Share
সুনাই নদীর পাড়ে যখন হাজার মানুষ একসাথে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বাইচের নৌকাকে উৎসাহ দেয়, তখন কেউ জিজ্ঞেস করে না কে হিন্দু, কে মুসলিম, কে কোন দলের। এই একটা দিনের জন্য পুরো এলাকা এক হয়ে যায়। অথচ এবার বিয়ানীবাজারের লাউতায় এই চিরচেনা দৃশ্যটাই চিরতরে শেষ করে দিতে চাইছে একদল মানুষ, যারা নিজেদের পরিচয় দিচ্ছে তৌহিদী জনতা নামে।
সিলেটের বিয়ানীবাজারে সুনাই নদীর শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এই নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি তুলেছে এই উগ্রবাদী ইসলামিক গোষ্ঠী। আয়োজকরা ২৮ আগস্ট প্রতিযোগিতাটি সম্পন্ন করতে প্রস্তুতি নিলেও সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচার আর মসজিদে সভা করে এই আয়োজন বাতিলের চেষ্টা চলছে। বৃহস্পতিবার বারিগ্রাম বাজার মসজিদে ‘তৌহিদী জনতা লাউতা ইউনিয়ন’ ব্যানারে সভা করে প্রতিযোগিতাটি বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে। আর প্রশাসনও লেজ গুটিয়ে নিয়ে বলছে, “অনুমতি ছাড়া কোনো নৌকাবাইচ হবে না!” অর্থাৎ চাপে পড়ে প্রশাসনও যেন ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের অপেক্ষায়। কি লজ্জা!
লাউতা-বাহাদুরপুর যুব সমাজ বছরের পর বছর ধরে এই বাইচ আয়োজন করে আসছে, কোনো ঝামেলা ছাড়াই। এবারই হঠাৎ ফেইসবুকে পোস্ট পড়া শুরু হলো, মসজিদে সভা বসলো, আর দাবি উঠলো পুরো আয়োজনটাই বন্ধ করে দেওয়ার। স্থানীয় এক বাসিন্দার কথায়, “নিজের ঘর ঠিক নাই, পরের ঘর ঠিক করতে চায় এমন কিছু লোক থাকে। তারাই নৌকাবাইচ বন্ধে অপপ্রচার করছে।” এই কথাটা শুধু একটা গ্রামের না, এটা এখন গোটা দেশের চিরচেনা প্যাটার্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘২৪ এর জুলাই দাঙ্গার পর বিগত আড়াই বছরে।
কারা এই তৌহিদী জনতা? কোন সাহসে তারা শত বছরের লোকজ সংস্কৃতির ওপর ফতোয়া জারি করে? এদের উত্থান কি হঠাৎই, নাকি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশে বসে থাকা কোনো রাজনৈতিক শক্তি এসব উগ্রবাদী গোষ্ঠীকে মদদ দিচ্ছে?
ঘটনা হচ্ছে, এই নৌকা বাইচ কোনো নতুন ফ্যাশন না। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে বাংলার সুবেদার ইসলাম খান চিশতি ১৬১০ সালে রাজধানী ঢাকায় নিয়ে আসেন এবং ঢাকার নাম রাখেন জাহাঙ্গীরনগর। তিনিই ধোলাই খাল খনন করেন, বারো ভূঁইয়াদের হারিয়ে গোটা বাংলায় মুঘল শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। নৌশক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের বিনোদনের জন্য তিনিই বাংলায় নৌকাবাইচ উৎসবের প্রচলন করেছিলেন। অর্থাৎ চারশো বছর আগে একজন মুসলিম শাসকের হাত ধরে শুরু হওয়া একটা সাংস্কৃতিক উদ্যোগ আজ মুসলমানেরই একাংশের কাছে হঠাৎ অনৈসলামিক হয়ে গেল। এটা ইতিহাসের সাথে একটা নিষ্ঠুর পরিহাস ছাড়া আর কিছু না।
আর এটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা না যে ২০২৬ সালে এসে এই ধরনের ঘটনা বেড়েই চলেছে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ও সারাদেশে এমন উগ্রবাদী গোষ্ঠী মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। মাদ্রাসা আর মসজিদের নাম ব্যবহার করে তারা সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে নৌকাবাইচ, পহেলা বৈশাখ, লোকজ মেলা, এমনকি নাটক-সিনেমার বিরুদ্ধেও ফতোয়া দিত। সেই অন্ধকার সময়ের রেশ কাটতে না কাটতেই আজ বিএনপি ফের ক্ষমতায়, সংসদে জামায়াতে ইসলামীও ভাগ বসিয়েছে। যে জোট মেলা, বাউল গান, নৌকা বাইচ, পালাগানের মতো বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতির বিরুদ্ধে গত দুই দশকে বারবার একধরনের নীরব সমর্থন দিয়ে এসেছে, তাদের শাসনামলে এমন ঘটনা ঘটবে সেটাই স্বাভাবিক। যেখানে হাজার মানুষ প্রতি বছর নির্বিঘ্নে এই আয়োজন উপভোগ করে এসেছে, সেখানে হঠাৎ একটা উগ্র গোষ্ঠীর আপত্তিতে প্রশাসনকে এত সতর্ক হতে হচ্ছে কেন, এই প্রশ্নের উত্তর অনেকেই জানেন, শুধু প্রকাশ বলতে ভয় পান প্রাণনাশের আশঙ্কায়।
উগ্র ডানপন্থার সাথে আপস করলে শেষ পর্যন্ত কেউই যে রেহাই পায় না, এটা নিপাতনে সিদ্ধ। এদের দাঁড়াতে দিলে বসতে চায়, বসতে দিলে শুতে চায়। আজ নৌকা বাইচ বন্ধ হলে কাল পহেলা বৈশাখ, পরশু বইমেলা, তারপর বাউল গানের আসর কিংবা নাটক-সিনেমা – সব। একবার এক ইঞ্চি জমি ছেড়ে দিলে এরা থামে না, পুরো সমাজটাই দখল করে নিতে চায়। যারা মনে করছেন এটা শুধু বিয়ানীবাজারের স্থানীয় সমস্যা, তারা ভুল করছেন। এটা আসলে গোটা বাংলাদেশ কোন দিকে যাচ্ছে তার একটা ছোট্ট নমুনা মাত্র।
মনে রাখা দরকার, ইসলাম কখনো আনন্দ-উৎসবের বিরুদ্ধে নয়। ইসলাম খানের হাতে যে ঐতিহ্যের জন্ম, সেই ঐতিহ্যকে বাঁচানো আমাদের দায়িত্ব। যারা ধর্মের নামে সংস্কৃতি ধ্বংস করতে চায়, তারা মূলত ধর্মেরই শত্রু।
লাউতা-বাহাদুরপুরের আপামর জনসাধারণ বলছেন, নৌকা বাইচ হবে। ২৮ আগস্ট নদীর পাড়ে মানুষ জড়ো হবে, নৌকা ভাসবে, আর প্রমাণ হবে এই মাটির মানুষ এখনো নিজেদের শেকড় আঁকড়ে ধরে আছে। সুনাই নদীর নৌকাবাইচ শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়, এটা অস্তিত্বের প্রশ্ন। প্রশ্ন হলো, প্রশাসন আর যারা ক্ষমতায় আছে তারা এই শেকড়ের পাশে দাঁড়াবে, নাকি আরেকবার নীরব থেকে উগ্রতাকে জায়গা করে দেবে?
আরো পড়ুন

