Share
বায়তুল মোকাররমের পূর্ব চত্বরে ইসলামিক ফাউন্ডেশন মাসব্যাপী বইমেলা ফেঁদে বসেছে। নামে ইসলামি, চেহারায় সালাফি-জিহাদি। স্টলের তাকে সাজানো ওসামা বিন লাদেন, আয়মান আল-জাওয়াহিরি, আবদুল্লাহ আযযাম, খালিদ আল হুসাইনান, আনোয়ার আল-আওলাকি, আসিম আল বারকাওয়ি, আবু হামজাহ, আহমাদ ফারুকের বই।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ যাদের সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত করেছে, ভারতীয় উপমহাদেশে যাদের সংগঠন আনসার আল-ইসলাম ২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ, সেই নেতাদের বয়ান আর অনূদিত বই সরকারি আয়োজনে বসা মেলায় দেদার বিক্রি হচ্ছে। প্রশ্ন একটাই, পেছনে কারা?
আপনি যদি ভাবেন এটা কোনো ভুল বা অনিয়ম, তবে ভুল ভাবছেন। এটা একটা গোটা সিস্টেম। একটা নেটওয়ার্ক। যার পেছনে রয়েছে নির্দিষ্ট কিছু প্রকাশনী, নির্দিষ্ট কিছু অনুবাদক, নির্দিষ্ট কিছু দাওয়াহ সার্কেল এবং নির্দিষ্ট কিছু সুবিধাভোগী। তারা জানে কী করছে, জানে কাদের বই ছাপাচ্ছে, জানে কাদের বয়ান ছড়াচ্ছে। তারপরও করছে। কারণ এতে তাদের ব্যবসা আছে, আছে আদর্শিক লাভ, আছে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা।
মেলা ঘুরে দেখা যায়, সিয়ান, সন্দীপন, সমকালীন, রুহামা, আর-রিহাব, শব্দতরু, চেতনা, ইলমওয়েব, ইলমহাউজ, খান প্রকাশনীসহ ডজনের বেশি প্রতিষ্ঠান উগ্রবাদী ধারার বই প্রকাশ ও বাজারজাত করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাবাজারের ইসলামী টাওয়ারের এক প্রকাশক স্পষ্ট বলেছেন, সিয়ান, সন্দীপন, সমকালীন ও রুহামা সালাফি ঘরানার। তারাই বেছে বেছে উগ্রপন্থী নেতাদের বই বাজারে আনছে। এদের কারও কারও সঙ্গে সাবেক সামরিক কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। এজন্য সাধারণ প্রকাশকেরা তাদের ঘাঁটান না।
আর-রিহাব পাবলিকেশনের মালিক রফিকুল ইসলাম এই মেলার আয়োজন কমিটিরও সদস্য। তার প্রকাশনীই প্রকাশ করেছে আল-কায়েদার শীর্ষ নেতা খালিদ আল হুসাইনান ওরফে আবু জায়েদ আল-কুয়েতির হাফডজন বই। প্রকাশ করেছে ওসামা বিন লাদেনকে নিয়ে মোল্লা দাদুল্লাহর সত্যের সন্ধানে সেই যুবক, আয়মান আল-জাওয়াহিরির আমার দেখা শাইখ ওসামা, আনওয়ার আল-আওলাকির নবিদের জীবন কাহিনি, আসেম ওমরের দাজ্জাল: কালো পতাকার চূড়ান্ত শত্রু ও দুটি জীবন ব্যবস্থার লড়াই: ইসলাম ও গণতন্ত্র, ইউসুফ আল-উয়াইরি ও আনওয়ার আল-আওলাকির যৌথভাবে লেখা আল্লাহর পথে যা কিছু অপরিবর্তনীয়। এসব বইয়ের অধিকাংশের অনুবাদক, সংকলন ও সম্পাদনা করেছেন মুফতি আরিফ মাহমুদ।
২০২১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর বাংলাবাজার থেকে আর-রিহাবের প্রকাশক ও মালিক হাবিবুর রহমান ওরফে শামীমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের এন্টি টেরোরিজম ইউনিট। পরে পুলিশ জানায়, হাবিবুর রহমান আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য। তিনি মুফতি জসিমউদ্দিন রাহমানীর মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে উগ্রবাদ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বই প্রকাশ ও বিক্রি করেন। অথচ এই প্রকাশনীর মালিকই আজ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বইমেলার আয়োজন কমিটির সদস্য। কোন যুক্তিতে? কোন বিবেচনায়? কোন আইনে?
