ইসলামের নামে যে সন্ত্রাসের যে নব্যতম সংস্করণের বিকাশ ঘটেছে, তার ছাতা আসলে মেলে ধরে আছে কারা?

Share

তৌহিদী জনতা নামের গোষ্ঠীটা বিদেশী রাষ্ট্রের টাকায়, ইসলামিক জঙ্গি সংগঠনের সহায়তায় আর সামরিক বাহিনীর সমর্থনে ২০২৪ সালে দেশব্যাপী জুলাই দাঙ্গা বাঁধিয়ে দেশের নির্বাচিত সরকারকে ক্যু করে ফেলে দিয়ে সুদী মহাজন ইউনুস ও যুদ্ধাপরাধী এবং ইসলামি জঙ্গি সংগঠন জামায়াতে ইসলামী আর স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমানের বানানো সেনানিবাসে জন্ম নেয়া দুর্নীতি-সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর বিএনপি অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করার পর থেকে রীতিমতো রাষ্ট্রের সমান্তরাল বিচারব্যবস্থা খুলে বসেছে।

যাদের হাতে কোনো আইন নেই, কোনো এখতিয়ার নেই, তারা আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ফতোয়া দিচ্ছে, রায় দিচ্ছে, আবার সেই রায় নিজেরাই কার্যকরও করছে। কেউ কবর থেকে মরদেহ তুলে আগুন দিচ্ছে, কেউ মাজারে হামলা চালিয়ে সেখানে প্রতিমা ভাঙছে, কেউ নারী ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করতে মাঠে নেমে মারামারি করছে, কেউ আবার ভালোবাসা দিবসে ফুলের দোকানে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। অথচ এই বর্বরতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ে না। বরং দিন দিন এই জনতা আরও সাহসী হচ্ছে, কারণ তারা জানে তাদের পেছনে ঢাল হয়ে আছে স্বয়ং ক্ষমতাসীন সরকার!

‘তৌহিদী জনতা’ আসলে কারা, কারা তাদের পেছনে ছাতা ধরে রেখেছে, আর কেন এই অপশক্তি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, সেটা বুঝতে হলে চোখ বন্ধ করে ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের বাংলাদেশটা মনে করাই যথেষ্ট। তখনো এই একই চিত্র ছিল। মাজারে হামলা, সংখ্যালঘু নির্যাতন, সংস্কৃতিচর্চায় বাধা, বাউল গান বন্ধের দাবি, নারীদের খেলাধুলা নিয়ে আপত্তি, আর এসবের পেছনে ছিল জামায়াতের অদৃশ্য হাত। আর সেই হাতকে রাষ্ট্রক্ষমতার মসনদে বসিয়েছিল বিএনপি। ইতিহাস নিজেকে কখনো এত নিখুঁতভাবে পুনরাবৃত্তি করে না, যতটা করছে এখন, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে এসে।

আজকের বাংলাদেশে ‘তৌহিদী জনতা’ নামটা কোনো সংগঠনের নাম নয়, কোনো নিবন্ধিত দলও নয়। এটা আসলে একটা রাজনৈতিক ব্র্যান্ড, যেটা দিয়ে ধর্মকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। আর এই ব্র্যান্ডটা তৈরি হয়েছে সরাসরি জামায়াতে ইসলামীর আদর্শিক কারখানা থেকে।

জামায়াত কখনো নিজেদের ব্যানার সামনে রেখে মব জাস্টিস করতে যায় না, বরং স্থানীয় মাদ্রাসা, মসজিদ কমিটি আর ইসলামি সংগঠনের মাধ্যমে ‘তৌহিদী জনতা’ নামে একটা ছাতা তৈরি করে। এই ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে কেউ মাজারে হামলা করে, কেউ নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি তোলে, কেউ আবার বইমেলায় গিয়ে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর করে। প্রশ্ন হলো, এত বড় একটা সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক কি আসলেই স্বতঃস্ফূর্ত? নাকি এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক মদদ আছে?

উত্তরটা খুব সহজেই মিলে যায় যদি দেখা যায় কারা এসব ঘটনার পর সবচেয়ে বেশি ‘ধন্যবাদ’ পাচ্ছে। প্রতিবারই দেখা যায়, স্থানীয় জামায়াত নেতা বা তাদের ঘনিষ্ঠ কেউ ঘটনাস্থলে ছিলেন, নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, কিংবা পরে সেটাকে ‘ইসলামের বিজয়’ বলে প্রচার করছেন। দিনাজপুরের নারী ফুটবল ম্যাচ বন্ধের ঘটনা হোক, কিংবা রাজবাড়ীতে কবর থেকে মরদেহ তুলে আগুন দেওয়ার ঘটনা, সবখানেই একটা নির্দিষ্ট আদর্শিক ছাপ স্পষ্ট। এই ছাপটা জামায়াতের। আর সেই জামায়াত আজ সংসদে ক্ষমতার অংশীদার হয়ে বসে আছে বিএনপির হাত ধরে।

