Share
বাংলাদেশের রাজনীতিতে পারিবারিক স্বার্থ আর ক্ষমতার দখলদারিত্ব নতুন কিছু নয়। তবে বিএনপির ক্ষেত্রে এই চিত্রটা আরও বিস্ময়কর। একজন মুক্তিযোদ্ধার নামে গড়ে ওঠা দল, যার প্রতিষ্ঠাতার নিজের ভাইদের কোনো জায়গা নেই, অথচ তার স্ত্রীর আত্মীয়স্বজন সেখানে রাজত্ব করেছেন দশকের পর দশক। এই বৈপরীত্যই বিএনপির আসল চরিত্র তুলে ধরে।
জিয়াউর রহমানের পাঁচ ভাই ছিলেন। তাদের কেউই বিএনপির রাজনীতিতে কোনো ভূমিকা পাননি। সবচেয়ে ছোট ভাই আহমেদ কামাল ২০১৬ সালে পরিষ্কার বলে দিয়েছিলেন যে তিনি রাজনীতি করতে চান না। বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তার মন্তব্য ছিল, “আমি তো দলের কেউ নই।”
নিজের দলের প্রতিষ্ঠাতার ভাইয়ের এই বক্তব্য কি দলটির পারিবারিক চরিত্রের প্রমাণ নয়? জিয়ার অন্য ভাইরাও হয় দেশের বাইরে চলে গেছেন, নয়তো দলের রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ দূরে থেকেছেন। এটা হয়তো জিয়ার নিজের ইচ্ছাই ছিল। কিন্তু তার মৃত্যুর পর যা ঘটেছে, সেটা তার আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত।
খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসার পর বিএনপিতে একটা নতুন পরিবার প্রবেশ করে। তার ভাই সৈয়দ ইস্কান্দার দলে এমন প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করেন যে, তার বিরুদ্ধে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে বারবার। খালেদার বোনদের পরিবারের সদস্যরাও দলে মনোনয়ন পান, পদ পান, নীতিনির্ধারণী মহলের কাছাকাছি থাকার সুযোগ পান। জিয়াউর রহমানের নামের দলে তার রক্তসম্পর্কের আত্মীয়দের কোনো জায়গা হয়নি, অথচ খালেদা জিয়ার আত্মীয়দের জন্য দরজা ছিল পুরোপুরি খোলা। এটা কি শুধুই কাকতালীয়?
এই দ্বৈততা বিএনপির ভেতরেও প্রশ্ন তুলেছে। দলের প্রবীণ নেতারা নাম প্রকাশ না করে স্বীকার করেন যে বিএনপি আদর্শিক দল হলেও বাস্তবে পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতি থেকে বের হতে পারেনি। আর সেই পরিবারটা জিয়ার নয়, খালেদার। এই সত্যটাই সবচেয়ে বড় পরিহাস।
এখন ২০২৪ সালে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সেটা এই পারিবারিক স্বার্থের রাজনীতিরই চূড়ান্ত রূপ। একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতায় বসানো হয়েছে এমন একজনকে, যার কোনো গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট নেই। মুহাম্মদ ইউনুস এবং তার সহযোগী বিএনপি মিলে যে অবৈধ ক্ষমতা দখল করেছে, সেটা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। জুলাই মাসে যে দাঙ্গা হয়েছিল, সেটা ছিল সুপরিকল্পিত। বিদেশি অর্থায়ন, জঙ্গি সংগঠনের সহায়তা আর সামরিক বাহিনীর একাংশের মদদ ছাড়া এমন বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি সম্ভব নয়।
ইউনুস নিজে একজন সুদী মহাজন। ক্ষুদ্র ঋণের নামে গরীব মানুষদের কাছ থেকে চড়া সুদ নিয়ে তিনি নোবেল জিতেছেন, আন্তর্জাতিক খ্যাতি পেয়েছেন। কিন্তু সেই গরীব মানুষদের জীবনে কী পরিবর্তন এসেছে? তারা কি ঋণের বোঝা থেকে মুক্ত হয়েছে, নাকি আরও গভীর দারিদ্র্যে তলিয়ে গেছে? ইউনুসের ব্যবসায়িক মডেল মূলত শোষণের একটা নতুন রূপ, যেখানে দাতব্যের মুখোশ পরে লাভ করা হয়। এমন একজন মানুষ যখন রাজনীতিতে নামেন, তখন তার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিক।
