Share
ট্রাম্পের সি৫ জোট গঠনের খবরটা শুনে ইউনুস সরকারের মাথায় হাত পড়ার কথা। যে আমেরিকা আর ইউরোপের ভরসায় জুলাই মাসে রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়ে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা হলো, সেই আমেরিকাই এখন রাশিয়া আর ভারতকে নিয়ে নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়তে চাইছে। এর চেয়ে বড় রাজনৈতিক ধাক্কা আর কী হতে পারে ইউনুস গংয়ের জন্য? এখন এখন কার কোলে মাথা রাখবে তারা?
পলিটিকো আর ডিফেন্স ওয়ানের রিপোর্ট অনুযায়ী এই সি৫ জোটে থাকছে আমেরিকা, চীন, রাশিয়া, ভারত আর জাপান। লক্ষ করার বিষয়, ইউরোপের কোনো দেশ নেই এই তালিকায়। যে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মদদে ইউনুস ক্ষমতায় এসেছিলো, যারা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একের পর এক বিবৃতি দিয়েছিলো, তাদেরকেই এখন নতুন বৈশ্বিক ক্ষমতা কাঠামো থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলপত্রে লেখা হয়েছে ইউরোপ সভ্যতার দিক থেকে বিলুপ্তির পথে। এটা শুধু কূটনৈতিক ভাষা নয়, এটা পশ্চিমা বিশ্বের ক্ষমতার ভারকেন্দ্র স্থানান্তরের ঘোষণা।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ইউনুস সরকার কার ভরসায় টিকে থাকবে? যে ভারত-বিরোধী অবস্থান নিয়ে তারা ক্ষমতায় এসেছে, যে রাশিয়াকে শত্রু ভেবে পশ্চিমা শিবিরে যোগ দিয়েছে, সেই ভারত আর রাশিয়াই এখন আমেরিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হতে যাচ্ছে। ইউনুস সরকার যখন ভারতের সাথে সম্পর্ক খারাপ করে পাকিস্তান আর চীনের দিকে ঝুঁকছিলো, তখন কি তারা ভেবে দেখেছিলো আন্তর্জাতিক রাজনীতি এত দ্রুত পাল্টে যেতে পারে?
জুলাই মাসের সেই রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের পেছনে কারা ছিলো, এটা এখন আর গোপন কিছু নয়। বিদেশি অর্থায়ন, জঙ্গি সংগঠনের সহায়তা, আর সামরিক বাহিনীর একাংশের মদদে পুরো দেশকে অস্থিতিশীল করে ফেলা হয়েছিলো। শত শত তরুণকে হত্যা করা হয়েছে, পুলিশ-প্রশাসনকে ভেঙে ফেলা হয়েছে, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। এই সবকিছুর পেছনে একটাই উদ্দেশ্য ছিলো, শেখ হাসিনার সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া। কিন্তু কেন? কারণ শেখ হাসিনা ছিলেন এই অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের মূল স্তম্ভ। তিনি ভারত-চীন-রাশিয়া সবার সাথেই সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলতে পেরেছিলেন। পশ্চিমাদের চাপ সামলে নিজের দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে পেরেছিলেন।
ইউনুস সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতের সাথে সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছে। সীমান্তে উত্তেজনা বেড়েছে, বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, নিরাপত্তা সহযোগিতা বন্ধ হয়ে গেছে। রাশিয়ার সাথেও কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার সুরে সুর মিলিয়ে চলার চেষ্টা করা হয়েছে। এখন যখন আমেরিকা নিজেই রাশিয়া-ভারতকে সাথে নিয়ে নতুন বৈশ্বিক কাঠামো গড়তে চাইছে, তখন বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়?
ট্রাম্পের এই সি৫ পরিকল্পনা প্রমাণ করে দিচ্ছে যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্থায়ী শত্রু বা মিত্র বলে কিছু নেই, আছে শুধু স্বার্থ। আমেরিকা তার নিজের স্বার্থে এখন রাশিয়ার সাথে হাত মিলাতে চাইছে। মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা আনতে, চীনকে সামলাতে, নতুন বৈশ্বিক শক্তিভারসাম্য তৈরি করতে। কিন্তু বাংলাদেশে যারা আমেরিকার নামে ক্যু করেছে, তারা কি এই সত্যটা বুঝতে পেরেছিলো যে তাদেরকে ব্যবহার করা হচ্ছে শুধুমাত্র একজন শক্তিশালী নেতাকে সরিয়ে দিতে?
ইউনুসের সবচেয়ে বড় ভুল হলো তিনি মনে করেছিলেন পশ্চিমা সমর্থন একটা স্থায়ী জিনিস। তিনি ভুলে গেছেন যে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এমন একটা জায়গায় যেখানে ভারত-চীন-রাশিয়া, সবার স্বার্থ জড়িত। শেখ হাসিনা এই জটিল ভূরাজনৈতিক সমীকরণ বুঝতেন, সেজন্য তিনি সবার সাথে সম্পর্ক রেখে চলতেন। কিন্তু ইউনুস একচোখা নীতি নিয়ে চলতে শুরু করেছেন, আর তার ফলাফল এখন দেখা যাচ্ছে।
আরও বিপজ্জনক বিষয় হলো, বাংলাদেশে এখন যে অস্থিতিশীলতা চলছে, সেটা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য হুমকি হয়ে উঠছে। জঙ্গিবাদের উত্থান, সংখ্যালঘু নির্যাতন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, এসব কিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ একটা বিপজ্জনক দিকে এগোচ্ছে। আর এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে একটা অবৈধ ক্যুর মাধ্যমে।
যে আওয়ামী লীগ সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলো, যে সরকার বাংলাদেশকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো, যে সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদা বাড়িয়েছিলো, তাদেরকে উৎখাত করে যে অবৈধ সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তারা এখন কোন মুখে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে যাবে? যে পশ্চিমা দেশগুলো তাদের সমর্থন করেছিলো, তারাই এখন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। ট্রাম্প প্রশাসন যে সি৫ জোট গড়তে চাইছে, সেখানে ভারত আর রাশিয়া প্রধান সদস্য। এই দুই দেশের সাথে সম্পর্ক খারাপ করে বাংলাদেশ কীভাবে এই নতুন বৈশ্বিক কাঠামোতে নিজের জায়গা তৈরি করবে?
সত্যি বলতে, শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে যারা ভেবেছিলো বাংলাদেশকে তাদের পকেটে নিয়ে নেবে, তারা হিসাব কষতে ভুল করেছে। এই অঞ্চলে শান্তি আর স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে একজন অভিজ্ঞ, দক্ষ আর দূরদর্শী নেতৃত্বের দরকার ছিলো, যেটা শেখ হাসিনা দিতে পারতেন। এখন যখন বৈশ্বিক রাজনীতি আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, তখন বাংলাদেশ একটা অস্থির, দুর্বল আর অবৈধ সরকার নিয়ে বসে আছে।
আরো পড়ুন

