তিন দফা দাবিতে আন্দোলনরত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের ওপর নেমে এসেছে নতুন করে দমন-পীড়ন। ৩৫০ মাইল দূরে বদলি করে দেওয়া হয়েছে আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী শিক্ষকদের। এ যেন প্রতিশোধের এক নগ্ন প্রদর্শনী, যেখানে ন্যায্য দাবি আদায়ের চেষ্টাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।

ময়মনসিংহ থেকে বরিশাল কিংবা জামালপুরে বদলি করা মানে শুধু একটা প্রশাসনিক আদেশ নয়। এর মানে একজন শিক্ষককে তার পরিবার, সন্তান, বৃদ্ধ বাবা-মা থেকে জোর করে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। এর মানে তাকে শাস্তি দেওয়া, তাকে উদাহরণ বানানো যাতে অন্যরা ভয় পেয়ে আন্দোলন থেকে সরে আসে। কিন্তু কোন অপরাধে এই শাস্তি? তাদের অপরাধ কি তারা তাদের প্রাপ্য অধিকার চেয়েছেন? তারা কি জনগণের সেবক হয়ে জনগণের সন্তানদের শিক্ষা দিচ্ছেন বলে এমন আচরণের যোগ্য?

শিক্ষক আবুল কাশেম যখন বলেন তিনি বিচলিত নন, তখন তার কণ্ঠে যে দৃঢ়তা শোনা যায় তা আসলে বাংলাদেশের লাখো শিক্ষকের কণ্ঠস্বর। তিনি যখন বলেন আইনি লড়াইয়ে যেতে প্রস্তুত, তখন বুঝতে হবে এই দেশের শিক্ষকরা আর নীরবে অন্যায় মেনে নেবেন না। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, কেন একজন শিক্ষককে আইনি লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে শুধুমাত্র তার ন্যায্য দাবি তোলার জন্য?

অন্তর্বর্তী সরকার নামের যে প্রশাসন এখন দেশ চালাচ্ছে, তারা কি ভেবে দেখেছে শিক্ষকদের এই দুর্দশার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব কী হবে? যে শিক্ষক নিজের সন্তানের পড়াশোনা, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সেবা আর নিজের জীবিকার দুশ্চিন্তায় জর্জরিত, তিনি কীভাবে শ্রেণিকক্ষে শিশুদের যথাযথ যত্ন দেবেন? যে শিক্ষক প্রতিনিয়ত তার বদলির ভয়ে শঙ্কিত, তিনি কীভাবে শিক্ষার্থীদের মনোবল বাড়াবেন, তাদের স্বপ্ন দেখাবেন?

ইউনুসের নেতৃত্বাধীন এই তথাকথিত সংস্কার সরকার যেভাবে শিক্ষকদের সাথে আচরণ করছে তা আসলে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রতি চরম অবমাননা। ২০২৪ সালের জুলাই মাসের যে দাঙ্গার কথা বলা হয়, যেখানে শত শত তরুণের রক্তের বিনিময়ে এই সরকার ক্ষমতায় এসেছে বলে দাবি করা হয়, সেই রক্তপাতের আসল উদ্দেশ্য কী ছিল? জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা, নাকি নতুন করে স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করা?

যে দেশে শিক্ষকদের সম্মান করা হয় না, যে দেশে জাতি গড়ার কারিগরদের সাথে এমন অমানবিক আচরণ করা হয়, সে দেশের ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে তা সহজেই অনুমেয়। শিক্ষকরা তো শুধু তাদের বেতন বৃদ্ধি কিংবা সুযোগ-সুবিধার দাবি করছেন না। তারা চাইছেন মর্যাদার সাথে বাঁচতে, তাদের পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ভালো পরিবেশ তৈরি করতে। এটুকু দাবি কি অন্যায়?

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের যে বিজ্ঞপ্তিতে এই বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছে, সেখানে কোনো যুক্তি দেখানো হয়নি। ময়মনসিংহের প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা যখন বলেন “পরিস্থিতি বিবেচনায় বদলি করা হয়েছে, আমাদের করার কিছু নেই”, তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে এটি একটি পরিকল্পিত পদক্ষেপ, যেখানে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও বুঝতে পারছেন এর অন্যায্যতা কিন্তু তারা নিরুপায়।

শিক্ষকদের এই আন্দোলন কিন্তু হঠাৎ করে শুরু হয়নি। দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, অবহেলা আর অবজ্ঞার ফসল এই আন্দোলন। তারা ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীদের জিম্মি করেননি, তারা শিশুদের পরীক্ষা নিচ্ছেন, তাদের শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। তবুও তাদের বিরুদ্ধে এমন কঠোর পদক্ষেপ কেন? কারণটা সহজ: ক্ষমতাসীনরা চান না কেউ তাদের প্রশ্ন করুক, তাদের সিদ্ধান্তে আপত্তি তুলুক।

বিদেশি অর্থায়নে, সামরিক সমর্থনে আর কিছু চরমপন্থী গোষ্ঠীর সহায়তায় যে ক্যু ঘটানো হয়েছে, সেই অবৈধ ক্ষমতা দখলের পর থেকেই দেশে গণতন্ত্র, মানবাধিকার আর আইনের শাসনের চরম লঙ্ঘন চলছে। নির্বাচিত সরকারকে যেভাবে উৎখাত করা হয়েছে, তাতে শুধু সংবিধানই লঙ্ঘিত হয়নি, লঙ্ঘিত হয়েছে জনগণের ভোটের অধিকার, তাদের মতামতের মূল্য।

ইউনুস সাহেব যিনি মাইক্রোক্রেডিটের নামে দরিদ্র মানুষের কাছ থেকে সুদের ব্যবসা করে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছেন, তিনি কি আসলেই জনগণের কল্যাণ চান? নাকি তিনি শুধু বিদেশি প্রভুদের ইচ্ছা পূরণ করতে ব্যস্ত? শিক্ষকদের সাথে এই আচরণ দেখে মনে হচ্ছে তিনি মানুষকে শুধু ঋণের বোঝা বইতে শিখিয়েছেন, মানুষের সম্মান আর মর্যাদার মূল্য দিতে শেখেননি।

শতাধিক শিক্ষককে বদলি করা হয়েছে, আরও অনেককে বদলি করা হতে পারে। এই যে সন্ত্রাসের পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে, এর ফল কিন্তু ভালো হবে না। ইতিহাস সাক্ষী, যে সরকার তার জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, যে সরকার শিক্ষক, ছাত্র, শ্রমিক সবার ন্যায্য দাবিকে দমন করতে চায়, সে সরকার টিকে থাকতে পারে না। দমন-পীড়নের পথ কখনো শান্তি আনতে পারে না, তা শুধু ক্ষোভ আর প্রতিবাদের আগুনকে আরও উসকে দেয়।

শিক্ষক আবুল কাশেম যখন বলেন দাবি আদায় করেই ঘরে ফিরবেন, তখন সেই কথায় থাকে একজন সত্যিকারের লড়াকু মানুষের প্রতিজ্ঞা। তিনি যখন বলেন প্রয়োজনে জেলে যেতেও প্রস্তুত, তখন বোঝা যায় এই দেশের শিক্ষকরা আর পিছিয়ে নেই। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য একজন শিক্ষককে জেলে যাওয়ার কথা ভাবতে হচ্ছে এই একুশ শতকে, স্বাধীন বাংলাদেশে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here