Share
নজরুল ইসলামের সমাধিস্থলে হাদিকে দাফন করা হয়েছে এমন খবর শুনে যারা বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও রাজনীতির গভীরে তাকান, তাদের কাছে বিষয়টি শুধু অবাক হওয়ার নয়, গভীরভাবে আঘাত পাওয়ার। নজরুল ইসলাম বাংলার কবি, বিদ্রোহী কবি, যিনি জীবদ্দশায় ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন।
তিনি ছিলেন সেই মানুষ, যিনি হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যিনি লিখেছিলেন “মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান”। সেই নজরুলের সমাধির পাশে, যিনি কখনো ধর্মীয় গোঁড়ামির পতাকা বহন করেননি, যিনি কখনো ধর্মের নামে রক্তপাতকে সমর্থন করেননি, সেই জায়গায় দাফন করা হলো এমন একজনকে, যে জুলাই দাঙ্গার মতো নৃশংসতার সাথে জড়িত ছিলেন, যে ধর্মের নামে মানুষ মারার রাজনীতি করেছেন, যে ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী ইসলামি বিপ্লবের নাম করে দেশকে অস্থির করেছেন।
নজরুলের পরিবারের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, নজরুলের পরিবার কি সত্যিই এই সিদ্ধান্তের পক্ষে? নজরুলের পরিবারের অর্ধেক এখনো ভারতে বাস করেন, যেখানে তারা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে থেকে বেঁচে আছেন। নজরুলের পরিবার কি সত্যিই চায় যে তাদের পূর্বপুরুষের সমাধিস্থল হবে ধর্মান্ধতার প্রতীক? নাকি এই অনুমতি আদায় করা হয়েছে চাপে, ভয়ে, বা রাজনৈতিক স্বার্থে?
হাদি যে ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী ইসলামি বিপ্লবের নাম করে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছেন, তা নতুন করে বলার কিছু নেই। তিনি সেই মানুষ, যিনি জুলাই দাঙ্গার মাধ্যমে দেশকে রক্তাক্ত করেছেন, যিনি ধর্মের নামে মানুষকে মানুষ মারতে উসকানি দিয়েছেন। নজরুলের সমাধির পাশে হাদিকে দাফন করা মানে নজরুলের স্মৃতিকে অপমান করা, মানে তার আদর্শকে পদদলিত করা। নজরুলের সমাধিস্থল বাংলার সংস্কৃতি, মানবতা এবং ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতীক। সেখানে ধর্মান্ধতার প্রতীককে জায়গা দেওয়া মানে সেই স্মৃতিকে কলঙ্কিত করা।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে যারা আছেন, তারা কারা? তারা সেই মানুষ, যারা সুদী মহাজন ইউনুসের মতো অর্থনৈতিক শোষক, যারা জামায়াতে ইসলামীর মতো ধর্মান্ধ জঙ্গি সংগঠনের সাথে হাত মিলিয়েছেন। ইউনুসের নাম শুনলেই মনে পড়ে যায় গ্রামীণ ব্যাংকের সেই কাহিনি, যেখানে গরিব মানুষের পিঠে ছুরি মারার রাজনীতি হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী তো সেই সংগঠন, যারা ৭১-এর যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত, যারা ধর্মের নামে মানুষ মারতে দ্বিধা করেনি। এই মানুষগুলোই এখন নজরুলের সমাধিস্থলকে ধর্মান্ধতার রাজনীতির মঞ্চ বানাতে চায়।
নজরুলের সমাধির পাশে হাদিকে দাফন করার অর্থ হল, নজরুলের আদর্শকে হত্যা করা। নজরুলের সমাধিস্থল বাংলার সংস্কৃতির প্রতীক, যেখানে ধর্ম, বর্ণ, গোত্রের ঊর্ধ্বে মানুষের মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সেখানে ধর্মান্ধতার প্রতীককে জায়গা দেওয়া মানে সেই আদর্শকে ধ্বংস করা। নজরুলের সমাধির পাশে হাদিকে দাফন করা মানে বলা যে, ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা এবং রক্তপাতের রাজনীতি বাংলার সংস্কৃতির অংশ।
যারা এই সিদ্ধান্তের পক্ষে, তারা কি ভুলে গেছেন নজরুলের সেই কবিতা—“ধর্ম যাহার যাহার নিজ নিজ ধর্মে থাকে/ মানুষের ধর্মে মানুষ থাক”? নজরুলের সমাধিস্থল বাংলার মানুষের, বাংলার সংস্কৃতির, বাংলার মানবতার। সেখানে ধর্মান্ধতার প্রতীককে জায়গা দেওয়া মানে বাংলার সংস্কৃতিকে অপমান করা, মানে নজরুলের স্মৃতিকে অপমান করা।
নজরুলের সমাধির পাশে হাদিকে দাফন করার সিদ্ধান্ত শুধু একটি ব্যক্তির সমাধির বিষয় নয়, এটি বাংলার সংস্কৃতি, বাংলার মানবতা এবং বাংলার ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্ন। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানে বাংলার সংস্কৃতিকে রক্ষা করা, মানে নজরুলের আদর্শকে রক্ষা করা। নজরুলের সমাধিস্থল বাংলার গর্ব, বাংলার মর্যাদা। সেখানে ধর্মান্ধতার প্রতীককে জায়গা দেওয়া মানে বাংলার মর্যাদাকে পদদলিত করা।
আরো পড়ুন

