Share
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিকে শুধু তিন দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি যৌথ নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার একটি কাঠামো। ফলে কোনো একটি সদস্য রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংকট অন্য সদস্যদের জন্যও রাজনