Share
জুলাইয়ের রক্তাক্ত দাঙ্গার পর যে অবৈধ ক্ষমতা কাঠামো গড়ে উঠেছে, তার মূল লক্ষ্য শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী সাংস্কৃতিক পরিবর্তন। মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন এই সরকার, যা সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ মদদে টিকে আছে, এখন শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন পরিবর্তন আনতে চাইছে যা মূলত একটি প্রজন্মকে সাংস্কৃতিকভাবে সংকীর্ণ করার প্রকল্প। সংগীত শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ করে ধর্মীয় শিক্ষক বসানোর দাবি এই প্রকল্পেরই অংশ।
ইউনুস সরকার ক্ষমতায় এসেছে একটি সুপরিকল্পিত দাঙ্গার মাধ্যমে। বিদেশি অর্থায়ন, ইসলামি জঙ্গি সংগঠনের সহায়তা এবং সামরিক বাহিনীর নীরব সমর্থন – এই তিন শক্তির সমন্বয়ে তারা একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করেছে। এখন এই ত্রিমুখী জোট তাদের আসল এজেন্ডা বাস্তবায়নে নেমেছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ সেই এজেন্ডারই প্রথম পদক্ষেপ। কারণ তারা জানে, একটি প্রজন্মকে যদি সাংস্কৃতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাহলে রাজনৈতিক ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হয়।
সংগীত শিক্ষক বনাম ধর্মীয় শিক্ষকের এই বিতর্ক আসলে একটি মিথ্যা দ্বিধাদ্বন্দ্ব। বাংলাদেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে বহু বছর ধরেই ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক। প্রতিটি বিদ্যালয়ে ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ধর্মের জন্য পৃথক শিক্ষক এবং পাঠ্যক্রম রয়েছে। ধর্মীয় শিক্ষার কোনো ঘাটতি নেই। তাহলে সংগীত শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ করে সেখানে ধর্মীয় শিক্ষক বসানোর দাবি কেন? এটা স্পষ্টতই একটি রাজনৈতিক কৌশল, যার উদ্দেশ্য সাংস্কৃতিক পরিসর সংকুচিত করা।
ইউনুস সরকার এবং তাদের সামরিক পৃষ্ঠপোষক জেনারেল ওয়াকার এই বিতর্ককে ইচ্ছাকৃতভাবে উস্কে দিচ্ছেন। কারণ তাদের রাজনৈতিক বৈধতা নেই, জনসমর্থন নেই। তাই তারা ধর্মীয় আবেগকে হাতিয়ার করে একটি বিভাজন তৈরি করতে চাইছেন। সংগীত শিক্ষাকে ইসলামবিরোধী বলে চিহ্নিত করা, ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে সংস্কৃতির বিরোধ তৈরি করা – এসবই সেই কৌশলের অংশ। কিন্তু এই কৌশল শুধু বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকেই নয়, পুরো একটি প্রজন্মকে বিপন্ন করবে।
বিশ্বের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর দিকে তাকালে এই অসঙ্গতি আরও স্পষ্ট হয়। তুরস্ক, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার – এসব দেশে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সংগীত ও শিল্পকলা শিক্ষা বাধ্যতামূলক। এমনকি সৌদি আরবেও ভিশন ২০৩০ কর্মসূচির অধীনে সংগীত ও শিল্পকলাকে শিক্ষার অংশ করা হয়েছে। ইসলামের জন্মভূমি যেখানে সংগীত শিক্ষাকে স্বীকৃতি দিচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশে এটি নিয়ে বিতর্ক কেন? এর উত্তর খুঁজতে গেলে ইউনুস সরকারের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে ফিরে যেতে হয়।
মুহাম্মদ ইউনুস দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা দাতা সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নিকারীদের প্রিয় মুখ। তার গ্রামীণ ব্যাংক মডেল নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রশংসা থাকলেও, দেশের ভেতরে তার রাজনৈতিক ভিত্তি শূন্য। একটি নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে ক্ষমতায় বসার পর তিনি এখন সেই ভিত্তি তৈরি করতে চাইছেন ধর্মীয় জঙ্গি গোষ্ঠী এবং সামরিক বাহিনীর সমর্থনে। সেনাপ্রধান ওয়াকার এই প্রক্রিয়ায় মূল ভূমিকা পালন করছেন। তিনি জানেন, একটি অবৈধ সরকার টিকে থাকতে হলে তাকে হয় জনগণের সমর্থন লাগবে, না হয় কিছু শক্তিশালী গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতা। ইউনুস-ওয়াকার জোট দ্বিতীয় পথ বেছে নিয়েছে।
