Friday, January 30, 2026

সিঙ্গাপুরি কোম্পানির হাত ধরে আমেরিকান গম কেনার নামে আসলে যা হচ্ছে…

Share

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর নামে গম কেনা হবে সরকার-থেকে-সরকার পদ্ধতিতে। শুনতে ভালো লাগে। মনে হয় অন্তত এবার স্বচ্ছতা থাকবে, মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমবে। কিন্তু ৬ লাখ ৬০ হাজার টন গম কেনার যে প্রক্রিয়া চলছে, তাতে আমেরিকান গমের টাকা যাচ্ছে সিঙ্গাপুরের একটি বেসরকারি কোম্পানির পকেটে। এগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনাল নামের এই প্রতিষ্ঠানটি আমেরিকার শীর্ষ গম রফতানিকারকদের তালিকায়ও নেই। তাহলে কেন তাদের হাত ধরে কেনাকাটা? সরকার-থেকে-সরকার চুক্তিতে তৃতীয় দেশের বেসরকারি কোম্পানি কীভাবে ঢুকে পড়ল?

খাদ্য মন্ত্রণালয় বলছে, ইউএস হুইট অ্যাসোসিয়েটসের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে, তারাই এগ্রোকর্পকে মনোনীত করেছে। কিন্তু ইউএস হুইট নিজেই তো আমেরিকান সরকারের প্রতিষ্ঠান নয়। এটি গম উৎপাদকদের একটি সংগঠন মাত্র, যারা রফতানি বাজার বাড়াতে কাজ করে। তাদের তহবিল আসে বেসরকারি খাত আর কিছু সরকারি অনুদান থেকে। তাহলে এই লেনদেনটা সরকার-থেকে-সরকার হলো কোন হিসেবে? আমেরিকার কৃষি বিভাগ বা সরকার এই চুক্তির কোথাও সরাসরি নেই। টাকার লেনদেন হচ্ছে সিঙ্গাপুরের ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে, আমেরিকান আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর কথা বলা হলেও টাকাটা তো যাচ্ছে সিঙ্গাপুরে। আমেরিকার একটি রফতানিকারক কোম্পানি ই-মেইলে এই বিষয়টি তুলে ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা পরিষ্কার বলেছে, তৃতীয় দেশের কোম্পানির অংশগ্রহণ আমেরিকার বাণিজ্য নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এমনকি এই লেনদেনকে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্যের অংশ হিসেবে গণ্য করাটাই প্রশ্নবিদ্ধ, যখন টাকাপয়সা আমেরিকান ব্যাংকিং সিস্টেমের বাইরে চলে যাচ্ছে।

তিন দফায় যে ২ লাখ ২০ হাজার টন করে গম কেনা হয়েছে বা হচ্ছে, প্রতিবার দাম বাড়ছে। জুলাইয়ে যেখানে প্রতি টন ৩০২ দশমিক ৭৫ ডলার ছিল, অক্টোবরে তা ৩০৮ ডলার, এখন ৩১২ দশমিক ২৫ ডলার। স্থানীয় ও আমেরিকান ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারদরের তুলনায় এই দাম বেশি। যে মানের গম কেনা হচ্ছে, সেটার জন্য এত টাকা দেওয়ার যুক্তি কী? আর যখন সরকার-থেকে-সরকার চুক্তির কথা বলা হচ্ছে, তখন আমেরিকার শীর্ষ রফতানিকারকদের বাদ দিয়ে সিঙ্গাপুরের একটি তুলনামূলক অপরিচিত কোম্পানির কাছ থেকে কেনার সিদ্ধান্ত কতটা বিবেকবান?

এগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনাল ১৯৯০ সালে যাত্রা শুরু করেছিল মিয়ানমার-কেন্দ্রিক ব্যবসা নিয়ে। এর প্রতিষ্ঠাতা ভারতীয় উদ্যোক্তা বিজয় অয়েঙ্গার। কোম্পানিটি ২০২২ সালে বাংলাদেশে প্রতিনিধি কার্যালয় খুলেছে। এখন তারা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করছে। কিন্তু কীভাবে এই কোম্পানি আমেরিকান গম সরবরাহের ঠিকাদার হয়ে উঠল, সে প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কার নয়।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার বেসরকারি খাত থেকে কিনতেই পারে, কিন্তু সেটাকে সরকার-থেকে-সরকার চুক্তি বলা যায় না। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম স্পষ্ট করে বলেছেন, সরকার-থেকে-সরকার বলতে দুই দেশের সরকার বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সরাসরি লেনদেন বোঝায়। তৃতীয় কোনো বেসরকারি পক্ষ থাকার কথা নয়। এই নিয়ম না মানলে পুরো প্রক্রিয়াটাই আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার বলছেন, ইউএসডিএর অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে কিনছি বলে এটা সরকার-থেকে-সরকার। স্থানীয় এজেন্ট কে থাকবে সেটা তাদের ব্যাপার। কিন্তু এই যুক্তি ধোপে টেকে না। প্রথমত, ইউএস হুইট নিজেই সরকারি সংস্থা নয়। দ্বিতীয়ত, এগ্রোকর্প আমেরিকার কোম্পানিই নয়, তারা সিঙ্গাপুরের। তৃতীয়ত, টাকার লেনদেন হচ্ছে আমেরিকান ব্যবস্থার বাইরে। এই তিনটি বিষয়ই সরকার-থেকে-সরকার চুক্তির মূল শর্তের বিরোধী।