আর-রিহাবের প্রকাশিত বইয়ের অনলাইন পরিবেশক রুহামাশপ, ওয়াফিলাইফ ও রকমারি। গত ৫ জুলাই আর-রিহাব পাবলিকেশন্সের ফেসবুক পেজে আসেম ওমরের বইটির প্রচ্ছদ পোস্ট করে লেখা হয়, রহমানি সাহেব যে বইটি হাইলি রেকমেন্ড করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ। দ্রুতই সংগ্রহ করুন। গত ৩ জুলাই আরেকটি বইয়ের প্রচ্ছদ যুক্ত করে বলা হয়, বইটি আসিফ আদনান হাইলি রেকমেন্ড করেছেন।
গত ১৫ মে এসব বইয়ের সঙ্গে কয়েকটি যুক্ত করে লেখা, শাইখ মুফতি হারুন ইজহার হাফিজাহুল্লাহর প্রিয় বইগুলো। দ্রুতই সংগ্রহ করুন। অর্থাৎ, যারা জামিনে মুক্ত, যারা দাওয়াহ সার্কেলের সঙ্গে যুক্ত, তারাই এসব বইয়ের রেকমেন্ডেশন ছড়াচ্ছেন। প্রকাশকেরা সেই রেকমেন্ডেশন ব্যবহার করছেন বিপণনে। এটা কি শুধু বই বিক্রি? নাকি এটা একটা আদর্শিক নেটওয়ার্কের সক্রিয় প্রচারণা?
শব্দতরু প্রকাশনী প্রকাশ করেছে শাইখ খালিদের চারটি বই। শাইখ আবু হামজাহ নামে দণ্ডপাওয়া আরেক আল-কায়েদা নেতার বইয়ের বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করেছে তারা। ২০১৫ সালে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে নিউইয়র্কের আদালত আবু হামজাহকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এর আগে ২০০৪ সালে তিনি গ্রেপ্তার হন এবং ২০০৬ সালে প্রথম যুক্তরাজ্যের আদালতে সাত বছরের কারাদণ্ড পান।
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে ২০১২ সালে আবু হামজাহকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেয় ব্রিটেন। ওসামা বিন লাদেনের গুরু আবদুল্লাহ আযযামের সঙ্গে ১৯৮৭ সালে আবু হামজাহর দেখা হয়। এরপর তিনি জিহাদের উদ্দেশ্যে আফগানিস্তান যান। এমন একজন দণ্ডিত সন্ত্রাসীর বই অনুবাদ, প্রকাশ ও বিপণনের বিষয়ে শব্দতরুর মালিক হাসান জামিলকে একাধিক দিন কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। কেন? কী লুকানোর আছে?
ইলমওয়েব প্রকাশ করেছে শাইখ আহমাদ মুসা জিবরিল ও শাইখ আসিম আল বারকাওয়ীর বই। আসিম আল বারকাওয়ীর জন্ম ফিলিস্তিনের নাবলুসে। তাঁকে আল-কায়েদা ইন ইরাকের প্রতিষ্ঠাতা আবু মুসাব আল-জারকাভির আধ্যাত্মিক গুরু বলা হয়। আল-কায়েদার এই শাখা থেকেই ২০১৩ সালে ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড সিরিয়ার (আইসিস) যাত্রা। ২০০৫ সালে আম্মানের হোটেলে বোমা বিস্ফোরণে ৫৭ বেসামরিক নিহতের ঘটনায় আল-জারকাভিকে ত্যাগ করে আসিম আইসিসকে বিপথগামী সংগঠন আখ্যা দেন। আসিমের আলোচিত দুই গ্রন্থ মিল্লাতে ইব্রাহিম ও আমাদের আকিদাহ। বাংলায় অনূদিত প্রথম বইটি আত্-তিবয়ান এবং দ্বিতীয়টি প্রকাশ করেছে ইলমওয়েব। আহমদ মুসা জিবরিলের ২৭টি বই ও প্যাকেজ পাওয়া যাচ্ছে রকমারিতে, যেটি ওয়াফিলাইফে ৩৪। এসব বইয়ের অধিকাংশের প্রকাশক সন্দীপন ও সমকালীন। ইলমওয়েব প্রকাশ করেছে চারটি।
জিবরিলের অন্যান্য বই এনেছে ইলহাম, সীরাত, পেনফিল্ড, ইলমহাউস, সত্যায়ন, হাসানাহ, পথিক, ইহসান, চেতনা, সাবিল ও উদ্দীপন প্রকাশন। যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা হলেও জিবরিল দেশটিকে ইসলামের অস্তিত্বের প্রধান শত্রু জ্ঞান করেন। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়েছে, প্রাচীন ধারার সালাফি শিক্ষা, আইন বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ এবং নিজের অনলাইন সক্রিয়তার মাধ্যমে জিবরিল বর্তমান সময়ের অন্যতম প্রভাবশালী উগ্রপন্থী সালাফি বক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। জিবরিল সশস্ত্র জিহাদকে ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে স্বাভাবিকিকরণ করছেন। আধুনিক উগ্রপন্থাকেও ন্যায়সঙ্গত করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
খান প্রকাশনীর স্টলে পাওয়া যায় প্রকৌশলী আনোয়ার আল-আওলাকির পরকালের পথে যাত্রা, আল্লাহ আমাদের বিজয়ের জন্য প্রস্তুত করছেন, মনস্তাত্বিক লড়াইসহ কয়েকটি বই। ইয়েমেনি বংশোদ্ভূত মার্কিন এই নাগরিককে আল-কায়েদা ইন অ্যারাবিয়ান পেনিনসুলার (একিউএপি) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নেতা বলা হতো। ২০১১ সালে ওসামা বিন লাদেনকে হত্যার কিছুদিন পরে ইয়েমেনে মার্কিন ড্রোন হামলায় আনোয়ার আল-আওলাকি মারা যান। খান প্রকাশনীর মালিক মাওলানা ইসহাক খানের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের জানুয়ারি ও জুলাইয়ে নারায়ণগঞ্জ এবং মানিকগঞ্জের সিংগাইরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে পৃথক মামলা হয়।
