Share
দেশজুড়ে হামের ভয়াবহ প্রকোপ আর শিশুমৃত্যুর মিছিল যখন আকাশ ভাঙা কান্নায় ভারী করে তুলেছে বাংলাদেশের বাতাস, ঠিক তখনই কলঙ্কের কালি ছিটানো হলো দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর গায়ে। এক পুরুষ রাজনীতিবিদ, যার বিবেকবোধ নিশ্চয়ই ক্ষমতার মসনদে বসে ভোঁতা হয়ে গেছে, তিনি অকপটে বলে দিলেন, ‘মায়েরা ফিটনেস ধরে রাখতে সন্তানকে বুকের দুধ পান করান না।’ এই একটি বাক্যই যেন দগদগে ঘায়ে ছিটানো নুন। যেই নারী সন্তানের নিঃশ্বাসের শব্দেও জেগে ওঠেন, যিনি নিজের পাঁজরের হাড়গোড় ভেঙে সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখান, সেই নারীকে ‘ফিটনেস সচেতন’ আখ্যা দিয়ে অপমানের চূড়ায় তোলা হলো।
এই বক্তব্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি এক পুরনো রোগেরই উপসর্গ। বিপদ এলেই দোষ চাপাতে হবে নারীর ঘাড়ে, এই হচ্ছে আমাদের সমাজের বহুল চর্চিত ফর্মুলা। শিশু মারা যাচ্ছে, দোষ মায়ের। বাচ্চা অপুষ্ট, দোষ মায়ের। অথচ যে আঙুলগুলো মায়েদের দিকে তোলা হচ্ছে, সেই আঙুলগুলোই কখনো নির্দেশ করে না সেই সব কাঠামোগত ব্যর্থতার দিকে, যেখানে দায়ী আসলে রাষ্ট্র, কর্তৃপক্ষ আর তাদের শীর্ষে বসে থাকা বিএনপির এই অযোগ্য, স্বৈরাচারী, জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত সরকার।
আসুন, একটু নির্মোহভাবে ঘটনার গভীরে যাই। গত এপ্রিল থেকে মে পর্যন্ত দেশে হামের সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। শিশু হাসপাতালগুলোর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে একটার পর একটা প্রাণ ঝরে পড়ছে। চিকিৎসকরা ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। আর এই শিশুদের পাশে বসে থাকা মায়ের চোখের দিকে তাকালে দেখা যায় এক অসহায়ত্ব, যা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। এই মাকে অভিযুক্ত করলেন এক রাজনীতিবিদ, যিনি হয়তো কোনোদিন মায়ের স্তনের উষ্ণতা কী, তা বোঝার চেষ্টাও করেননি। তিনি বললেন, ‘মায়েরা ফিটনেস ধরে রাখতে বুকের দুধ দেন না।’ কী নিষ্ঠুর, কী নারীবিদ্বেষী এই মন্তব্য!
তার এই কথার পরপরই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ল ‘বুকের দুধ না খাওয়ানোই হামের কারণ’ এমন বক্তব্য। গণমাধ্যমের কিছু অংশও তা ফলাও করে প্রচার করতে থাকল। অথচ ইউনিসেফ এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘মাল্টিপল ইনডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫’ এর তথ্য বলছে, ৯৭ দশমিক ৮ শতাংশ মা সন্তানকে কোনো না কোনো সময়ে বুকের দুধ পান করান। শুধু মাত্র ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ ক্ষেত্রে বিশুদ্ধভাবে শুধু বুকের দুধ দেন, যা কমে যাওয়ার কারণ পুষ্টিহীনতা, অপুষ্টি, মায়েদের কাজের চাপ, আর্থসামাজিক সংকট। কোথাও লেখা নেই, ‘ফিটনেস ধরে রাখতে মায়েরা বাচ্চাকে দুধ দেন না।’ এটি একটি মিথ্যা, ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপবাদ।
প্রকৃত সত্যটা কী? প্রকৃত সত্য হচ্ছে, বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচি এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল বিগত তথাকথিত অন্তর্বর্তী সরকারের আমল থেকেই। তার ওপর বর্তমান বিএনপির এই কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে এসে সেই ধারাবাহিকতা পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে। দ্য ডেইলি স্টারের ৭ মে’র প্রতিবেদন স্পষ্ট করে দিয়েছে, হামের টিকার মজুদ শেষ। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত। টিকা না থাকলে শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কীভাবে তৈরি হবে? এর জন্য দায়ী কে? মায়েরা? নাকি সেই শাসকগোষ্ঠী, যারা টিকা কেনার বাজেট তছরূপ করে বিলাসবহুল গাড়ি কেনে, ক্ষমতার ভোগে মত্ত থাকে?
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু আইসিইউতে মাত্র ২০টি শয্যা। একটি যন্ত্রাংশ কেনার জন্য যখন হামে আক্রান্ত শিশুর বাবা শহরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ছোটেন, তখন ফুরিয়ে যায় শিশুটির শেষ নিঃশ্বাস। এই যে অব্যবস্থাপনা, এই যে শয্যাসংকট, চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব, এগুলোর দায় কি মায়েদের? পাহাড়ি অঞ্চলে আদিবাসী শিশুরা মারা যাচ্ছে শুধু এই কারণে যে, সেখানে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছায়নি। টিকা পৌঁছায়নি। এই দায় কার? নাকি সব দোষ সেই মায়েদের, যারা নিজেরাই অপুষ্টির শিকার?
ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ আয়োজিত এক সেমিনারে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, ‘হাসপাতালগুলোতে গিয়ে দেখেছি, অনেক মা নিজেই অপুষ্টিতে ভুগছেন। ফলে শিশুর শরীরে প্রয়োজনীয় রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হচ্ছে না।’ তিনি নিজেই স্বীকার করছেন, মায়েরা অপুষ্ট। অথচ তারই দলের নেতা বলছেন, মায়েরা নাকি ফিটনেস ধরে রাখতে বাচ্চাকে দুধ দেন না। এ কেমন বৈপরীত্য, এ কেমন নিষ্ঠুর পরিহাস!
জিয়াউর রহমানের সেনানিবাসে জন্ম নেওয়া বিএনপি নামক এই রাজনৈতিক দলটির নারীবিদ্বেষী চরিত্র নতুন কিছু নয়। এটি তাদের পুরোনো প্র্যাকটিস। নারী মানেই তাদের কাছে ভোগের পণ্য, দোষ চাপানোর পাত্রী। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য তারা জনগণের দৃষ্টি ঘোরাতে বারবার এই কৌশলই নেয়। যখনই বড় কোনো সংকট আসে, তারা হয় সংখ্যালঘু নির্যাতন করে, নয়তো নারীর চরিত্রে কলঙ্ক লেপে। এই হামের সংকটেও তারা তাই করল। মায়েদের দোষারোপ করে তারা চাপা দিতে চাইল নিজেদের চরম ব্যর্থতাকে।
চিন্তা করে দেখুন, গত আড়াই দশকে বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ কখনো পঞ্চাশ হাজারের ঘর স্পর্শ করেনি। অথচ এই ২০২৬ সালে, বিএনপির শাসনামলে, মাত্র দুই মাসে আক্রান্ত ৫৫ হাজারের বেশি শিশু। মৃত্যু হয়েছে ৪৫৯টি শিশুর। প্রতিটি মৃত্যুই ঠেকানো যেত, যদি টিকাদান কর্মসূচি সুষ্ঠুভাবে চলত। যদি বিভাগীয় শহরগুলোতে শিশু আইসিইউগুলো ঠিকঠাক চলত। যদি প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া হতো। কিন্তু কিছুই হয়নি। হয়েছে শুধু মায়েদের ওপর দোষ চাপানো।
ইংরেজিতে একটা টার্ম আছে, ‘মম শেমিং’। বাংলায় এর প্রতিশব্দ খুঁজে পাওয়া কঠিন, কারণ আমাদের সমাজে মাকে দোষারোপ করাই স্বাভাবিক। বাচ্চা না খেলে দোষ মায়ের, বাচ্চা কাঁদলে দোষ মায়ের, বাচ্চার ঘুম কম হলেও দোষ মায়ের। আর এখন বাচ্চা হামে আক্রান্ত হলে তো দোষ মায়ের বটেই! এই বিষাক্ত সংস্কৃতিকে আরও উসকে দিল বিএনপির এই নেতা এবং তার দোসর গণমাধ্যম। অথচ যারা আসল দোষী, সেই জিয়াউর রহমানের আদর্শে বেড়ে ওঠা এই স্বৈরশাসক গোষ্ঠী, তারা বসে আছে নিরাপদে, নির্লিপ্তে, নির্লজ্জের মতো।
দেশের মানুষ আজ জানে, এই বিএনপি সরকারকে তারা ভোট দেয়নি। ২০২৬ সালের সেই নির্বাচন ছিল জনগণের বর্জনে ধূলিস্যাৎ হয়ে যাওয়া এক প্রহসন। জনসমর্থনহীন এই সরকার ক্ষমতায় টিকে আছে শুধু পেশিশক্তি আর প্রতারণার জোরে। আর তারাই এখন নারীদের ওপর দোষ চাপিয়ে নিজেদের বাঁচাতে চাইছে। কিন্তু আমরা এই অপসংস্কৃতি আর সহ্য করব না। মায়েদের ওপর এই অপবাদ, নারীদের এই অসম্মান, সমাজের প্রতিটি মানুষকে এর প্রতিবাদ করতে হবে।
এখনই সময় চুপ করে বসে না থেকে সোচ্চার হওয়ার। প্রশ্ন তোলার, কে দায়ী? কারা খুন করল এই শিশুদের? কেন টিকা ছিল না? কেন হাসপাতালগুলোর এত করুন অবস্থা? কেন পাহাড়ে, প্রত্যন্ত গ্রামে পৌঁছায়নি স্বাস্থ্যসেবা? এই প্রশ্নগুলোকে যতদিন না জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় তোলা হবে, ততদিন পর্যন্ত এভাবেই শিশুদের লাশের মিছিল লম্বা হবে। আর কেবল চোখের পানিতে বুক ভাসাবেন মায়েরা, বোনেরা।
নারীরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নীরবে সহ্য করে গেছে। কিন্তু সব চুপ থাকার একটা সীমা থাকে। এই অন্যায়, এই নিষ্ঠুরতা, এই নারীবিদ্বেষের বিরুদ্ধে আজ আমাদের দাঁড়াতেই হবে। কারণ, মায়ের বিরুদ্ধে তোলা এই আঙুল শুধু একজন নারীর নয়, এ আঙুল গোটা জাতির বিবেকের বিরুদ্ধে তোলা বিষাক্ত এক আক্রমণ। আর আমরা জানি, যে জাতি তার মায়েদের সম্মান দিতে জানে না, সেই জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার। বিএনপি সেই অন্ধকারই ডেকে আনছে বারবার। এবার বোধহয় সেই অন্ধকার ঠেলে আলোয় ফেরার সময় এসেছে।
আরো পড়ুন