সবচেয়ে বড় কথা, স্বচ্ছতা কোথায়? সরকার-থেকে-সরকার চুক্তির মূল উদ্দেশ্যই হলো মধ্যস্বত্বভোগী বাদ দিয়ে স্বচ্ছতা আনা, সাশ্রয় করা। কিন্তু এখানে তো উল্টো হচ্ছে। একটি তৃতীয় দেশের বেসরকারি কোম্পানি বসে যাচ্ছে মাঝখানে, যাদের আমেরিকান গম রফতানিতে তেমন পরিচিতিই নেই। দাম বাড়ছে তিন দফায় তিনবার। আর বাংলাদেশের জনগণের পকেট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা, সেটা আমেরিকায় না গিয়ে থামছে সিঙ্গাপুরে।

জুলাইয়ের পর যারা ক্ষমতায় এসেছেন, তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে যে ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেখানে জনগণের স্বার্থের চেয়ে অন্য হিসাবনিকাশই বড় হয়ে উঠছে বলে অনেকের সন্দেহ। গম কেনার এই প্রক্রিয়া সেই সন্দেহকে আরও গাঢ় করছে। আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের নামে, বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর নামে আসলে কার পকেট ভরছে, সেটা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে।

একটা সরকার যখন অবৈধভাবে ক্ষমতায় আসে, তখন তার বৈধতা তৈরির জন্য নানা ধরনের কৌশল নিতে হয়। বিদেশি শক্তির তোষণ তার একটা। এই গম চুক্তি কি সেই তোষণেরই অংশ? নাকি এখানে ব্যক্তিগত স্বার্থ জড়িত? যেভাবে একটি অপরিচিত সিঙ্গাপুরি কোম্পানি হঠাৎ এত বড় চুক্তি পেয়ে গেল, তাতে এই প্রশ্নগুলো অমূলক নয়।

সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো, দেশের মানুষ এখন আর অবাক হয় না। নতুন করে দুর্নীতি বা অনিয়মের খবর এলে মনে হয় এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু স্বাভাবিক করে নিলেই কি দায় শেষ? যে টাকায় গম কেনা হচ্ছে, সেটা তো জনগণের কষ্টার্জিত করের টাকা। প্রতিটি টাকার হিসাব দেওয়ার দায় সরকারের আছে। সেই দায় এড়িয়ে গেলে, মিথ্যা নামে চুক্তি করলে, জনগণকে ধোঁকা দিলে তার জবাব কোথাও না কোথাও দিতেই হবে।

এই চুক্তি নিয়ে যে আমেরিকান কোম্পানি আপত্তি জানিয়েছে, তারা তো ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণেই করেছে। কিন্তু তাদের আপত্তির মধ্যে যে যুক্তি আছে, সেটা উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। তারা পরিষ্কার বলেছে, এই ব্যবস্থায় আমেরিকার অর্থনীতি বা বাণিজ্যের কোনো লাভ হচ্ছে না। তাহলে বাংলাদেশের কী লাভ হচ্ছে? নাকি শুধু কিছু ব্যক্তি আর মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটই ভারী হচ্ছে?

জনগণের কাছে এই চুক্তির পুরো বিবরণ জানার অধিকার আছে। কেন সিঙ্গাপুরের কোম্পানি, কেন বাড়তি দাম, কেন আমেরিকান শীর্ষ রফতানিকারকদের বাদ দিয়ে এই পথ, এসব প্রশ্নের জবাব চাই। যদি সব কিছু ঠিকঠাক থাকে, তাহলে লুকানোর কী আছে? আর যদি কিছু গোলমাল থাকে, তাহলে জনগণ জানুক। কারণ এটা তাদের অধিকার, তাদের টাকা, তাদের দেশ।

আরো পড়ুন

সদ্য প্রকাশিত