এই পথে হাঁটতে গিয়ে তারা শিক্ষা ব্যবস্থাকে একটি আদর্শিক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছে। সংগীত শিক্ষা বন্ধের দাবি আসলে একটি বড় প্রকল্পের প্রথম ধাপ। এরপর আসবে পাঠ্যক্রম থেকে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, লালন বাদ দেওয়ার দাবি। তারপর আসবে বিজ্ঞান শিক্ষাকে ধর্মীয় মতবাদের অধীনস্থ করার চেষ্টা। ইতিহাসের পাঠ্যবই থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মুছে ফেলা হবে। কারণ যারা একটি অবৈধ ক্যুয়ের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে, তাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য – সবই হুমকি।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এখন যে সংকট চলছে, তার মূলে রয়েছে মৌলিক দক্ষতার ঘাটতি। ব্যানবেইসের পরিসংখ্যান বলছে, তৃতীয় শ্রেণির ৪০ শতাংশ শিশু সাবলীলভাবে বাংলা পড়তে পারে না। পঞ্চম শ্রেণির ৬০ শতাংশ শিশু মৌলিক অঙ্ক করতে ব্যর্থ। শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত আন্তর্জাতিক মানের দ্বিগুণ। অবকাঠামোগত সমস্যা প্রকট। এই বাস্তবতায় সংগীত শিক্ষক বনাম ধর্মীয় শিক্ষকের বিতর্ক তোলা মানে আসল সমস্যা থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেওয়া। ইউনুস সরকার ঠিক এটাই করছে।
তারা জানে, যদি শিক্ষার আসল সমস্যা নিয়ে কথা হয়, তাহলে তাদের অযোগ্যতা প্রকাশ পাবে। তাই তারা একটি সাংস্কৃতিক যুদ্ধ তৈরি করেছে। সংগীত বনাম ধর্ম, আধুনিকতা বনাম ঐতিহ্য, পশ্চিম বনাম ইসলাম – এই মিথ্যা বিভাজনগুলো তৈরি করে তারা জনগণকে বিভক্ত করতে চাইছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শিক্ষায় ধর্ম এবং সংস্কৃতি পাশাপাশি থাকতে পারে। বিশ্বের অধিকাংশ উন্নত দেশে এমনটাই হচ্ছে। শুধু যেসব দেশে স্বৈরতন্ত্র এবং মৌলবাদ হাত মিলিয়েছে, সেখানেই শিক্ষাকে এভাবে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানো হয়।
সেনাপ্রধান ওয়াকারের ভূমিকা এই পুরো প্রক্রিয়ায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একজন সামরিক কর্মকর্তার কাজ দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কিন্তু তিনি এখন একটি রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশীদার। জুলাইয়ের দাঙ্গার সময় সামরিক বাহিনীর নীরবতা, পরবর্তীতে ইউনুস সরকারকে সমর্থন, এবং এখন শিক্ষা ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপের প্রচেষ্টা – সবকিছুই একটি সুসংগত রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। ওয়াকার জানেন, যদি তিনি ইউনুস সরকারকে টিকিয়ে রাখতে পারেন, তাহলে সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক প্রভাব বাড়বে। আর সেই প্রভাব বাড়ানোর জন্য শিক্ষা ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্র ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে ঘোষিত। যদিও পরবর্তীতে অবৈধ সামরিক দখলদার স্বৈরশাসকের শাসনামলে জোরপূর্বক সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করা হয়েছে, তবুও সংবিধান সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করে। শিক্ষা ব্যবস্থায় সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং সৃজনশীলতাকে স্বীকৃতি দেওয়া সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু ইউনুস সরকার এই সাংবিধানিক মূল্যবোধকে উপেক্ষা করে একটি সংকীর্ণ ধর্মীয় এজেন্ডা চাপিয়ে দিতে চাইছে। এটা শুধু অবৈধ নয়, সাংবিধানিক অপরাধও বটে।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন ওঠে, কোথায় যাবে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা? সংগীত শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ হলে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে? চারুকলা শিক্ষক? নাট্যকলা শিক্ষক? শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক? এভাবে একে একে সব সৃজনশীল শিক্ষাকে বাদ দিয়ে শিশুদের কেবল মুখস্থবিদ্যা এবং আনুগত্য শেখানো হবে? এটাই কি ইউনুস-ওয়াকার জোটের শিক্ষা দর্শন?