বিএনপি হয়তো মনে করেছিল, জামায়াতকে ক্ষমতার ভাগ দিলে তারা ‘শান্ত’ থাকবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে জামায়াত এখন আগের চেয়ে বেশি আগ্রাসী। তারা এখন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার নিশ্চয়তা পেয়ে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে নেমেছে। আর সেই এজেন্ডার নামই ‘তৌহিদী জনতা’।

এখন প্রশ্ন হলো, বিএনপি কেন এই পরিস্থিতি থামাচ্ছে না? উত্তরটা খুবই অস্বস্তিকর। কারণ বিএনপির ভেতরে এখনো সেই পুরোনো রোগটা আছে, যেটা ২০০১ সালে ছিল। সেটা হলো ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে হলে জামায়াতের ভোট ব্যাংক লাগবে, ধর্মীয় আবেগ ব্যবহার করতে হবে, আর সেটা করতে গেলে ‘তৌহিদী জনতা’র মতো শক্তিকে মদদ দিতে হবে। কিন্তু এই কৌশলটা যে শেষ পর্যন্ত দেশকে কোথায় নিয়ে যায়, সেটা ২০০৫ সালের সিরিজ বোমা হামলা, বামপন্থী নেতাকর্মী হত্যা, আর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের ইতিহাস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। সেই ইতিহাস এখন আবার ফিরে আসছে, শুধু প্যাকেজিংটা বদলেছে। তখন ছিল ‘জঙ্গি’, এখন ‘তৌহিদী জনতা’। কিন্তু হাতিয়ার একই, আর পেছনের কারিগরও একই।

বাংলাদেশের সংবিধান আর আইন পরিষ্কার করে বলে দেয়, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগলে তার বিচার হবে রাষ্ট্রীয় আইনে। কিন্তু ‘তৌহিদী জনতা’ আইন হাতে তুলে নিচ্ছে। তারা নিজেরাই বিচার করছে, নিজেরাই রায় দিচ্ছে, আর নিজেরাই শাস্তি কার্যকর করছে। এটা সরাসরি রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই চ্যালেঞ্জের মুখেও রাষ্ট্র কার্যত নীরব। এই নীরবতার কারণটাও খুব স্পষ্ট। কারণ যে দলগুলো ক্ষমতায় আছে, তারা এই ‘জনতার’ বিরুদ্ধে কঠোর হতে চায় না। কারণ কঠোর হলে ভোট যাবে, সমর্থন কমবে। আর তাই রাষ্ট্র নিজেই দুর্বল হয়ে পড়ছে, আর সেই সুযোগে জামায়াতপন্থী শক্তি আরও বেপরোয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশের সমাজ সবসময়ই বহুত্ববাদী ছিল। এখানে মাজার ছিল, বাউল গান ছিল, লালন সংস্কৃতি ছিল, আর ছিল সব ধর্মের মানুষের সহাবস্থান। কিন্তু ‘তৌহিদী জনতা’ সেই সহাবস্থানকে ধ্বংস করতে চায়। তারা চায় একমাত্র তাদের সংজ্ঞায়িত ইসলামই টিকে থাকুক, বাকি সব বন্ধ হোক। এটা কোনো ধর্মীয় আন্দোলন নয়, এটা ক্ষমতার লড়াই। আর এই লড়াইয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে সাধারণ মুসলমানের। কারণ তাদের ধর্মের নাম ব্যবহার করে অন্যায় করছে একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী, আর সেই ধর্মের মর্যাদাও নষ্ট হচ্ছে।

‘তৌহিদী জনতা’ আসলে জামায়াতেরই আরেক নাম। আর তাদের সামনে এগিয়ে নিচ্ছে বিএনপির নীরব সমর্থন। ২০০১ সালে যে জোট ক্ষমতায় এসে দেশকে জঙ্গিবাদের আখড়ায় পরিণত করেছিল, ২০২৬ সালে সেই একই জোট আবার দেশকে সেই পথে নিয়ে যাচ্ছে। পার্থক্য শুধু এটুকুই, তখন তারা সরাসরি ক্ষমতায় ছিল, আর এখন তারা সংসদে ক্ষমতার অংশীদার হয়ে সেই একই নীলনকশা বাস্তবায়ন করছে।

যদি এই পরিস্থিতি চলতে থাকে, তাহলে আগামী দিনে আরও মাজার ভাঙবে, আরও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ হবে, আরও সংখ্যালঘু নির্যাতিত হবে, আর আইনের শাসন আরও দুর্বল হবে। আর তখন বলার কেউ থাকবে না যে বাংলাদেশের সংবিধান, গণতন্ত্র, আর সংস্কৃতির মৃত্যু হলো কার হাতে। কারণ সেই দায়টা তখন ইতিহাসই চিহ্নিত করবে, আর সেই ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অভিযুক্ত থাকবে বিএনপি আর জামায়াত।

আরো পড়ুন

সদ্য প্রকাশিত