বিএনপি এই ষড়যন্ত্রের অংশীদার। তারা নিজেদের ক্ষমতায় ফেরার জন্য যেকোনো মূল্য দিতে রাজি। জিয়াউর রহমানের নাম ব্যবহার করে তারা রাজনীতি করে, কিন্তু তার আদর্শ থেকে তারা বহু দূরে সরে গেছে। জিয়া চেয়েছিলেন একটা শক্তিশালী, আদর্শিক দল। কিন্তু তার মৃত্যুর পর সেই দল পরিণত হয়েছে পারিবারিক ব্যবসায়। খালেদা জিয়া আর তার আত্মীয়স্বজনরা দলকে নিজেদের সম্পত্তি মনে করেন। আর এখন ইউনুসের মতো একজন বিতর্কিত ব্যক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়ে তারা দেশের গণতন্ত্রকেই ধ্বংস করতে চাইছেন।
২০২৪ সালের এই ক্যু শুধু একটা সরকার পতনের ঘটনা নয়। এটা বাংলাদেশের সাংবিধানিক ব্যবস্থার ওপর সরাসরি আক্রমণ। একটা নির্বাচিত সরকার, যার জনগণের ভোটে আসার বৈধতা ছিল, তাকে উৎখাত করা হয়েছে রাস্তায় দাঙ্গা বাঁধিয়ে। জঙ্গিদের ব্যবহার করা হয়েছে এই অস্থিরতা সৃষ্টিতে। বিদেশি শক্তি তাদের নিজস্ব স্বার্থে এই ষড়যন্ত্রে অর্থ দিয়েছে। আর সামরিক বাহিনীর একাংশ নিরপেক্ষতা ত্যাগ করে এই অবৈধ ক্ষমতা দখলে সহায়তা করেছে।
বিএনপির ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এটা তাদের প্রথম অপরাধ নয়। তারা আগেও সামরিক শাসনের সঙ্গে আঁতাত করেছে, জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছে, বিদেশি প্রভুদের স্বার্থ রক্ষা করেছে। কিন্তু এবার তারা আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছে। একটি সম্পূর্ণ অবৈধ সরকার প্রতিষ্ঠায় তারা সহায়তা করেছে। ইউনুসের মতো একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে ক্ষমতায় বসিয়ে তারা দেশকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।
জিয়াউর রহমানের ভাই আহমেদ কামাল ২০১৬ সালে বলেছিলেন, “বিএনপিকে শক্ত হাতে ধরে রাখতে হবে।” কিন্তু বাস্তবে বিএনপি শক্ত হাতে ধরা তো দূরের কথা, এটা এখন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। দলটি এখন শুধু একটি পরিবারের স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার। জিয়ার নামে ব্যবসা করে, খালেদার আত্মীয়তন্ত্র চালিয়ে আর বিদেশি প্রভুদের সেবা করে তারা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশের মানুষ এই প্রহসন দেখছে। তারা বুঝতে পারছে যে ইউনুস আর বিএনপির এই জোট দেশের জন্য বিপজ্জনক। একটি অবৈধ সরকার কখনো জনগণের কল্যাণ করতে পারে না। তারা শুধু নিজেদের ক্ষমতা আর স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যস্ত থাকে। জিয়ার নামে যে দল গড়ে উঠেছিল, সেই দল এখন তার আদর্শের সবচেয়ে বড় শত্রু। খালেদা জিয়া আর তার পরিবার বিএনপিকে নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করেছেন। আর এখন ইউনুসের সঙ্গে মিলে তারা পুরো দেশটাকেই নিজেদের সম্পত্তি বানাতে চাইছেন।
এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, জিয়াউর রহমানের নাম ব্যবহার করে এই অন্যায় করা হচ্ছে। একজন মুক্তিযোদ্ধার নাম, যিনি দেশের জন্য লড়াই করেছিলেন, সেই নাম এখন ব্যবহার করা হচ্ছে দেশের গণতন্ত্র ধ্বংস করতে। জিয়ার ভাইরা রাজনীতি থেকে দূরে থাকলেও তারা অন্তত তার নামে কলঙ্ক লেপন করেননি। কিন্তু খালেদা জিয়া আর তার পরিবার জিয়ার নাম ব্যবহার করে নিজেদের পারিবারিক স্বার্থ হাসিল করছেন। এটা জিয়ার প্রতি সবচেয়ে বড় অসম্মান।
বাংলাদেশের মানুষ ইতিহাস ভুলে যায় না। তারা মনে রাখে কারা তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। ইউনুস আর বিএনপির এই অবৈধ জোট ইতিহাসে কলঙ্কিত হয়ে থাকবে। পারিবারিক স্বার্থের রাজনীতি, বিদেশি অর্থায়ন আর জঙ্গি সহায়তা নিয়ে যারা ক্ষমতা দখল করেছে, তারা কখনো দেশের কল্যাণ করতে পারে না। জিয়ার নামে ব্যবসা আর খালেদার আত্মীয়তন্ত্র বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে।
আরো পড়ুন

