Share
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন ঘোষণা দিয়েছেন, দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় পর্যায়ে পবিত্র কোরআন প্রতিযোগিতা হবে। বললেন, এতে নাকি শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ বাড়বে। অথচ তিনি নিজেই জানেন না, নৈতিকতা আর ধর্ম মুখস্থ করা এক জিনিস না। কোরআন তিলাওয়াত প্রতিযোগিতা করলেই যদি নৈতিকতা তৈরি হতো, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসম্পদ লুট করে খাওয়া শাসকগোষ্ঠী, পাকিস্তানের ধর্মীয় উন্মাদনা আর বাংলাদেশের মাদ্রাসাগুলোর ভেতরের অন্ধকার এত প্রকট হতো না।
প্রথমেই প্রশ্ন, কোন যুক্তিতে কোরআন প্রতিযোগিতা নৈতিকতা শেখায়? একটি শিশু যদি সুর মুখস্থ করে প্রথম হয়, তার ভেতরে কি প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ববোধ জন্মাবে? না। বরং জন্মাবে প্রতিযোগিতার নেশা, অহংকার আর নিজের ধর্মকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণের উন্মত্ততা। শিশুর ছোট মাথায় ঢুকে যাবে তার বন্ধু অন্য ধর্মের বলে জাহান্নামি, তার ধর্মই একমাত্র সত্য। এই শিক্ষা নৈতিকতা না, এটা বিভেদের বীজ। এটা সহপাঠীর প্রতি ঘৃণা শেখায়, শ্রদ্ধা নয়।
বাংলাদেশে ধর্মশিক্ষার ফলাফল চোখের সামনে। মাদ্রাসায় সবচেয়ে বেশি ধর্ম পড়ানো হয়। সেই মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা কি দেশের সবচেয়ে সৎ মানুষ? মাদ্রাসা থেকে উঠে আসা শিক্ষক, ইমাম, খতিবদের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ কি কম? গ্রামেগঞ্জে ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের কুদৃষ্টি থেকে নারীদের বাঁচতে পর্দার আড়ালে সরে যেতে হয়, এটা কি অস্বীকার করবেন শিক্ষামন্ত্রী? ধর্মীয় শিক্ষা কি এই বিকৃতি ঠেকাতে পেরেছে? পারেনি। কারণ ধর্ম মুখস্থ করানো মানে নৈতিক মানুষ তৈরি করা না, বরং ক্ষমতার কাঠামোর প্রতি আনুগত্যশীল বানানো।
এক গবেষণায় উঠে এসেছে, এশিয়ার মুসলিম ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে কম নৈতিকতার পরিচয় দেন। চীনে গিয়ে তারা চীনা ব্যবসায়ীদের আতিথেয়তা প্রত্যাখ্যান করেন হালাল খাবার নেই বলে, কিন্তু সেই একই চীন থেকে ভেজাল, নকল পণ্য আনতে দ্বিধা করেন না। অথচ প্রতারণা করা কি হালাল? ধর্মশিক্ষা তো তাকে শেখাল না যে ভোক্তাকে ঠকানো হারাম। তার মুখস্থ করা সুরা তাকে বাধা দিল না মিথ্যা বলতে, নকল বানাতে। তাহলে ধর্মশিক্ষা কোন নৈতিকতা তৈরি করল?
বাংলাদেশের উচিত ছিল পাঠ্যপুস্তক থেকে ধর্মশিক্ষা বাদ দেওয়া। অন্তত স্কুল পর্যায়ে নৈতিক শিক্ষা, মানবিক শিক্ষা, দর্শন আর বিজ্ঞান পড়ানো উচিত। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রী উল্টো দিকে হাঁটছেন। কোরআন প্রতিযোগিতার নামে শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মীয় মৌলবাদ ঢুকিয়ে দিচ্ছেন। এটা শিক্ষাকে জামাতিকরণের পথ খুলে দেওয়া ছাড়া কিছু না। যারা বলে ধর্মের বাড়াবাড়ি হয়নি, তারা ইরান, আফগানিস্তানের দিকে তাঁকাক। খোমেনি, লাদেন আসার আগ পর্যন্ত সেগুলো ছিল আধুনিক শিক্ষায় এগিয়ে থাকা দেশ। তারপর এল ধর্মের রাজনীতি, কোরআন আর মাদ্রাসার জোয়ার। ফলাফল আজ সারা বিশ্ব জানে। নারীশিক্ষা বন্ধ, সংগীত নিষিদ্ধ, মানবিকতা ধ্বংস। বাংলাদেশ এখন সেই দিকেই এগোচ্ছে।
শিক্ষামন্ত্রী হয়তো ভাবেন, ধর্মীয় প্রতিযোগিতা জাতিকে নৈতিক করবে। কিন্তু এই বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া হেলিকপ্টারপ্রেমী মন্ত্রী যেটা জানেন না সেটা হচ্ছে, অতিরিক্ত ধর্মীয় শিক্ষা জাতিকে কখনো সৎ করে না, বরং অন্ধ, সংকীর্ণ আর ভীতু বানায়। যে জাতি নিজের ধর্ম নিয়ে সবচেয়ে বেশি চিৎকার করে, সে জাতিই আসলে সবচেয়ে বেশি নৈতিক সংকটে ভোগে। বাংলাদেশকে বাঁচাতে হলে পাঠ্যবই থেকে ধর্ম সরাতে হবে, ধর্ম রাখতে হবে ব্যক্তিগত বিশ্বাসে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হোক যুক্তি, বিজ্ঞান আর মানবতার চর্চার জায়গা, মুখস্থ সুরার প্রতিযোগিতার মঞ্চ নয়।
শিক্ষামন্ত্রী তথা দখলদার অবৈধ এই তথাকথিত বিএনপি-জামাত সরকারের এই উদ্যোগ শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও পশ্চাৎমুখী করবে। প্রতিযোগিতার নামে ধর্মীয় গোঁড়ামি শিশুদের মাথায় ঢোকানো হবে। এতে জাতি হারাবে মুক্তচিন্তা, যুক্তিবাদ আর মানবতা। শিক্ষামন্ত্রী বলছেন নৈতিকতা শেখাবেন, কিন্তু আসলে শেখাবেন অন্ধ আনুগত্য। ধর্মের বাড়াবাড়ি কখনোই ভালো ফল বয়ে আনে না।
আরো পড়ুন

