Share
নিজস্ব প্রতিবেদক
কুমিল্লার তৌহিদুল ইসলামের ভাই আবুল কালাম আজাদের গলায় যে অসহায়ত্ব, সেটাই আসলে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের আসল চিত্র। “আমরা তো আর তাদের সাথে পারবো না। তারা তো ক্ষমতাশালী। বিচার তো আর হবে না।” একটা মানুষ যখন এভাবে হাল ছেড়ে দেয়, তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্রযন্ত্রটা কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠেছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে যা হয়েছিল, সেটা নিয়ে এখন আর কেউ খোলামেলা কথা বলে না। বলতে পারে না। কিন্তু সত্যটা তো চাপা থাকে না। গোটা দেশজুড়ে একটা সুপরিকল্পিত দাঙ্গা বাঁধানো হয়েছিল। পুলিশ বক্স পোড়ানো হয়েছিল, সরকারি অফিস জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আর সেই বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে যারা, তারা এখন আইনের কথা বলছে।
মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার দেড় বছর পার করেছে। এই সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধ হয়নি, উল্টো চলতেই আছে। অধিকারের হিসাবে ৪০ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরে মারা গেছেন ১১ জন। পুলিশ, সেনাবাহিনী, যৌথবাহিনী – সবাই জড়িত। আর সরকার? সরকার শুধু বলে যাচ্ছে, সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। কিন্তু কাউকে আনা হয়েছে? একজনকেও?
মব লিঞ্চিং এর হিসাবটা আরও ভয়াবহ। ১৪ মাসে ১৫৩ জন মানুষকে জনতা পিটিয়ে মেরেছে। শুধু এই সেপ্টেম্বরেই ১৮টা ঘটনা। মানে প্রায় প্রতি দুই দিনে একটা করে। এই যে আইনের শাসন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে, এটা কি এমনি এমনি হয়? নাকি ইচ্ছা করেই এই বিশৃঙ্খলা টিকিয়ে রাখা হচ্ছে?
রাজনৈতিক সহিংসতার সংখ্যা আরও চমকে দেওয়ার মতো। সাড়ে সাত হাজারেরও বেশি ঘটনা। এর মধ্যে মারা গেছেন ২৮১ জন। মার্চ মাসে একমাসেই ৪৪ জন। এটাকে কি স্বাভাবিক বলা যায়? একটা সরকার যদি সত্যিই শান্তি চায়, তাহলে কি এতগুলো মানুষ মরতে পারে?
সাংবাদিকদের ওপর হামলা হয়েছে ২৪২টা। যারা সত্য বলার চেষ্টা করছেন, তাদের চুপ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সেপ্টেম্বরে ৩৪টা হামলা। মার্চে ৩০টা। মানে যে মাসগুলোতে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক সহিংসতা, সেই মাসগুলোতেই সাংবাদিকরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। কাকতালীয়?
আদিলুর রহমান খান এখন সরকারের উপদেষ্টা। যিনি এতদিন বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে কথা বলতেন, তিনি এখন ফোনের জবাবই দিচ্ছেন না। অধিকারের পরিচালক নাসির উদ্দিনও মন্তব্য করতে রাজি হননি। কেন? কারণ তারা জানেন, এখন কথা বললে বিপদ হবে। তারা যে সিস্টেমের অংশ হয়ে গেছেন, সেটার বিরুদ্ধে আর কথা বলা যায় না।
তৌহিদুলের ঘটনায় ক্যান্টনমেন্টে ডেকে সান্ত্বনা দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে বিচার হবে। কিন্তু হয়নি। স্থানীয় বিএনপি নেতারা চাপ দিয়েছে চুপ থাকতে। হুমকি দিয়েছে। আর তৌহিদুলের ভাই বলছেন, “বিচার না পেলে আমরা আর কী করবো?” এই প্রশ্নের জবাব কার কাছে আছে?
আইএসপিআর কোনো মন্তব্য করেনি। পুলিশ বলেছে, খোঁজখবর নিয়ে পরে বলা হবে। প্রধান উপদেষ্টার সহকারী প্রেস সচিব ফয়েজ আহম্মদ বলেছেন, বন্দুকযুদ্ধ তো হতেই পারে। মানে সরকারের কোনো অংশই দায় নিতে রাজি নয়। সবাই পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে।
নূর খান, যিনি গুম কমিশনের সদস্য, তিনিই বলছেন, “এভাবে চলতে থাকলে পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যাবে।” কাজী রিয়াজুল হক, যিনি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান, তিনি বলছেন, “সরকার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।” এরা তো সরকারের বাইরের মানুষ নন। এরাই বলছেন পরিস্থিতি ভয়াবহ।
দেড় বছরেও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সক্রিয় করা হয়নি। কিন্তু জাতিসংঘকে অফিস খুলতে দেওয়া হয়েছে। মানে নিজের দেশের প্রতিষ্ঠান নয়, বিদেশিদের চোখে ভালো থাকাটা বেশি জরুরি।
এই যে গোটা ব্যবস্থা, এটা আসলে ভয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। লোকজন ভয় পায় বলেই চলছে। তৌহিদুলের ভাই যেমন বলেছেন, “তারা তো ক্ষমতাশালী।” এই ক্ষমতাশালীরা জানে, ভয় যতদিন থাকবে, ততদিন প্রশ্ন করার সাহস কারো হবে না। বিচার চাওয়ার সাহস হবে না। আর বিচার না হলে যা খুশি করা যায়।
ইউনূসের সরকার যেভাবে এসেছে, সেটাই তো প্রমাণ করে দেয় তারা কীসে বিশ্বাস করে। আইনে না, শক্তিতে। নির্বাচনে না, রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে। সেই আগুন এখনো নেভেনি। শুধু রূপ বদলেছে। আগে পুলিশ বক্স পোড়ানো হতো, এখন মানুষ মরছে হেফাজতে। আগে রাস্তায় মারামারি হতো, এখন যৌথবাহিনীর হাতে খুন হচ্ছে।
আর সবচেয়ে বড় কথা, এই হত্যাকাণ্ডগুলো বন্ধ হবে কীভাবে? যারা নিজেরাই সহিংসতার মধ্য দিয়ে এসেছে, তারা কি আসলেই শান্তি চায়? নাকি এই বিশৃঙ্খলাটাই তাদের ক্ষমতায় টিকে থাকার উপায়? ভয় না থাকলে তো মানুষ প্রশ্ন করবে। প্রশ্ন করলে জবাব দিতে হবে। জবাব দিতে না পারলে ক্ষমতা যাবে। তাই ভয়টা রাখতেই হবে।
এই সরকার মুখে যা-ই বলুক, কাজে কিছুই করছে না। করবেও না। কারণ তাদের অস্তিত্বই নির্ভর করছে এই বিশৃঙ্খলার ওপর।বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধ মানে আইনের শাসন ফিরে আসা। আইনের শাসন মানে তাদের জবাবদিহিতা। আর জবাবদিহিতা মানে তাদের শেষ। তাই যতদিন তারা ক্ষমতায় থাকবে, ততদিন এই হত্যাকাণ্ড চলবেই। এটাই বাস্তবতা।
আরো পড়ুন

