Share
নিজস্ব প্রতিবেদক
শ্রীলঙ্কায় যেতে এখন থেকে বাংলাদেশিদের আগে থেকেই ইলেকট্রনিক ট্রাভেল অথোরাইজেশন নিতে হবে। আজ থেকে কার্যকর এই নিয়মে বিমানবন্দরে পৌঁছে ভিসা নেওয়ার সুবিধা একেবারেই বন্ধ হয়ে গেল। কথাটা শুনতে হয়তো খুব সাধারণ মনে হচ্ছে, কিন্তু যারা জানেন তারা বুঝবেন এর পেছনে কী রয়েছে। মাত্র ১৪ মাস আগেও মাস আগেও শ্রীলঙ্কা ছিল বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য সবচেয়ে সহজ গন্তব্যগুলোর একটি। বিমানবন্দরে নেমেই ভিসা, কোনো ঝামেলা নেই, খরচও কম। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সেই কুখ্যাত দাঙ্গার পর থেকে যা হওয়ার কথা ছিল না, তা-ই ঘটছে একের পর এক।
এটা শুধু শ্রীলঙ্কার ব্যাপার নয়। গত চৌদ্দ মাসে বাংলাদেশের পাসপোর্টের যে দুর্দশা হয়েছে, তা আগে কখনো দেখা যায়নি। একটা দেশের পাসপোর্টের মান কমে যাওয়া মানে সেই দেশের সম্মান কমে যাওয়া। আর সম্মান তো রাতারাতি তৈরি হয় না, কিন্তু নষ্ট হতে সময় লাগে না। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যখন রাজপথে আগুন জ্বলছিল, যখন পরিকল্পিতভাবে দেশব্যাপী অরাজকতা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল, যখন একের পর এক পুলিশ ফাঁড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, তখন পুরো বিশ্ব দেখছিল। দেখছিল কীভাবে একটি নির্বাচিত সরকারকে জোর করে সরিয়ে দেওয়া হলো। দেখছিল কীভাবে সামরিক সমর্থন আর বহিঃশক্তির মদদে ক্ষমতা দখল করা হলো। আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার, দেখছিল কীভাবে জঙ্গি সংগঠনগুলোকে ব্যবহার করে এই পুরো নাটক সাজানো হয়েছিল।
এখন যে সরকার ক্ষমতায় বসে আছে, তাকে সরকার বলাটাই হাস্যকর। কারণ যে সরকার জনগণের ভোটে আসেনি, যে সরকারের বৈধতা নেই, সে সরকার আসলে দখলদার ছাড়া আর কিছু নয়। আর দখলদারদের হাতে যখন দেশের হাল থাকে, তখন দেশের সম্মানও থাকে না। মুহাম্মদ ইউনুস হয়তো নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, সুদী মহাজনি ব্যবসায় তার সুনাম আছে, কিন্তু দেশ চালানোর যোগ্যতা কি তাতে প্রমাণ হয়? আর সবচেয়ে বড় কথা, যে প্রক্রিয়ায় তিনি ক্ষমতায় এসেছেন, সেটা তো বৈধ নয়।
শ্রীলঙ্কার এই সিদ্ধান্ত একটা ইঙ্গিত মাত্র। সামনে আরও অনেক দেশ হয়তো বাংলাদেশিদের জন্য তাদের দরজা কঠোর করবে। কারণ কোনো দেশই চায় না এমন একটা দেশের নাগরিকদের নিজের মাটিতে ঢুকতে দিতে, যে দেশে স্থিতিশীলতা নেই, যে দেশে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল হয়েছে, যে দেশে জঙ্গিবাদের ছায়া ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিদেশি রাষ্ট্রের টাকায় পরিচালিত এই পুরো ক্যুয়ের খেসারত এখন দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। যে পর্যটক একটু ছুটি কাটাতে শ্রীলঙ্কা যেতে চাইছেন, তাকেও এখন আগে থেকে ঝামেলায় পড়তে হচ্ছে। যে ব্যবসায়ী কাজে বিদেশ যেতে চান, তার জন্যও এখন পথ কঠিন হচ্ছে দিনদিন।
পাসপোর্টের মান নামার মানে হলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা কমে যাওয়া। এটা কোনো ছোট বিষয় নয়। একটা সময় ছিল যখন বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে মানুষ গর্ব করত। হ্যাঁ, আমাদের পাসপোর্ট হয়তো পশ্চিমা দেশগুলোর মতো শক্তিশালী ছিল না, কিন্তু আমাদের একটা সম্মান ছিল। আশেপাশের দেশগুলোতে আমরা সহজেই যেতে পারতাম। কিন্তু এখন? এখন প্রতিটা পদক্ষেপে বাধা। আর এই বাধার কারণ একটাই – ২০২৪ সালের জুলাইয়ের সেই পরিকল্পিত দাঙ্গা আর তার মাধ্যমে ক্ষমতা দখল।
যারা এই ক্যু ঘটিয়েছেন, যারা রাস্তায় আগুন জ্বালিয়েছেন, যারা দেশকে অস্থিতিশীল করেছেন, তারা হয়তো ভাবছেন তারা বিজয়ী। কিন্তু আসল ক্ষতি হয়েছে দেশের। আর সেই ক্ষতির মাশুল গুনতে হচ্ছে প্রতিটি সাধারণ নাগরিককে।
শ্রীলঙ্কার এই নতুন নিয়ম হয়তো দেখতে ছোট একটা পরিবর্তন মনে হচ্ছে, কিন্তু এটা একটা সংকেত। সংকেত এই যে, বিশ্ব এখন বাংলাদেশকে আর আগের চোখে দেখছে না। দেখছে একটা অস্থিতিশীল, অবৈধভাবে শাসিত দেশ হিসেবে।
আর সবচেয়ে যন্ত্রণার কথা হলো, এর দায় কিন্তু সাধারণ মানুষের নয়। দায় তাদের যারা নিজেদের স্বার্থে দেশের সার্বভৌমত্ব বিক্রি করে দিয়েছেন। যারা বিদেশি মদদে, ইসলামিক জঙ্গিদের সহায়তায়, আর সামরিক সমর্থনে একটা অবৈধ ব্যবস্থা কায়েম করেছেন। মুহাম্মদ ইউনুস আর তার তথাকথিত সরকার হয়তো নিজেদের বৈধতার দাবি করে যাবেন, কিন্তু বাস্তবতা হলো তারা ক্ষমতায় এসেছেন জনগণের রায়ে নয়, এসেছেন চক্রান্তের মাধ্যমে। আর সেই চক্রান্তের ফলাফল এখন ভোগ করছে পুরো জাতি।
এখন প্রশ্ন হলো, সামনে কী হবে? আর কত দেশ বাংলাদেশিদের জন্য তাদের সীমানা কঠোর করবে? আর কতদিন আমাদের পাসপোর্টের মান নিচে নামবে? এই পথে যদি আমরা চলতে থাকি, তাহলে একদিন হয়তো এমন অবস্থা হবে যে কোনো দেশেই বাংলাদেশিরা সহজে যেতে পারবে না। আর সেটা হবে আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে লজ্জাজনক অধ্যায়। দুঃখের বিষয় হলো, এই লজ্জার জন্য দায়ী তারা যারা নিজেদের দেশপ্রেমী বলে দাবি করেন, কিন্তু আসলে দেশের সবচেয়ে বড় ক্ষতি করে গেছেন।
আরো পড়ুন

