Share
বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটার মাটি এখন এক অদ্ভুত অসুখে আক্রান্ত। ওপর থেকে দেখলে মনে হবে সব স্বাভাবিক, কিন্তু ভেতরে ভেতরে পঁচন ধরেছে অনেকদিন আগেই। সেই পঁচন এখন গা বেয়ে উঠে আসছে রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড বরাবর। যে রোগের নাম ওয়াহাবিজম, তার জীবাণু ছড়িয়ে পড়েছে সমাজের এমন সব কোষে যেখানে অ্যান্টিবায়োটিক পৌঁছানোই কঠিন।
মসজিদের ইমাম থেকে শুরু করে মাদ্রাসার উস্তাদ, আবাসিকের বদ্ধ ঘর থেকে শুরু করে মক্তবের বারান্দা পর্যন্ত সর্বত্র এই ভাইরাস নিজের শেকড় গেড়ে বসে আছে। চোখ বন্ধ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল, যখন এই একই ভাইরাস রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে সহবাস করে জন্ম দিয়েছিল এক ভয়াবহ অন্ধকার সময়ের। মানুষ ভেবেছিল সেই সময় আর ফিরবে না, কিন্তু ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি এত দ্রুত ঘটবে কেউ ভাবেনি।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশ এক বিশাল মানববোমার ওপর বসে আছে। জনগোষ্ঠীর এই অংশটার কাছে এম্প্যাথি বা সিম্প্যাথি বলে কোনো শব্দই নেই। এদের বড় অংশের কাছে পৃথিবীর সব সুন্দর জিনিসই হারাম। পহেলা বৈশাখ হারাম, কনসার্ট হারাম, সংস্কৃতি চর্চার প্রতিটি টুলস হারাম। শবে বরাত হারাম, মিলাদুন্নবীও বেদআত। মাজার তো চোখের বিষ, সুযোগ পেলেই ভাঙতে ছুটে আসে। অর্থাৎ নিজেদের সঙ্কীর্ণ চিন্তা কাঠামোর বাইরে বৈচিত্র্যময় কোনো কিছুর অস্তিত্বই এরা মেনে নিতে পারে না। শুধু অপছন্দ করলেও সহ্য করা যেত, কিন্তু এরা চায় এসবের অস্তিত্বই বিনাশ করতে। ভিন্নমতের মানুষকে শেষ করে দিতে, ভিন্ন সংস্কৃতির শেকড় উপড়ে ফেলতে, ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা প্রতিটি স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিতে এদের আনন্দ।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এরা নৈতিক বা চারিত্রিকভাবে শক্তিশালীও নয়। শিশু নির্যাতন, ধর্ষণের মতো অপরাধকেও এরা নর্মালাইজ করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। অদ্ভুত এক ডিনায়ালের ভেতর নিজেদের কাজকে জাস্টিফাই করার প্রবণতা এদের রক্তে মিশে গেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেউ একটু ভিন্নমত প্রকাশ করলে এদের প্রতিক্রিয়া দেখলে মনে হয় সভ্য সমাজের কোনো চিহ্নই এদের মধ্যে অবশিষ্ট নেই। প্রতিপক্ষের বাবা-মাকেও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে এদের এক সেকেন্ডও লাগে না। এমনকি নিজেদের মধ্যে যারা এই চিন্তা সাবস্ক্রাইব করে না, যারা একটু র্যাশনালি ভাবতে চায়, তাদের জীবনটাও বিষিয়ে তুলতে এরা ওস্তাদ।
এরা সংখ্যায় খুব বেশি নয়, কিন্তু সংগঠিত এবং আগ্রাসী। রাষ্ট্রও এদের ভয় পায়। এদের তোষণ করার নীতিতেই যেন রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারিত হয়। ভোটব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করার লোভে এদের প্রতিটি দাবি মেনে নেওয়া হয়। আর এই সুযোগটাই এরা কাজে লাগায়। প্রয়োজনে মজলুমের খোলস পরে নিজেদের ভিকটিম সাজায়, আবার অনুকূল পরিবেশ পেলে সেই খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসে জালিম হয়ে। একদল তথাকথিত বুদ্ধিজীবী এই কাজে ফুয়েল দেয়। এদের যেমন খুশি তেমন সাজো প্রকল্পকে নিজেদের বুদ্ধিজীবীতার টুলস বানিয়ে নেয়। এদের সাব-অল্টার্ন ও বাঙালি মুসলমানদের প্রতিনিধি বানানোর চেষ্টা চলে নিরন্তর। