হাদি ইস্যুতে মঞ্চায়িত হতে যাচ্ছে জজ মিয়া নাটক!

Share

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির ওপর বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে তিনি মুমূর্ষু অবস্থায় রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তবে তার ওপর এই হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও একটি জজ মিয়া নাটক মঞ্চায়িত হচ্ছে।

রাজধানীর বিজয়নগরে গতকাল শুক্রবার দুপুরে গুলিবিদ্ধ হয়ে লাইফ সাপোর্টে রয়েছেন ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদি। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে একে অপরকে দোষারোপ করছে জামায়াত ও বিএনপি। এতে জজ মিয়ার মতো ঘটনা পুনরায় দেখার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কিন্তু কে এই জজ মিয়া।

২০০৪ সালের ২১ আগস্টগ্রেনেড হামলায় হতাহত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি আরেকটি নাম ঘুরে ফিরে আসে। তিনি জজ মিয়া। এ ঘটনায় তদানীন্তন চার দলীয় জোট সরকার যে মামলা সাজায় তাতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র করা হয়েছিল তাকে। মামলাটির অন্যতম আসামি ছিলেন তিনি। মামলায় তাকে হামলায় অংশগ্রহণকারী হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু, এতবড় ঘটনাটি নোয়াখালীর একজন সাধারণ মানুষ কী করে বাস্তবায়ন করলেন সেই সূত্র না মেলায় গোয়েন্দা সংস্থার সাজানো এই চিত্রনাট্যটি গণমাধ্যমসহ সব মহলে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

হামলার শিকার আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাসহ দলীয় রাজনৈতিক নেতারাও সাফ জানিয়ে দেন ষড়যন্ত্রের বলি হয়েছেন জজ মিয়া।
একইভাবে ওসমান হাদির বেলাতেও একই ঘটনা দেখা যাচ্ছে। তার ওপর হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে একে অপরকে দোষারোপ করছে জামায়াত ও বিএনপি। আবার সরকার ও এনসিপির পক্ষ থেকে দোষারোপ করা হচ্ছে আওয়ামী লীগকে। এতে প্রকৃত হামলাকারী পার পেয়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরই তার সঙ্গে থাকা একজনকে বলতে শোনা যায়, এটি মির্জা আব্বাসের কাজ। হামলার মাত্র ১৫-২০ মিনিটের মধ্যেই ডাকসুর সাবেক ভিপি ও জামায়াতের কুখ্যাত ছাত্রনেতা সাদিক কায়েম তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রথম পোস্টে লেখেন- “ওসমান হাদিকে গুলি করা হলো। চাঁদাবাজ ও গ্যাংস্টারদের কবল থেকে ঢাকা সিটিকে মুক্ত করতে অচিরেই আমাদের অভ্যুত্থান শুরু হবে। রাজধানীর ছাত্র-জনতাকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।”

একটি শব্দও হাদীর জন্য দোয়া বা সহানুভূতি নেই। শুধু উসকানি আর ‘অভ্যুত্থানের’ হুমকি।

গোয়েন্দা ও রাজনৈতিক সূত্র বলছে, পুরো ঘটনাটির পেছনে আসলে জামায়াতেরই হাত। ঢাকা-৮ আসনটি ঢাকার বাণিজ্যিক কেন্দ্র – বছরে ৪৫০ থেকে ৫৫০ কোটি টাকার চাঁদাবাজির স্বর্গরাজ্য। এই আসনের বিএনপির এমপি প্রার্থী মির্জা আব্বাস। এবার জামায়াত চায় পুরোপুরি দখল নিতে। আর সেই দখলের জন্য মনোনীত প্রার্থী সাদিক কায়েম নিজেই।

জামায়াতের পরিকল্পনা ছিল দুই ধরনের। প্রথমে হাদিকে সরিয়ে দেওয়া। তারপর তার লাশের ওপর দাঁড়িয়ে বিএনপি গুলি করেছে বলে সিম্প্যাথি ভোট লুট করা। হামলার আগের রাতেই গুলশানের একটি ফ্ল্যাটে সাদিক কায়েমের সঙ্গে জামায়াতের শীর্ষ কয়েকজন নেতার গোপন বৈঠক হয়েছিল – এ তথ্যও এখন সামনে আসছে।

এরইমধ্যে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হামলাকারী জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে জড়িত। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রনেতা তদন্তের আগেই মির্জা আব্বাসের নাম বলে দিলেন। শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) দুপুরে নয়াপল্টনে এক বিক্ষোভ মিছিলের আগে সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ওইদিক সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো একটি ছবির বিষয়ে মুখ খুললেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ভিপি সাদিক কায়েম। সেখানে দেখা যায়, শ্যুটার বলে যাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে তার সঙ্গে চা খাচ্ছেন সাদিক কায়ে। সম্প্রতি এক বক্তব্যে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ওই ছবির সঙ্গে সাদিক কায়েমের সম্পৃক্ততা নিয়ে অভিযোগ তোলেন। ছবিটিকে এআই দিয়ে তৈরি দাবি করে রিজভীকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এরইমধ্যে শিবির পরিচালিত বিভিন্ন ফ্যাক্টচেক সংস্থা থেকে ওই ছবি এআই দিয়ে তৈরি ছবি জানানো হয়েছে।

এবার আসা যাক সরকার ও পুলিশের ভাষ্যে। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদিকে হত্যাচেষ্টায় জড়িত প্রধান সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে ‘শিগগিরই’ আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী। এরইমধ্যে একজনকে শ্যুটার হিসেবে চিহ্নিত করে দিয়েছে ডিএমপি। তবে তিনি আসলেও শ্যুটার কি না তার বিষয়ে কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি বাহিনীটি। চাপে পড়ে আসামিদের ধরতে এরইমধ্যে ৫০ লাখ টাকা পুরস্কারও ঘোষণা করেছে পুলিশ। অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ফেসবুকে বলেছেন, জুলাইতে ওরা শত শত স্বাধীনতাকামী মানুষকে খুন করেছে। তারপর ভারতে পালিয়ে গিয়েও খুনের হুমকি দিচ্ছে, খুন করছে। ওদের ‘খুনের জুলাই’ চলমান।

এখানে স্পষ্ট আওয়ামী লীগের ওপর দায় চাপানো হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস বলেছেন, ‘আমরা কোনো অবস্থাতেই এই ধরনের ষড়যন্ত্রকে সফল হতে দেব না। আঘাত যাই আসুক, যত ঝড়-তুফান আসুক, কোনো শক্তিই আগামী নির্বাচনকে বানচাল করতে পারবে না।’ এখানেও তিনি আওয়ামী লীগের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন।

এ পুরো ঘটনা থেকে স্পষ্ট যে, হাদির ওপর হামলার ঘটনায় যে যার মতো রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব কারণে সরকার আরেকটি জজ মিয়া নাটক মঞ্চায়ন হওয়ার উপক্রম তৈরি হয়েছে। হয়তো শিগগিরই জাতি সেই নাটক আবারও দেখবে।

আরো পড়ুন

সদ্য প্রকাশিত