Share
একটা প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি। ঢাকার যে কোনো নামী মিশনারি স্কুলের গেটে দাঁড়ান। সকালে সন্তানকে নামাতে আসা অভিভাবকদের মুখ দেখুন। কেউ মুসলমান, কেউ হিন্দু, কেউ বৌদ্ধ। ধর্ম যাই হোক, সবার চাওয়া এক, ছেলেমেয়েটা ভালো পড়ালেখা শিখুক। নটর ডেম, হলি ক্রস, সেন্ট গ্রেগরি, সেন্ট জোসেফ, লিস্টটা এত লম্বা যে একটা লেখায় ধরানো যায় না। এসব প্রতিষ্ঠান কোনো ভোটের হিসাব কষে বানানো হয়নি।
হিন্দুদের রামকৃষ্ণ মিশন বিনা পয়সায় চিকিৎসা দেয়, বৌদ্ধ ভিক্ষুরা রমজানে ইফতার খাওয়ান, ইসকন জাতি ধর্ম না দেখে মানুষের পাতে খাবার তুলে দেয়। এবার দেশের ক্ষমতায় থাকা সংখ্যাগরিষ্ঠ ইসলামিক গোষ্ঠীদের দিকে তাঁকান। যারা ইসলামের নাম নিয়ে রাজনীতি করে, সেই জামায়াতে ইসলামী আজ সংসদে ক্ষমতার ভাগীদার, আর তাদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে চলছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। এই দুই দল জনগণকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য আর সংস্কৃতির জায়গায় কী দিতে এসেছে?
ধর্মের নামে রাজনীতির বাজারে দেখা যায় দাবির লম্বা ফর্দ। গান চলবে না, সিনেমা চলবে না, নারী কী পরবে তার ফতোয়া চাই, রাষ্ট্র চালাতে মরুভূমির কুখ্যাত শরিয়া আইন চাই। এই দাবিগুলোর পাশে স্কুলের ভবন কোথায়, হাসপাতালের শয্যা কোথায়, ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য কোন লঙ্গরখানা? এসব প্রশ্নের জবাবে তাঁদের চোখে পড়ে শুধু চাঁদার রসিদ, মাদ্রাসায় দানের আবেদন, কোরবানির চামড়ার হিসাব। কিন্তু এটা তো সেবার রাজনীতি নয়, এটা আদায়ের রাজনীতি। নিজের ধর্মের সাধারণ মানুষের কাছ থেকেই সবচেয়ে বেশি নেওয়া হয়, আর ফেরত যায় সবচেয়ে কম।
এই জায়গায় বিএনপির দায়টা সবচেয়ে বেশি, কারণ তারা শুধু সঙ্গী নয়, রাষ্ট্রক্ষমতার চাবিও তাদের হাতে। যে দল নিজেকে মধ্যপন্থী, উদার, জাতীয়তাবাদী বলে পরিচয় দেয়, সে কীভাবে এমন শক্তির সঙ্গে ক্ষমতার টেবিলে বসে? এটা মোটেও কোনো আদর্শের জোট নয়, এটা হিসাবের জোট। সংসদে সংখ্যা লাগে, সংখ্যার জন্য জামায়াত লাগে, আর জামায়াতের দাম মেটাতে হয় সংস্কৃতি, মত প্রকাশ আর নাগরিক স্বাধীনতার জায়গা ছেড়ে দিয়ে। বিনিময়ে মঞ্চে ওঠে সংস্কৃতির বিরুদ্ধে উগ্র কণ্ঠ, আর সরকার চুপ করে থাকে। সেই নীরবতাই সবচেয়ে জোরে কানে বাজে।
পুরোনো দিনের কথা মনে করিয়ে দেওয়া এখানে বাড়াবাড়ি নয়, কারণ ইতিহাস নিজেই ফিরে এসে দরজায় কড়া নাড়ছে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের কথা কে ভুলেছে? সেই সময়ের বিএনপি-জামায়াত জোট শাসনকে সমালোচকরা আজও মনে রাখেন জঙ্গিবাদের উত্থান, বাংলা ভাইয়ের নাম, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার অভিযোগ, একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলা আর রাষ্ট্রযন্ত্রের দলীয়করণের সময় হিসেবে। সেই অধ্যায় যাঁরা নিজের চোখে দেখেছেন, তাঁদের কাছে আজকের দৃশ্য একেবারে চেনা লাগছে। একই জোটসঙ্গী, একই ক্ষমতার সমীকরণ, একই নীরবতা। পাল্টেছে কেবল বছরের সংখ্যাটা।
আরেকটা বিষয় না বললেই নয়। ধর্ম নিয়ে এই রাজনীতির সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয় ধর্মেরই। অন্য ধর্মের মানুষ যখন সেবা আর শিক্ষা দিয়ে নিজেদের পরিচয় তৈরি করছে, তখন ইসলামের নামে রাজনীতি করা দলগুলো নিজেদের পরিচয় গড়েছে নিষেধের তালিকা দিয়ে। এতে সবচেয়ে বেশি বেইজ্জতি হন সেই সাধারণ মুসলমান, যিনি ভোরে উঠে কাজে যান, সন্তানকে মিশনারি স্কুলে পাঠান আর ভাবেন আমার ধর্ম তো মানুষকে খাওয়াতে বলে, শেখাতে বলে। অথচ তাঁর ধর্মের নাম ব্যবহার করে যারা ক্ষমতায় বসে, তাদের মুখে মানুষের ক্ষুধার কথা শোনা যায় না, শোনা যায় কে কী পরবে আর কে কী দেখবে তার নির্দেশ!
বিএনপি বলে তারা ইসলামের পাহারাদার। জামায়াত বলে তারা ইসলামের খেদমত করছে। কোন খেদমত? কোন স্কুল, কোন হাসপাতাল, কোন সংস্কারের নাম বলবে তারা? উত্তর না পেলে ধরে নিতেই হয়, ক্ষমতার ভাগাভাগিতে জনগণের জন্য আসলে কিছু বরাদ্দ ছিলই না।
আরো পড়ুন