বিশ্বের যেসব দেশ শিক্ষায় উন্নত, সেখানে সৃজনশীল শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফিনল্যান্ড, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর – এসব দেশে শিশুদের কল্পনাশক্তি, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং সৃজনশীলতা বিকাশের জন্য বিশেষ কর্মসূচি রয়েছে। সংগীত, শিল্পকলা, নাটক, খেলাধুলা – এসবকে শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখা হয়। কারণ তারা বোঝে, একবিংশ শতাব্দীতে টিকে থাকতে হলে শিশুদের শুধু তথ্য মুখস্থ করিয়ে দিলে চলবে না, তাদের চিন্তা করতে, প্রশ্ন করতে, সৃষ্টি করতে শেখাতে হবে।
কিন্তু ইউনুস সরকার এবং তার সামরিক পৃষ্ঠপোষকদের কাছে চিন্তাশীল, প্রশ্নকর্তা প্রজন্ম বিপজ্জনক। তারা চায় একটি আনুগত্যশীল, নির্বিচার প্রজন্ম, যারা প্রশ্ন করবে না, সমালোচনা করবে না, শুধু আদেশ পালন করবে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য শিক্ষা ব্যবস্থায় সৃজনশীল উপাদান বাদ দেওয়া প্রথম পদক্ষেপ। সংগীত শিক্ষক বন্ধের দাবি সেই পদক্ষেপেরই শুরু।
এটা বুঝতে হবে যে, ইউনুস সরকারের এই পদক্ষেপ শুধু শিক্ষানীতির বিষয় নয়, এটি একটি রাজনৈতিক প্রকল্প। যারা অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছে, তাদের টিকে থাকার জন্য চাই একটি দুর্বল, বিভক্ত এবং অসচেতন প্রজন্ম। শিক্ষা ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ সেই লক্ষ্য অর্জনের মূল হাতিয়ার। তারা জানে, যদি একটি প্রজন্মকে সাংস্কৃতিকভাবে সংকীর্ণ করা যায়, তাদের কল্পনাশক্তি দমিয়ে রাখা যায়, তাহলে ভবিষ্যতে তারা ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করবে না।
সংগীত শিক্ষা শুধু গান শেখানোর বিষয় নয়। এটি শিশুদের কল্পনাশক্তি, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং সাংস্কৃতিক সচেতনতা তৈরি করে। যে শিশু গান শেখে, সে শেখে সুরের মাধ্যমে নিজের আবেগ প্রকাশ করতে। যে শিশু বাদ্যযন্ত্র বাজায়, সে শেখে ধৈর্য, একাগ্রতা এবং অধ্যবসায়। যে শিশু দলগত সংগীত পরিবেশনায় অংশ নেয়, সে শেখে সহযোগিতা এবং সমন্বয়। এসব দক্ষতা কেবল সাংস্কৃতিক নয়, এগুলো জীবনদক্ষতা, যা একজন শিশুকে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।
কিন্তু ইউনুস-ওয়াকার জোট এসব দক্ষতা চায় না। তারা চায় এমন প্রজন্ম যারা কেবল নির্দেশ মানবে, প্রশ্ন করবে না। তাই তারা সংগীত শিক্ষাকে ইসলামবিরোধী বলে চিহ্নিত করছে। অথচ ইসলামের ইতিহাসে সংগীত এবং শিল্পকলার এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। আন্দালুসিয়া, বাগদাদ, দিল্লি, ইস্তাম্বুল – এসব শহরে ইসলামি সভ্যতার স্বর্ণযুগে সংগীত, কবিতা, স্থাপত্য বিকশিত হয়েছে। আমির খসরু, রুমি, হাফিজ – এদের সবাই ছিলেন মুসলিম কবি এবং সংগীতজ্ঞ। তাদের সৃষ্টিই ইসলামি সভ্যতাকে সমৃদ্ধ করেছে।
কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে যারা ইসলামের নাম করে সংগীত শিক্ষার বিরোধিতা করছে, তারা আসলে ইসলামের সেই সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে অস্বীকার করছে। তারা একটি সংকীর্ণ, মৌলবাদী ব্যাখ্যা চাপিয়ে দিতে চাইছে, যা আসলে ইসলামের নয়, বরং একটি বিশেষ রাজনৈতিক এজেন্ডার অংশ। ইউনুস সরকার এই এজেন্ডাকে ব্যবহার করছে নিজেদের অবৈধ ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে।
জুলাইয়ের দাঙ্গার পর থেকে বাংলাদেশে যা ঘটছে, তা একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া। প্রথমে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল, তারপর প্রশাসনে নিজেদের লোক বসানো, এবং এখন শিক্ষা ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ। পরবর্তী পদক্ষেপ হবে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ, বিচার ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ এবং নাগরিক সমাজকে দমন। এটাই স্বৈরতন্ত্রের চিরাচরিত পথ, এবং ইউনুস-ওয়াকার জোট সেই পথেই হাঁটছে।
প্রশ্নটা শুধু সংগীত শিক্ষক নিয়োগের নয়, প্রশ্নটা হলো কী ধরনের বাংলাদেশ আমরা চাই – একটি বহুত্ববাদী, সৃজনশীল, উন্মুক্ত সমাজ, নাকি একটি সংকীর্ণ, নিয়ন্ত্রিত, মৌলবাদী রাষ্ট্র।
ইউনুস এবং ওয়াকার তাদের পছন্দ পরিষ্কার করে দিয়েছেন। তারা চায় দ্বিতীয়টি। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাস, তার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য – সবই প্রথমটির পক্ষে। সংগীত শিক্ষক বিতর্ক তাই কেবল একটি শিক্ষানীতির প্রশ্ন নয়, এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যতের প্রশ্ন।
আরো পড়ুন

