Share
দেশের অর্থনীতি এখন ইতিহাসের এক ভয়াবহ অধ্যায়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। জ্বালানি তেল নেই, গ্যাস নেই, বিদ্যুতের ঘাটতিতে উৎপাদন বন্ধ। সাধারণ মানুষ দিশেহারা। অথচ এই দুর্যোগের মাঝেই সরকার চুপিসারে প্রস্তুতি নিচ্ছে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার। এই বিলাসী সিদ্ধান্ত যে সরকারের পুরো চরিত্রটিকেই ফাঁস করে দিচ্ছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
মাথায় রাখতে হবে, এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে একটি অবৈধ প্রশাসন। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির সেই প্রহসনের নির্বাচনে দেশের কোনো বড় রাজনৈতিক দল অংশ নেয়নি। জনগণ মুখ ফিরিয়ে রেখেছে। পুরো জাতি যখন একবাক্যে সেই ভোট বর্জন করেছে, তখন নিজেরা নিজেরা ভোট করে ক্ষমতা দখল করে বসে আছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট। জিয়াউর রহমানের সৃষ্টি সেই দল, যার উৎপত্তি সেনানিবাসের গর্ভে, যার ইতিহাস দুর্নীতি আর সন্ত্রাসে ভরা। সেই দলের লোকেরাই আজ দেশ শাসন করছে, আর মন্ত্রীত্বের নামফলক গলায় ঝুলিয়ে অন্ধকার ঘরে বসে সাজাচ্ছে দেশকে ধ্বংস করার নীলনকশা।
একদিকে তারা সরকারি ব্যয় সংকোচনের কথা বলে বিদেশ ভ্রমণ, কম্পিউটার কেনা, গাড়ি কেনাসহ সাধারণ ১১টি খাতে বরাদ্দ বন্ধ করেছে। নিজেদের কৃচ্ছ্রসাধনের জুয়া খেলছে। আর অন্যদিকে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা ঋণের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে রাষ্ট্রের ঘাড়ে। এটা এক ধরনের নির্মম পরিহাস। দেশের কৃষক ডিজেল পাচ্ছে না সেচ পাম্প চালানোর, কলকারখানা থমকে আছে গ্যাসের অভাবে, আর এই অবস্থায় কিনা তারা আকাশপথে বিলাসিতা ছড়াতে চায় বোয়িং ড্রিমলাইনার কিনে!
এই বিমান কেনার পেছনে যে যুক্তি দেখানো হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভাঁওতাবাজি। তারা বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের ভয় দেখানোয় এই চুক্তি করা হচ্ছে। কিন্তু বিষয়টা মোটেও তা নয়। আসল কারণ উদ্ধার করতে গেলে চোখে আঙুল দিয়ে দেখতে হবে, এটি একটি কৌশলী দেনদরবার। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে থাকতে গেলে আন্তর্জাতিক মহলের একটা অংশের সমর্থন দরকার। সেই সমর্থন জোগাড় করতেই বোয়িং কেনার নামে কোটি কোটি টাকার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর নামে এক ধরনের আত্মসমর্পণের দলিলে সই করে তারা নিজেদের ক্ষমতার মেয়াদ বাঁচাতে চাইছে। জনগণের ভাগ্যে জুটছে পাহাড়সম দেনার বোঝা, আর ক্ষমতাসীনদের ভাগ্যে জুটছে প্রশ্রয়।