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এরা এই অঞ্চলের খুবই সাম্প্রতিক ঘটনা। এদের পূর্বপুরুষ নিম্নবর্গীয় সমাজের প্রতিনিধি হতে পারে, কিন্তু এরা নয়। এরা মূলত দাবার গুটি। আবাসিকের বদ্ধ ও দমবন্ধ পরিবেশে ওস্তাদরা এদের স্রেফ লাঠিয়াল হিসেবে তৈরি করেছে। দারিদ্র্য ও অসহায়ত্বকে পুঁজি করে একশ্রেণির মানুষ এদের ব্যবহার করছে নিজেদের স্বার্থে। এরা সৌদি-মার্কিন পেট্রো-ডলারের আধুনিক সন্তান, যদিও ফল ভোগ করে অন্যরা। এই বাস্তবতা বুঝতে হবে রাষ্ট্রকে। এদের কীভাবে ডিল করতে হবে সেটা খুঁজে বের করতে হবে এখনই। এরা যদি আইনি, নৈতিকতা ও ধর্মের প্রশ্নে এভাবে ওয়াকওভার পেতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যত বাংলাদেশের জন্য ভয়াবহ এক সময়ই অপেক্ষা করছে।
এই পরিস্থিতির জন্য সবচেয়ে বড় দায়ী মসজিদের ইমামরা। কমিটিকে খুশি রাখার জন্য তারা খুতবা দিয়ে গেছে, দিয়ে যাচ্ছে। সত্য বলার সাহস তাদের নেই, কারণ সত্য বললে কমিটি বদলে যাবে, বেতন বন্ধ হয়ে যাবে, সম্মান থাকবে না। তাই তারা মুখ বুজে থাকে, কিংবা উল্টো তারাই আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। মসজিদের মিম্বর থেকে যে কথা বলা হয়, তা সমাজের সাধারণ মানুষের কাছে শেষ কথা। সেখানে যদি বিদ্বেষ, ঘৃণা, বিভেদের বীজ বপন করা হয়, তাহলে সমাজে তার প্রতিফলন ঘটবেই। আর সেটাই ঘটছে। যে কারণে বাংলাদেশের আনাচে কানাচে জন্ম নিচ্ছে আরও মানববোমা।
ভয়াবহ সময় অপেক্ষা করছে না, ভয়াবহ সময় এখনই চলছে। কেউ চোখ খুলে দেখতে চাইছে না। বুদ্ধিজীবীরা নীরব, সাংবাদিকরা আতঙ্কিত, রাজনীতিবিদরা হিসেবি। এই নীরবতাই এদের শক্তি বাড়িয়ে দিচ্ছে প্রতিদিন। এরা এখন আর শুধু মাজার ভাঙে না, এরা সমাজের ভিত ভাঙছে। এরা আর শুধু সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কথা বলে না, এরা মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা কেড়ে নিতে চায়। এরা আর শুধু নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তারা এখন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ঢুকে পড়েছে। বিএনপি ক্ষমতায় এসে তাদের সঙ্গে আঁতাত করেছে, জামাত ইসলাম সংসদে ক্ষমতার ভাগ বসিয়েছে। ফলে এই চক্র আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
এরা এতটাই মুনাফেক যে সময় ও পরিস্থিতি অনুযায়ী কখনও ভিকটিম, কখনও জালিমের রূপ ধারণ করে। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, বর্তমান সময়ে সরকারও যেন এদের সামনে নতজানু। এদের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হয় এরা সত্যিই একেকজন হিউম্যান বম্ব। যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরিত হতে পারে। সেই বিস্ফোরণে উড়ে যাবে বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, সহাবস্থান, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সবকিছু। অথচ কেউ যেন দেখতে পাচ্ছে না, কিংবা দেখতে চাইছে না।
আরো পড়ুন

