোড়ে!
বিএনপির ক্ষেত্রেও একই কথা। জিয়াউর রহমান সামরিক শাসনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে যে রাজনৈতিক দল বানিয়েছিলেন, সেই দলের বেঁচে থাকার জন্য জামায়াত ও ইসলামপন্থী দলগুলোর সমর্থন দরকার। পাকিস্তানে পালিয়ে থাকা থেকে গোলাম আজমকে পায়ে চুমু খেয়ে বাংলাদেশে নিয়ে আসলেন তিনি। ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারে ছিল। যুদ্ধাপরাধীরা মন্ত্রী হয়েছিল। সেই একই জামায়াত আজ বিএনপির কাছাকাছি আছে, ভবিষ্যতের হিসাব কষছে। ফলে মাদ্রাসায় শিশু ধর্ষণের বিষয়ে বিএনপি যে কথা বলবে না, এটা রাজনৈতিকভাবে অনুমানযোগ্য। ভোটের অঙ্ক এখানে মানবিকতার চেয়ে বড়।
১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬-এ যে নির্বাচন হয়েছে, সেটা নিয়ে কারো মনে বিভ্রম থাকার কথা না। বড় দলগুলো অংশ নেয়নি। মানুষ ভোট দিতে যায়নি। যা হয়েছে সেটা ক্ষমতার পালাবদলের একটা আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। কিন্তু যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, মাদ্রাসায় শিশু ধর্ষণের বিষয়ে রাষ্ট্রের অবস্থান একই থেকেছে। কারণ রাষ্ট্র এখানে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে কখনো জবাবদিহির মুখে দাঁড় করায়নি। মাদ্রাসা নিবন্ধন আছে, সরকারি অনুদান আছে, কিন্তু তদারকি নেই। কী পড়ানো হচ্ছে, কারা পড়াচ্ছে, রাতে হোস্টেলে কী হচ্ছে, এই প্রশ্নগুলো করলে “ধর্মে হস্তক্ষেপ” বলে চিৎকার ওঠে।
নেত্রকোনার ঘটনাটা এই প্রসঙ্গে আবারও তোলা দরকার। তৌহিদী জনতার মোল্লা যা করেছে সেটা প্রকাশ্যে, সাক্ষীদের সামনে। এরপর সে ডিএনএ টেস্টের দাবি তুলেছে। এই দাবিটার মানে কী? মানে হলো, সে জানে এই দেশে মোল্লাদের বিচার হয় না। প্রমাণ চাওয়ার নাটক করলেই পার পাওয়া যায়। আর সত্যিই পার পেয়ে গেছে কারণ এই দেশে ধর্মীয় পরিচয় একটা বর্ম হিসেবে কাজ করে।
পুরো ব্যাপারটার মধ্যে সবচেয়ে ভয়ের জায়গা হলো, এটা একটা সিস্টেম হয়ে গেছে। মাদ্রাসায় শিশু যায়, নির্যাতিত হয়, কেউ কেউ মরে, বাকিরা চুপ থাকে কারণ হুজুরের বিরুদ্ধে কথা বলা মানে ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলা এই ধারণাটা এতটাই গভীরে গেছে যে আব্দুল্লাহর বাবা-মাও বিচার চাইতে সাহস পায় না। এই নীরবতাটাই জামায়াত, ইসলামী দলগুলো আর মাদ্রাসা নেটওয়ার্কের সবচেয়ে বড় শক্তি। এই নীরবতা তৈরি করতে দশকের পর দশক লেগেছে, আর এই নীরবতার মধ্যে প্রতিটা আব্দুল্লাহ একা একা মরে যাচ্ছে।
আরো পড়ুন

