Share
চারিত্রিক সনদ এখন থেকে ইমামের কাছ থেকে নিতে হবে, এই প্রস্তাব যখন সামনে এলো, তখন অনেকে ভাবলেন হয়তো এটা গুজব। কিন্তু না, এই প্রস্তাব সত্যি এসেছে। বাংলাদেশ একটা বহুধর্মীয় দেশ, এখানে কোটি কোটি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান মানুষ বাস করেন, তারা কার কাছে যাবেন সনদ নিতে? নাকি তাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকবে? আর যে মুসলমান মসজিদে যায় না, তার চরিত্র কি তাহলে সন্দেহজনক? এই প্রশ্নগুলোর কোনো সৎ উত্তর এই প্রস্তাবের কাছে নেই।
রাষ্ট্র যখন একজন নাগরিকের চরিত্র বিচারের ভার কোনো ধর্মীয় ব্যক্তির হাতে তুলে দেয়, তখন সে আসলে নিজের অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে। আইন, সংবিধান, বিচার বিভাগ, এগুলো কেন তাহলে? রাষ্ট্রের নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো যদি একজন মানুষের সততা আর যোগ্যতা নির্ধারণ করতে না পারে, তাহলে সমস্যাটা ইমামের সনদে নয়, সমস্যাটা রাষ্ট্রের ভেতরে।
এখন প্রশ্ন হলো, এই প্রস্তাব কোথা থেকে আসছে, কারা এটাকে সমর্থন দিচ্ছে বা নীরবতার মাধ্যমে বৈধতা দিচ্ছে। বিএনপি এ বিষয়ে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেনি। এটা নতুন কিছু না। বিএনপি সবসময়ই ক্ষমতার সুবিধামতো ধর্মীয় কার্ড খেলে এসেছে। জিয়াউর রহমান সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা সরিয়ে “বিসমিল্লাহ” ঢুকিয়েছিলেন, সেটা কোনো আদর্শের জায়গা থেকে না, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার রাজনৈতিক হিসাব থেকে। সেই দলটা আজও একই চরিত্র বহন করছে। একদিকে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কথা বলে, অন্যদিকে মৌলবাদী শক্তির সাথে আঁতাত করে ভোটের রাজনীতি করে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণ না করাটা কোনো নৈতিক অবস্থান ছিল না, সেটা ছিল কৌশলী নীরবতা, যেন পরে যা-ই হোক সুবিধামতো দিক থেকে ফায়দা নেওয়া যায়।
আর দেশের ইসলামপন্থী উগ্র সংগঠনগুলো তো এই সুযোগের জন্যই বছরের পর বছর ধরে অপেক্ষা করে আসছিল। তারা চায় রাষ্ট্রের প্রতিটা স্তরে ধর্মীয় অনুশাসন ঢুকিয়ে দিতে। শিক্ষা, বিচার, প্রশাসন, চাকরি, সর্বত্র তারা ধর্মের লাইসেন্স বসিয়ে দিতে চায়। চারিত্রিক সনদের এই প্রস্তাব সেই বড় প্রকল্পেরই একটা ছোট পদক্ষেপ। আজকে ইমামের সনদ, কালকে মাদ্রাসার সুপারিশ, পরশু হয়তো কোনো ফতোয়া বোর্ডের অনুমোদন। এইভাবেই ধীরে ধীরে একটা আধুনিক রাষ্ট্রকে মধ্যযুগে নিয়ে যাওয়া হয়।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে শক্ত কণ্ঠস্বর এখন প্রায় শোনাই যাচ্ছে না। যারা রাজনীতি করেন, বুদ্ধিজীবিতা করেন, সুশীলসমাজ করেন, তাদের অনেকেই এখন বেছে বেছে চুপ থাকছেন। কারণ কথা বললে “ইসলামবিদ্বেষী” তকমা লাগার ভয়। এই ভয়টাই আসলে মৌলবাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। মানুষকে চুপ করিয়ে দাও, তারপর যা খুশি করো।
ধর্ম মানুষের বিশ্বাসের জায়গা, এই কথাটা ঠিকই আছে। কিন্তু একটা রাষ্ট্র তখনই টিকে থাকে যখন সে সব নাগরিককে একই দৃষ্টিতে দেখে। ইমামের সনদ যেদিন চাকরির যোগ্যতা নির্ধারণ করবে, সেদিন রাষ্ট্র আর সবার থাকবে না, সেটা শুধু একটা বিশেষ পরিচয়ের মানুষদের সম্পত্তি হয়ে যাবে। আর সেটা হতে দেওয়াটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো না।
আরো পড়ুন

