Share
জামায়াতে ইসলামী আর তাদের ছাত্রসংগঠন শিবির আজকাল একটা নতুন গপ্পো শোনাচ্ছে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান না হলে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ হতো না, অতএব দেশভাগই আসল ঘটনা, মুক্তিযুদ্ধ তার উপজাত মাত্র। এই গালগপ্পের ভেতরে একটা ছোট ফাত্রামিও আছে। জিন্নাহকে ধীরে ধীরে বঙ্গবন্ধুর সমান, কখনো তাঁর চেয়েও বড় জায়গায় তুলে ধরা হচ্ছে। গপ্পোটা যারা বলছে, তাদের নিজেদের পারিবারিক খাতাটা একবার খুলে দেখা দরকার। কারণ ১৯৪৭-এর পাকিস্তানের সবচেয়ে জোরালো আদর্শিক শত্রুদের একজন ছিলেন জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা মওদুদী নিজেই।
১৯৩৯ সালের জুলাইয়ে তিনি নিজের পত্রিকা তরজুমানুল কুরআনে মুসলিম লীগকে বললেন “জামায়াতে জাহিলিয়াত”, অর্থাৎ অজ্ঞতার দল। সে বছরই নভেম্বর-ডিসেম্বরে লিখলেন, লীগের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত কারও চিন্তায় ইসলামি ধারা নেই। জিন্নাহর নাম ধরে জানালেন, গোটা দুনিয়া জানে ইসলামি মূলনীতি সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণাই নেই। লাহোর প্রস্তাবের পর ১৯৪০ সালের মে-জুন সংখ্যায় আরও এগোলেন। মুসলিমদের পৃথক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে তিনি তুলনা করলেন মানাত মূর্তির বদলে লাত মূর্তি বসানোর সঙ্গে, আর প্রস্তাবিত রাষ্ট্রের নাম দিলেন ব্যঙ্গ করে “নাপাকিস্তান”। বললেন, এই রাষ্ট্র অমুসলিম-শাসিত ভারতের চেয়েও নিন্দনীয়। এটা একটা মুহূর্তের রাগ ছিল না। ভবিষ্যতের ইসলামি রাষ্ট্রের পথে একটা প্রস্তুতিমূলক ধাপ হিসেবেও তিনি পাকিস্তানকে মানতে রাজি ছিলেন না। যুক্তিটা ছিল, গণতন্ত্র মানুষের সার্বভৌমত্বকে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের ওপরে বসায়, জাতীয়তাবাদ ইউরোপীয় আমদানি, আর কুরআন “জাতি” মানে না, মানে শুধু “হিযব”।
এবার ১৯৪৬-এর নির্বাচনের হিসাবটা দেখা যাক। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগ ছিল শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ, মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সিন্ধুতেও নিজের জোরে সরকার গড়তে পারেনি। নয় বছর পর ১৯৪৬-এ মুসলিমদের জন্য সংরক্ষিত ৪৯৪ আসনের ৪৩৯টিতে, প্রায় ৮৯ শতাংশে, জিতল লীগ। অখণ্ড ভারত বনাম দেশভাগের এই সরাসরি ভোটে জিন্নাহ পেলেন অস্বীকার করার উপায় নেই এমন ম্যান্ডেট। পাকিস্তান সৃষ্টির গণতান্ত্রিক ট্রিগার ছিল এই নির্বাচনই। আর জামায়াত? তারা প্রার্থী দেয়নি, ভোটেও আসেনি। মওদুদী ফতোয়া দিলেন, গণতান্ত্রিক নীতিতে গড়া সংসদে ভোট দেওয়া বা সদস্য হওয়া হারাম।
এখানে একটা তুলনা না করলে দৃশ্যটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো আলেমরাও কিন্তু ময়দানে ছিলেন। হুসাইন আহমদ মাদানির জমিয়ত উলামায়ে হিন্দ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে, আতাউল্লাহ শাহ বুখারির মজলিস-ই-আহরার প্রার্থী দিয়েছে, কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে দ্বিজাতি তত্ত্বের বিরুদ্ধে লড়েছে। উল্টো দিকে শাব্বির আহমদ উসমানী লীগের হয়ে প্রচারে নেমেছেন। অর্থাৎ ওই সময়ের আলেমদের দুই শিবিরই, পক্ষে হোক বা বিপক্ষে, জনগণের সামনে গিয়ে নিজেদের অবস্থান পরীক্ষা দিয়েছেন। একমাত্র জামায়াত বসে ছিল ফতোয়ার দেয়ালের আড়ালে, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের দিন দর্শক হয়ে। পাকিস্তান ঠেকানোর লড়াইয়েও তাদের নাম নেই, পাকিস্তান বানানোর লড়াইয়েও নেই। যে দলের ওই লড়াইয়ে কোনো ভূমিকাই ছিল না, সে আজ ১৯৪৭-এর মালিকানা দাবি করছে।
