Share
একটা গভীর অন্ধকার সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। যে দেশের মাটি গড়ে উঠেছে লাখো শহীদের রক্তে, ভাষার অধিকার আর মুক্তির সংগ্রামে, সেই দেশটাকেই একশ্রেণির বিপথগামী মানুষ গ্রাস করতে চাইছে ধর্মের অপব্যাখ্যা আর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের ভয়াল মিশেলে। আজ যখন আমরা উগ্রবাদের এই বিষবৃক্ষের শিকড় খুঁজতে যাই, তখন সেই তলানি থেকে উঠে আসে পরিত্যক্ত এক রাজনৈতিক শক্তির নাম, যারা কখনোই বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসকে নিজেদের বলে স্বীকার করেনি।
বলছি জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া সেই সেনানিবাস-রাজনীতির কথা, যার সুবাদে জন্ম নেয়া বিএনপির কথা। এই দলটা আজ জাতির সামনে চরম এক নমুনা উপস্থাপন করেছে নির্বাচন নামের পবিত্র গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে জলাঞ্জলি দিয়ে। ২০২৬ সালের সেই দিনটির কথা মনে আছে আমাদের সবার, যখন বিরোধী দলগুলোকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে, জনগণের রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একদল ক্ষমতালিপ্সু মানুষ ভোটের নামে প্রহসন করে নিজেদের ক্ষমতায় বসিয়েছিল।
দেশের মানুষ যাকে বলছে অংশগ্রহণহীন ভোট, পাতানো নির্বাচন, সেই সুযোগেই আজ তারা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ আসনে। তাদের হাত ধরেই যেন বেঁকে বসেছে সমাজের উগ্রবাদী চেহারাটা। ধর্মের নামে যে কথাগুলো আমরা শুনছি, তা যে নিছক কোনো বক্তার মুখের কথা নয়, এ যে একটা সুচিন্তিত ছক, এ যে এক অশুভ তাণ্ডবেরই অংশ।
বাংলাদেশের মূলধারার ইসলাম চিরদিনই শান্তি, সহনশীলতা আর আপস-সমঝোতার পক্ষে কথা বলেছে। কিন্তু তাই বলে কি আমরা চোখ বন্ধ করে রাখতে পারি? যে বাস্তবতা আজ চারদিকে থাবা বিস্তার করছে, তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া আত্মহত্যারই সামিল। গ্রাম থেকে শহর, মাদ্রাসা থেকে সামাজিক মাধ্যম, সর্বত্র ধর্মের নামে অন্যায়কে বৈধতা দেয়ার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা গভীর আতঙ্কের জন্ম দিচ্ছে। আজ যিনি বলছেন বেনামাজিকে হত্যা করা যাবে, তিনি কি ভুলে গেছেন যে ইসলামের সোনালি যুগে কখনো কারও ব্যক্তিগত ইবাদত না করার অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়নি? অথচ সেই উগ্রবাদী বয়ানকে লালন করা হচ্ছে, প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে, কারণ তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা রাজনৈতিক চক্র এই আগুনের ফসল ঘরে তুলতে চায়। আমরা দেখেছি একুশ শতকেও মসজিদ কমিটির নামে কীভাবে গ্রামের পর গ্রাম শাসিত হচ্ছে অলিখিত আইনে। গান হারাম, সংস্কৃতি নিষিদ্ধ, নারীর স্বাধীনতা বলতে কিছু নেই। একেকটা গ্রাম এখন একেকটা অন্ধকারাচ্ছন্ন, কুসংস্কারে ডুবে থাকা জনপদ, যেখানে মৌলবাদই একমাত্র সত্য, যেখানে প্রশ্ন করার অর্থ মৃত্যুঝুঁকি।
