Share
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে শামীম রেজাকে যেদিন পিটিয়ে কুপিয়ে মেরে ফেলা হলো, সেদিনও বিএনপির কোনো নেতার মুখ থেকে একটা শব্দ বেরোয়নি। একজন মানুষকে ধর্ম অবমাননার মিথ্যা তকমা দিয়ে, এডিট করা ভিডিও ছড়িয়ে, জনতার হাতে হত্যা করা হলো। মাজার পুড়িয়ে দেওয়া হলো। আর যে দলটি এখন ক্ষমতার গদিতে বসে দেশ চালাচ্ছে বলে দাবি করে, তারা ব্যস্ত ছিল অন্য হিসাব মেলাতে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যে নির্বাচন হয়েছে, সেটাকে নির্বাচন বলা আদৌ সংগত কিনা সেটা নিয়েই প্রশ্ন আছে। দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সেই ভোটে ছিল না। সাধারণ মানুষ ভোট কেন্দ্রে যায়নি। যা হয়েছে তা মূলত একটা সাজানো আনুষ্ঠানিকতা, যার মাধ্যমে বিএনপি নিজেদের গায়ে একটা বৈধতার লেবেল সাঁটাতে চেয়েছে। কিন্তু জনগণ সেই লেবেল মানেনি।
এই দলটির জন্ম ইতিহাসটা একটু মনে করিয়ে দেওয়া দরকার। জিয়াউর রহমান, যিনি নিজে একটি অংশগ্রহণহীন ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেছিলেন, সেনানিবাসের ছায়ায় বসে যে দল বানিয়েছিলেন, সেটাই বিএনপি। দলটির রক্তে শুরু থেকেই গণতন্ত্রের ভণিতা আছে, গণতন্ত্র নেই। দুর্নীতি আর সন্ত্রাসের সঙ্গে এই দলের সম্পর্ক বাংলাদেশের মানুষ বহু দশক ধরে দেখে আসছে। হাওয়া ভবন থেকে শুরু করে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, গ্রেনেড হামলা, এই ইতিহাস মুছে ফেলার নয়।
এখন মাজারে হামলার প্রসঙ্গে আসা যাক। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত একশোরও বেশি মাজার আক্রান্ত হয়েছে। মানুষ মরেছে, আহত হয়েছে দুইশোর বেশি। রাজবাড়ীতে কবর থেকে মৃতদেহ তুলে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনাগুলোর বিপরীতে মামলা হয়েছে মাত্র বারোটি। গ্রেফতার প্রায় শূন্য। তদন্তের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
কুষ্টিয়ার হত্যা মামলায় জামায়াতে ইসলামী আর খেলাফত মজলিসের স্থানীয় নেতাদের নাম এসেছে। ঘটনার এক সপ্তাহ পরেও কেউ ধরা পড়েনি। পুলিশ বলছে তদন্ত চলছে। এই “তদন্ত চলছে” কথাটা বাংলাদেশে বিচারহীনতার সবচেয়ে পরিচিত আবরণ।
বিএনপি এখন ক্ষমতায়। তাদের মন্ত্রিসভা আছে, উপদেষ্টা আছে, বিবৃতি দেওয়ার মঞ্চ আছে। কিন্তু মাজারে মানুষ মরলে তাদের গলা দিয়ে কথা বেরোয় না। কারণটা কঠিন না বোঝার মতো। যে ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো এই হামলার পেছনে আছে, তাদের সঙ্গে বিএনপির রাজনৈতিক সমীকরণ আছে, ভোটের হিসাব আছে। জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক নতুন কিছু না। সেই সম্পর্ক বজায় রাখতে গিয়ে মাজারের মানুষগুলোকে বলি দেওয়া যায়, এটা তাদের কাছে রাজনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী।
ধামরাইয়ের শুকুর আলী শাহ ফকিরের মাজারের খাদেম যখন বলেন “কীসের বিচার পাবো? বিচার করবেন কেবল আল্লাহ”, তখন এই একটা কথার মধ্যে গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাহীনতাটা স্পষ্ট হয়ে যায়। একজন নাগরিক যখন রাষ্ট্রের কাছে বিচার চাওয়া ছেড়ে দেন, তখন সেই রাষ্ট্র আসলে ব্যর্থ হয়ে গেছে। এবং সেই ব্যর্থতার জন্য যারা ক্ষমতায় আছেন তারা দায় এড়াতে পারেন না।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে পাওয়া যায়নি, এটা এই সরকারের চরিত্রের সারসংক্ষেপ। প্রশ্নের মুখে নেই, জবাবদিহিতার মুখে নেই। তথ্য উপদেষ্টা “ব্যর্থতার দায় নিচ্ছেন” বলে যা বলেছেন, সেটা কথার কথা। দায় নেওয়ার অর্থ যদি শুধু বিবৃতি হয়, তাহলে সেই দায় নেওয়া আর না নেওয়ায় কোনো পার্থক্য নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবদুর রাজ্জাক খান যা বললেন সেটা সহজ সত্য। বিচার না হলে অপরাধীরা সাহস পায়। পরের হামলাটা আরও সহজ হয়ে যায়। একশোটা মাজারে হামলার পর যদি একটাতেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হয়, তাহলে পরের হামলাকারী জানে যে তার কিছু হবে না। এই চক্রটা ভাঙার কোনো ইচ্ছা বা সামর্থ্য এই সরকারের আছে বলে মনে হয় না।
ফেব্রুয়ারির সেই ভোটে যারা অংশ নেয়নি, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যে নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করেছে, সেই ভোটের জোরে ক্ষমতায় বসা একটা সরকারের কাছে ধর্মীয় সংখ্যালঘু বা সুফি মাজারের মানুষদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নৈতিক সাহসও নেই, রাজনৈতিক সদিচ্ছাও নেই। তারা নিজেদের টিকিয়ে রাখার জন্য যে সমীকরণ তৈরি করেছে, সেই সমীকরণে এই মানুষগুলোর জায়গা নেই। এটাই এই মুহূর্তের বাংলাদেশের সবচেয়ে কঠিন সত্য।
আরো পড়ুন