আরও আছে। মওদুদী ১৯৩৮ সাল থেকে থাকতেন পাঞ্জাবের পাঠানকোটে, জামায়াতের প্রথম সদর দপ্তরও ছিল সেখানকার দারুল ইসলামে। দেশভাগের আগ পর্যন্ত তিনি ভারতীয় ভূখণ্ডেই বসে দল চালিয়েছেন। দেশভাগে পাঠানকোট ভারতে পড়ল, আর তিনি “হিজরত” করে চলে গেলেন সেই রাষ্ট্রে, যাকে কয়েক বছর আগেও তিনি অপবিত্র বলেছিলেন। লাহোরে গিয়ে জামায়াত নতুন করে সাজালেন। যে নেতা ও আলেমরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ছিলেন, রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে যাওয়ার পর তাঁরাই নিজেদের নতুন রাষ্ট্রের নৈতিক অভিভাবক হিসেবে হাজির করলেন। “পাকিস্তান-আদর্শের রক্ষক” পরিচয়টা তাই ১৯৪৭-পূর্ব কোনো অবস্থান থেকে আসেনি। এটা রাষ্ট্র হয়ে যাওয়ার পর গায়ে চাপানো একটা কৌশলগত পোষাক।
১৯৭১ এই পোষাকের ভেতরের সাইজটা আরও ক্লিয়ার করে দেয়। ১৯৭০-এর নির্বাচনে জামায়াত জাতীয় পরিষদে ১৫১ জন প্রার্থী দিয়ে জিতেছিল মাত্র ৪টি আসন, সবকটি পশ্চিম পাকিস্তানে। পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদে শূন্য, আর ৩০০ আসনের প্রাদেশিক পরিষদে মাত্র ১টি। বাংলার মানুষ ভোটের বাক্সে তাদের জবাব আগেই দিয়ে রেখেছিল। সেই জবাব মেনে নেওয়ার বদলে তারা গেল সেনাবাহিনীর পাশে। রাজাকার, আলবদর, আলশামস গড়ে তুলল, আর গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী হত্যা ও নারী নির্যাতনে সক্রিয় ভূমিকা নিল। তখনও জামায়াতের আমির মওদুদী। পূর্ব পাকিস্তানের আমির গোলাম আযম যুদ্ধের শেষ দিকে পাকিস্তানে গিয়ে “পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি” গড়ে বাংলাদেশবিরোধী প্রচারে নামলেন। ১৯৭৩ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ সরকার তাঁর নাগরিকত্ব বাতিল করল।
এবার প্রশ্নটা সোজাসুজি করা যাক। ১৯৪৭ যদি সত্যিই এত মহান হয়, তাহলে সেই মহান ঘটনার সবচেয়ে সরব আদর্শিক বিরোধীদের একজন কেন আপনাদের প্রতিষ্ঠাতা? আর ১৯৪৭ যদি ভুল ছিল, তাহলে আজ তার জয়গান কেন? দুটো উত্তরের কোনোটিই জামায়াতের পক্ষে যায় না। যুক্তিটা ঘুরিয়ে বললে আরও নির্মম হয়। “পাকিস্তান না হলে বাংলাদেশ হতো না”, এই কথার ভেতরে ঢুকে দেখুন। তাহলে বাংলাদেশের জন্মের পেছনের ধাপ ১৯৪৭, আর সেই ধাপে লাথি মেরেছিল জামায়াত। পরের ধাপ ১৯৭১, আর সেখানেও জামায়াত দাঁড়িয়েছিল জন্মের বিরুদ্ধে। দুই ধাপেই তাদের অবস্থান একই : যে রাষ্ট্র তৈরি হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে। শুধু ১৯৪৭-এ বিরোধিতা ছিল পাকিস্তান তৈরির, ১৯৭১-এ পাকিস্তান টিকিয়ে রাখার। অবস্থান বদলে গেছে, কিন্তু একটা জিনিস বদলায়নি : যেদিকে ক্ষমতা আর সুবিধা, সেদিকেই আদর্শের ঝোঁক।
বঙ্গবন্ধুর সরকার ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করলে জামায়াত অনেক বছর প্রকাশ্য রাজনীতি করতে পারেনি। স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমানের আমলে সুযোগ মিলল। ১৯৭৯-৮০ সালে “বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী” নামে নতুন মোড়কে ফিরল, গোলাম আযম আড়াল থেকে দল চালালেন, আর ১৯৯৪ সালে নাগরিকত্ব ফিরে পেয়ে প্রকাশ্যে এলেন। ২০২৪ সালের ১ আগস্ট দলটি নিষিদ্ধ হলো, আর এক মাস পেরোনোর আগেই, ২৮ আগস্ট, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে দিল। নিষিদ্ধ দল থেকে সংসদে ক্ষমতার ভাগীদার হতে সময় লাগল দুই বছরের সামান্য বেশি।
এই ইতিহাস যাদের মুখস্থ, তাদের কাছে ২০২৬ সালের জামায়াতকে নতুন কিছু মনে হওয়ার কারণ নেই। ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত যে দলকে মানুষ ক্ষমতার অংশীদার হিসেবে দেখেছে, সেই দলই আবার টেবিলের কাছাকাছি, আর এবার সঙ্গে নিয়ে এসেছে ইতিহাস নতুন করে লেখার প্রকল্প। যে দল ১৯৪৭-এ পাকিস্তানকে অপবিত্র বলেছিল, ১৯৭১-এ বাংলাদেশের জন্মের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলেছিল, সেই দলের মুখে ১৯৪৭-এর গৌরবগাথা শুনলে হাসি পাওয়ার কথা। হাসি আসে না, কারণ গল্পটা যারা বলছে, তারা এখন আর বাইরে নেই, ক্ষমতার একদম কেন্দ্রেই বসে আছে।
আরো পড়ুন