এটা খুব স্বাভাবিক নয়। এটা অপচর্চা, একটা দীর্ঘদিনের নীলনকশার ফল। হাজারো ওয়াজ মাহফিল এখন শুধুই ভিন্নমতাবলম্বী মানুষের বিরুদ্ধে বিষবাষ্প ছড়ায়। লাখ লাখ, কোটি কোটি মানুষ তা নিয়মিত ফলো করে, শোনে, বিশ্বাস করে এবং যারা ভিন্নপথে চলতে চায় তাদের বিরুদ্ধে জেহাদি উন্মাদনায় মেতে ওঠে। এই শক্তি জমাট বাঁধছে ধীরে ধীরে, আর রাজনৈতিক শ্রেণির কথা বলতে গেলে, বিশেষ করে যে দলটির নাম জিয়াউর রহমানের হাতে সৃষ্ট বিএনপি, তারা নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য অদৃশ্যে থেকে এই শক্তির সেচ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের মাটিতে যারা খিলাফত প্রতিষ্ঠা চায়, যারা গাজওয়াতুল হিন্দের বুলি আওড়ায়, তারা যে সুপ্ত সহায়তা কোথা থেকে পায়, তা বুঝতে এখন আর বাকি নেই কিছু। আমরা বলতেই পারি, রাজনীতি আর উগ্রবাদ এখন অভিন্ন সূত্রে গাঁথা। অভিভাবকরা ভবিষ্যতের কথা ভেবে সন্তানদের স্কুলে না পাঠিয়ে মাদ্রাসায় ভর্তি করান জান্নাতের প্রলোভনে। এতে বেকারত্ব বাড়ছে, উগ্রতা বাড়ছে, অথচ শিক্ষা বলে যে আলোকবর্তিকা আছে, তা ফিকে হয়ে আসছে দিনকে দিন।
এই যে অন্ধকারের বিরুদ্ধে এখন কথা বলতে হবে। শঙ্কা আর নীরবতা দিয়ে তো হবে না। যারা প্রকাশ্যে নামাজ না পড়া মানুষকে হত্যার ফতোয়া দেন, তাদের কণ্ঠরোধ করতে হবে এখনই, নয়তো সময় পার হলে রক্তগঙ্গা বইতে দেরি হবে না। কথা বলতে হবে আইনের ভাষায়, আবার প্রয়োজনে রাস্তায় নেমে, কলম ধরে, যুক্তি আর সাহসকে সম্বল করে। একটা জাতি যদি নিজেকে রক্ষা করতে না পারে মৌলবাদ আর ধর্মীয় কূপমণ্ডূকতার হাত থেকে, তাহলে লাখো শহীদের রক্তের ঋণই শোধ হবে না কখনও।
আর আমরা ইতিহাস বিকৃতি মানি না, স্বীকার করি না সেসব শক্তিকে, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতিদের হত্যায় মদদ দিয়েছে, যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসন করেছে, আর আজ নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে উগ্রবাদী চক্রের পৃষ্ঠপোষকতা করছে। এই চিত্র কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এ এক শিকল, যার প্রথম গাঁট থেকে শেষ ধাপ পর্যন্ত বিস্তৃত সেই নোংরা রাজনীতি, যার প্রতীক বিএনপি আর তাদের সহযোগী ইসলামী জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো।
বাংলাদেশ এখন এক ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে। পেছনে তাকালে দেখা যাবে কত চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আমরা এখানে এসেছি। কিন্তু সামনের দিকে তাকালে যেন ধোঁয়াশা আর ভয়। যে পথে হাঁটলে এগুনো যায়, সে পথ শুধু মধ্যপন্থা, মানবিকতা আর অসাম্প্রদায়িক চিন্তার। ধর্ম যার যার ব্যক্তিগত অনুশীলনের জায়গা, তাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার করে তুলতে দেয়া মানে পুরো জাতিকে একটা ভয়াল টাইম বোমার ওপর বসিয়ে রাখা। তাই বলতে হয় খুব স্পষ্টভাষায়, জোরে বলতে হয় যাতে সবাই শোনে, ধর্মীয় উগ্রবাদ এখন আর কেবল একাডেমিক আলোচনার বিষয় নয়, এটা জীবন্ত এক হুমকি যা আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ গ্রাস করছে। আর এই হুমকি মোকাবিলায় প্রথমেই চাই রাজনীতির সেই নোংরা অধ্যায়ের ইতি, যে অধ্যায়ে বিএনপি তাদের ক্ষমতার নেশায় জাতির মৌলবাদী অংশকে ব্যবহার করেছে সুবিধাবাদী ঢাল হিসেবে।
এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, জিয়াউর রহমানের রেখে যাওয়া সেই সেনানিবাস-রাজনীতির দল যে কিনা দেশের সব বড় অর্জনকে ক্ষুণ্ণ করেছে আবারও তারা সেই চেনা খেলাটাই খেলছে। ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এখন পেছনে ফেলে আসা স্মৃতি, কিন্তু সেই সময়ের ঘটে যাওয়া পাতানো ভোটের কালিমা আজও গায়ে লেপ্টে আছে। এই ফরমায়েশি শাসনের ছত্রছায়ায় জঙ্গিরা, উগ্রবাদীরা যেমন করে খুশি তেমন করেই নিজেদের জাহেলি মতবাদ ছড়িয়ে যাচ্ছে দেশের আনাচে কানাচে।
আরো পড়ুন