পরে ১০ জুলাই তাঁকে গ্রেপ্তার করে র্যাব-৩। ২০২১ সালে মুক্তি পান ইসহাক। গ্রেপ্তারের পরে র্যাব জানিয়েছিল, আনসার আল ইসলামের আধ্যাত্মিক নেতা মুহাম্মদ জসীমুদ্দীন রাহমানীর ছাত্র ইসহাক। তাঁর ভাই আশরাফ খানও আনসার আল ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। আরেক ভাই কারাবন্দি রাকিব হিযবুত তাহরীরের সদস্য। খান প্রকাশনী ও মাকবুল প্রকাশনী নামে দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে এই ধারার বিভিন্ন বই প্রকাশ করে মাদ্রাসায় সরবরাহ করতেন ইসহাক।
এ বিষয়ে আয়োজক ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক মুফতি মুহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহিল বাকী নদভী বলেন, কেবলমাত্র যদি আলেম-উলামারা বলেন যে এগুলো আল-কায়েদার বই, তাহলেই কেবল আমরা ব্যবস্থা নেব। অথচ এই বইগুলোর লেখকেরা জাতিসংঘের সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত। অথচ এই বইগুলোর অনুবাদক ও প্রকাশকদের অনেকের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়েছে, গ্রেপ্তার হয়েছেন, কারাদণ্ড ভুগেছেন। তারপরও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালকের প্রশ্ন, আলেম-উলামারা বলেননি কেন? আলেম-উলামারা কেন বলবেন? যারা এসব বই প্রকাশ করছেন, তাদের অনেকেই তো নিজেদের আলেম-উলামা পরিচয় দেন। তাহলে কে বলবে? সরকারি সংস্থা? আইনশৃঙ্খলা বাহিনী? নাকি জনগণ?
অধ্যাপক শাফী মো. মোস্তফা বলেছেন, উগ্রবাদ ডিল করার জন্য সরকারের একটি নীতি থাকা উচিত, যা এখনো দেখা যাচ্ছে না। তিনি আরও বলেছেন, উগ্রবাদকে সঠিকভাবে ডিল করতে শুধু দরবারি আলেমদের যুক্ত না করে, সর্বজন শ্রদ্ধেয় বা বিভিন্ন ঘরানার মানুষের সমন্বয়ে একটি বোর্ড গঠন করা যেতে পারে। বোর্ডের অধীনে একটি কমিটি থাকবে, যারা এই কর্মসূচির অগ্রদূত হবে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, সরকারের নীতি না থাকলে কি উগ্রবাদী বই বিক্রি বন্ধ হয় না? আইন নেই? সন্ত্রাসবিরোধী আইন আছে। নিষিদ্ধ সংগঠনের তালিকা আছে। তারপরও সরকারি মেলায় আল-কায়েদার বই বিক্রি হচ্ছে। এর দায় কার? কেবল ইসলামিক ফাউন্ডেশনের? নাকি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের? নাকি ধর্ম মন্ত্রণালয়ের? নাকি সবাই একসাথে দায় এড়িয়ে যাচ্ছে?
জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের সাবেক সদস্যসচিব ও বর্তমান নির্বাহী কমিটির ১ নম্বর সদস্য প্রিন্সিপাল নজরুল ইসলাম তালুকদার বলেছেন, এই ধরনের বই প্রকাশ্যে বিক্রি হওয়া কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। এসব বই সমাজ, রাষ্ট্র ও জাতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাও নষ্ট করতে পারে। মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায়; মানুষের স্বাধীন জীবনযাপন বাধাগ্রস্ত করে; সমাজে নৈরাজ্য তৈরি হয়– এমন যেকোনো বইয়ের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু তারা সেটি না করলে সক্রিয় নাগরিকদের উচিত সামাজিকভাবে এসব তুলে ধরা।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে দেশজুড়ে উগ্রবাদী তৎপরতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। জেএমবি, হুজি, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের মতো সংগঠনগুলি তখন রমরমিয়ে চলত। সিরিজ বোমা হামলা, গ্রেনেড হামলা, জজ হত্যাকাণ্ড, ব্লগার হত্যাকাণ্ডসহ রক্তাক্ত ঘটনায় দেশ যখন উত্তাল, তখন ক্ষমতায় ছিল এই জোটই। ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিয়ে আবারও ফিরে এলো সেই ২০০১-০৬ সালের বিএনপি-জামাতের অপশাসন। আবারও ২০২৬ সালে দেশের বুকে সরকারি মেলায় আল-কায়েদার বই, আবারও উগ্রবাদী প্রকাশকদের দৌরাত্ম্য, আবারও একই চিত্র। প্রশ্ন একটাই, এই অপশাসনের পেছনে কারা?
আরো পড়ুন

