Friday, January 30, 2026

মুক্তিযুদ্ধ যাদের চক্ষুশূল, তাদের আমলে শহীদ মিনার অবমাননা স্বাভাবিক

Share

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় শহীদ মিনারে জুতা পায়ে ওঠার যে ঘটনা ঘটেছে, সেটা নিয়ে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা যখন ক্ষোভ প্রকাশ করছেন, তখন বর্তমান প্রশাসন থেকে কোনো শক্ত প্রতিক্রিয়া আসেনি। ব্যাপারটা অবাক করার মতো নয়, কারণ গত বছর জুলাই থেকে যারা দেশ চালাচ্ছেন, তাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্নগুলো কতটা গুরুত্ব পায়, সেটা এরই মধ্য পরিষ্কার হয়ে গেছে।

ডিসেম্বর মাস চলছে। এই মাসেই দেশ স্বাধীন হয়েছিল। এই মাসেই লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছিলাম। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সেই ইতিহাসটাই যেন অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে কিছু মহলের কাছে। শহীদ মিনারে জুতা পায়ে ওঠা মানুষগুলোকে জবাবদিহির মুখে না ডাকলে বোঝা যায় কোন দিকে বাতাস বইছে।

মুহাম্মদ ইউনুস এবং তার তথাকথিত অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের জুলাইয়ের গণবিক্ষোভের সময় দেশব্যাপী যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল, সেই সুযোগে ক্ষমতায় এসেছেন। নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে দিয়ে যারা এভাবে দায়িত্ব নিয়েছেন, তাদের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তো আছেই, কিন্তু তার চেয়ে বড় সমস্যা হলো তারা কাদের সমর্থন নিয়ে এখানে এসেছেন। জঙ্গি সংগঠনগুলো যে সেই সময় সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল, সেটা এখন আর গোপন বিষয় নয়। বিদেশি অর্থায়ন আর সামরিক বাহিনীর একাংশের প্রত্যক্ষ মদদে এই পরিবর্তন এসেছে, সেই বাস্তবতাও আমরা সবাই জানি।

এখন প্রশ্ন হলো, এরকম একটা পটভূমিতে যারা ক্ষমতায় আছেন, তারা কি আদৌ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষায় আগ্রহী? শহীদ মিনার অবমাননার ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা না বলে মন্তব্য করা যাবে না, এই যে অজুহাত, এটা কি আসলে দায় এড়ানোর চেষ্টা নয়? কোটালীপাড়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেছেন তিনি ভিডিও দেখেছেন, কিন্তু কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না। এই যে জবাবদিহিহীনতা, এটাই তো এখনকার সরকারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মো. মারুফ শেখ এবং তার সমর্থকরা শহীদ মিনারে জুতা পায়ে উঠে পড়েছেন, সেখানে নির্বাচনি সমাবেশ করেছেন। এটা শুধু একটা ছোটখাটো ভুল বা অসচেতনতা নয়। এটা সরাসরি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসকে অসম্মান করা। কিন্তু ঘটনার পর প্রার্থীর ফোন বন্ধ, তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে না। আর সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো শক্ত পদক্ষেপের খবর নেই।

মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ যথার্থই বলেছেন, যেখানে ফুল দিয়ে শহীদদের শ্রদ্ধা জানাই, সেখানে জুতা পায়ে উঠে অশ্রদ্ধা করা হলো। তাহলে আমরা শহীদদের জন্য কী করলাম? এই প্রশ্নের উত্তর কিন্তু শুধু এই ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের যে দিকে যাত্রা, সেখানেই এর উত্তর লুকিয়ে আছে।

ইউনুস এবং তার দল নোবেল পুরস্কার বিজয়ীর আবরণে যতই ঢাকা থাকুন না কেন, তাদের ক্ষমতায় আসার পেছনের শক্তিগুলো কিন্তু পরিষ্কার। মাইক্রোক্রেডিট নিয়ে যে বিতর্ক দেশে-বিদেশে আছে, সেটা তো আছেই। কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা হলো, গরিব মানুষকে চড়া সুদে ঋণ দিয়ে মুনাফা করা একজন মানুষ কীভাবে হঠাৎ দেশের ত্রাণকর্তা হয়ে গেলেন, সেটা বুঝতে খুব বেশি বুদ্ধির প্রয়োজন নেই।

জুলাইয়ের সেই দাঙ্গা, সহিংসতা, রাস্তায় রক্তপাত, এই সবকিছু পরিকল্পিত ছিল না, এটা বিশ্বাস করা কঠিন। বিদেশি অর্থায়ন ছাড়া এত বড় পরিসরে, এত সংগঠিতভাবে এরকম ঘটনা ঘটানো সম্ভব নয়। আর জঙ্গি সংগঠনগুলোর সক্রিয়তা তো সেই সময় চোখে পড়ার মতোই ছিল। সামরিক বাহিনীর একাংশ যে ভূমিকা রেখেছিল, সেটাও পরিষ্কার। একটি নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে এভাবে অবৈধভাবে ক্ষমতায় আসা মানে কী, সেটা তো ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে।

এখন সেই অবৈধ সরকারের আমলে শহীদ মিনারে জুতা পায়ে ওঠার ঘটনা ঘটছে। আর কোনো শক্ত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। এই নীরবতা আসলে সম্মতিরই আরেক রূপ। যারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে মুছে ফেলতে চান, যারা এই দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের গৌরবকে ছোট করে দেখতে চান, তাদের জন্য এই ধরনের ঘটনা মোটেও অস্বস্তিকর নয়। বরং এটা তাদের এজেন্ডারই অংশ।

ডিসেম্বর মাসে এই ঘটনা ঘটল, এটা নিছক কাকতালীয় নয়। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, শহীদদের প্রতি সম্মান, দেশের ইতিহাস, এসবকে এখন আর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। বরং যারা এসবকে অসম্মান করছে, তাদের ছাড় দেওয়া হচ্ছে।

ইউনুস সরকার আর কতদিন টিকবে, সেটা সময়ই বলবে। কিন্তু তারা যে ক্ষতি করে যাচ্ছে, সেটা দীর্ঘমেয়াদী। দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, এসব কিছুকেই তারা ধীরে ধীরে ক্ষয় করে দিচ্ছে। শহীদ মিনার অবমাননার মতো ঘটনা যখন কোনো শাস্তি ছাড়াই পার পেয়ে যায়, তখন বুঝতে হবে দেশ কোন দিকে যাচ্ছে।

আরো পড়ুন

সদ্য প্রকাশিত