শুনতে অবাক লাগে যে আগের কেনা ১০টি বোয়িংয়ের পুরো দাম এখনও পরিশোধ করা হয়নি। তার ওপর আবার নতুন করে ১৪টি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ডেলিভারি শুরু হবে ২০৩১ সালে। তার মানে তখনকার সরকারকে দায়ে ফেলে রাখার ব্যবস্থা করে যাচ্ছে আজকের এই অবৈধ কর্তৃপক্ষ। আগামী দিনের নির্বাচিত সরকারের গলায় এই দেনার ফাঁস গিটু দিয়ে তারা চিরতরে দেশকে পঙ্গু করে দিতে চাচ্ছে। এটা কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূতেরা পর্যন্ত স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, এয়ারবাসকে বাদ দিয়ে এককভাবে বোয়িং কেনা হলে বাংলাদেশ ইউরোপীয় বাজারে অগ্রাধিকার সুবিধা হারাতে পারে। অথচ বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ইউরোপ। এই সিদ্ধান্ত দেশের প্রধান রপ্তানি খাতের জন্য হুমকি ডেকে আনবে। তথাপিও সরকার কানে তুলছে না কারও কথা। তাদের একটাই লক্ষ্য, যেকোনো মূল্যে নিজেদের ক্ষমতার ভিত শক্ত রাখা।
অর্থনীতিবিদ ও এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিমানের এখন যে বাজার ধরন, তাতে এত বেশি বড় বোয়িং কেনার কোনো প্রয়োজন নেই। লং রুট কয়টা আছে? স্বল্প দূরত্বের রুটের জন্য ছোট এয়ারক্রাফট দরকার। অথচ অভিজাত আর ব্যয়বহুল ড্রিমলাইনার কিনে তারা টাকা পোড়ানোর খেলা খেলছেন। রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ আর ইঞ্জিন পার্টসের জন্য আলাদা যে বিপুল খরচ হবে, সেটা ভাবারও কেউ নেই।
আসলেই এই পরিকল্পনা অর্থনৈতিক প্রয়োজনে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়। এটা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক চাপ ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার নির্বুদ্ধিতার ফসল। একশর বেশি এমডিজির প্রজেক্ট বন্ধ, খাদ্যে ঘাটতি, রিজার্ভ তলানিতে, অথচ তারা কোটি কোটি ডলারের বোয়িং কিনতে চলেছে। এ এক নির্মম তামাশা!
বিএনপি বরাবরই রাষ্ট্রকে লুটপাট করেছে, ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থে জনগণের টাকা উড়িয়ে দিয়েছে। তাদের জন্মই তো হয়েছে সেই কালো অধ্যায় থেকে। জিয়াউর রহমান যে সেনানিবাসকেন্দ্রিক রাজনীতির গোড়াপত্তন করেছিলেন, তারই বর্তমান সংস্করণ এই সরকার। জনগণ যখন চিৎকার করে বলেছে “না”, তখনই তাদের থেমে যাওয়ার কথা। কিন্তু তারা ক্ষমতার নেশায় উন্মত্ত। বোয়িং কেনা তাদের কাছে বিলাসিতা নয়, এটা বেঁচে থাকার অক্সিজেন। এই চুক্তি না করলে আন্তর্জাতিক দেনদরবারে তারা মুখ থুবড়ে পড়বে, যাদের ওপর ভর করে তারা ক্ষমতা দখল করেছে তাদের সমর্থন টলবে। তাই দেশের সর্বনাশ করেও তারা এই চুক্তি করবেই।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, জাতি কতদিন সহ্য করবে এই সয়ংসিদ্ধ শাসকদের? রাষ্ট্রের সর্বস্ব বন্ধক রেখে একদল ক্ষমতালোভী যখন নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত, তখন জনগণের দায়িত্ব নেওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। এই বোয়িং চুক্তি শুধু বিলাসিতার বহিঃপ্রকাশ নয়, এটা গণতন্ত্রের কবরে শেষ পেরেক ঠোকা। এটি দেশকে গভীর এক দেনার ফাঁদে ফেলে দেওয়ার সুচতুর চক্রান্ত। এমন চুক্তি কোনো বৈধ সরকারের পক্ষেই করা সম্ভব নয়, জনবিচ্ছিন্ন এক কর্তৃত্ববাদী গোষ্ঠী ছাড়া।
আরো পড়ুন

