Share
এবারের পহেলা বৈশাখে বিএনপি-জামায়াতের শুভেচ্ছা জানানো দেখে যারা আপ্লুত হয়ে পড়ছেন, তাদের একটু স্মৃতিশক্তি পরীক্ষা করা দরকার। ২০০১ থেকে ২০০৬, বিএনপি-জামায়াত জোটের শাসনামলে এই দেশে কী হয়েছিল সেটা কি ভুলে গেছেন? রমনার বটমূলে বোমা হামলা হয়েছিল। পহেলা বৈশাখের উৎসবে আসা মানুষের শরীর ছিন্নভিন্ন হয়েছিল। সেই হামলার বিচার এখনো শেষ হয়নি, আসামিরা এখনো ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর সেই একই রাজনৈতিক শক্তি এখন ফেসবুকে “শুভ নববর্ষ” লিখছে। এই রূপান্তরটাকে যদি কেউ আন্তরিক মনে করেন, তাহলে বলার কিছু নেই।
বিএনপি একটি দল হিসেবে কখনো তার আদর্শিক অবস্থান থেকে একটুও নড়েনি। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসেছিলেন একটি পাতানো গণভোটের মাধ্যমে, যেটাকে নির্বাচন বলা রাজনৈতিক রসিকতার সামিল। তিনি সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা মুছে দিয়েছিলেন, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করেছিলেন, এবং রাষ্ট্রকে একটি বিশেষ ধর্মীয় পরিচয়ের দিকে ঠেলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন। তার উত্তরসূরিরা সেই কাজ আরো এগিয়ে নিয়ে গেছে। জামায়াতের সাথে জোট বাঁধা, হেফাজতকে তোষণ করা, মাদ্রাসা শিক্ষার অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারে প্রশ্রয় দেওয়া এগুলো কোনো কৌশলগত ভুল না, এগুলো সচেতন রাজনৈতিক বিনিয়োগ।
এখন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যা ঘটেছে সেটা নিয়ে একটু কথা বলা দরকার। ১২ ফেব্রুয়ারির সেই নির্বাচনে দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ছিল না। ভোটার উপস্থিতি যা হওয়ার কথা তা হয়নি। কিন্তু এই পরিস্থিতিতেও বিএনপি এবং তাদের মিত্রদের একটি অংশ নিজেদের প্রাসঙ্গিক রাখার চেষ্টা চালিয়ে গেছে। সেই প্রাসঙ্গিকতা রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে এখন বাংলা নববর্ষকে ব্যবহার করা হচ্ছে। যে দলের শাসনামলে রমনায় বোমা ফেটেছিল, যে দলের নেতারা মঙ্গল শোভাযাত্রাকে মূর্তিপূজার সাথে তুলনা করেছেন, তারা এখন পহেলা বৈশাখের শুভেচ্ছা দিচ্ছেন। কারণটা সরল, ক্ষমতার কাছে পৌঁছাতে হলে একটা মানবিক মুখ দরকার। উৎসব সেই মুখ বানানোর সস্তা সুযোগ।
ইসলামি উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর ভণ্ডামিটা আরেকটু সরাসরি ধরনের। এরা বলছে পহেলা বৈশাখ হারাম, মঙ্গল শোভাযাত্রা শিরক। কিন্তু এই একই মানুষগুলো টেলিভিশনে টকশোতে আসছেন, ইউটিউবে ওয়াজের ভিডিও দিচ্ছেন, ফেসবুকে নিজেদের ছবি পোস্ট করছেন। ছবি তোলা যখন হারাম ছিল, ফতোয়া দিয়ে মানুষকে থামানো হয়েছিল। এখন মেকআপ করে ছবি তুলে সেটা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল করা হচ্ছে। টেলিভিশন যখন বিধর্মীদের বাক্স ছিল, তখন ফতোয়া এসেছিল। এখন সেই একই বাক্সে বসে ইসলামের ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। ঢিলা-কুলুপের বিধান যারা শেখান, তারাই এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সুবিধাভোগী। হারামের সংজ্ঞাটা এদের কাছে মূলত সুবিধার আরেক নাম।
বাংলাদেশে মাদ্রাসায় শিশু যৌন নিপীড়নের যে ধারাবাহিক ঘটনাগুলো ঘটেছে এবং ঘটছে, সেগুলো নিয়ে এই আলেম সমাজের নীরবতা কিন্তু বেশ সোচ্চার। একটি শিশু মাদ্রাসায় শিক্ষকের হাতে নিপীড়িত হলে কোনো ফতোয়া আসে না, কোনো মাহফিল বসে না, কোনো প্রতিবাদ হয় না। কিন্তু পহেলা বৈশাখে মেয়েরা রঙিন শাড়ি পরলে সেটা ইসলামের বিপদ হয়ে যায়। এই অগ্রাধিকারটা কী বলছে সেটা বুঝতে খুব বেশি রাজনৈতিক বিশ্লেষণের দরকার নেই।
আসল কথাটা হলো, বাংলার সংস্কৃতি কোনো আরোপিত পরিচয় না। এই ভূখণ্ডের মানুষ হাজার বছর ধরে নদীর পাড়ে বাস করেছে, বন্যার সাথে লড়েছে, ফসল ফলিয়েছে, নববর্ষ পালন করেছে। ইসলাম এই অঞ্চলে এসেছে, এবং এই অঞ্চলের মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে। কিন্তু ইসলাম গ্রহণ করার মানে এই না যে হাজার বছরের সাংস্কৃতিক স্মৃতি মুছে ফেলতে হবে। ইন্দোনেশিয়ার মুসলমানরা তাদের সংস্কৃতি ছাড়েনি, ইরানের মুসলমানরা নওরোজ পালন করে, মালয়েশিয়ার মুসলমানদের নিজস্ব উৎসব আছে। একমাত্র বাংলাদেশের একটি অংশ নিজেদের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়াকে ধর্মপালন মনে করছে। এই বিচ্ছিন্নতার রাজনীতিটা কারা করছে এবং কেন করছে, সেটা বোঝাটাই আসল কাজ।
আরো পড়ুন

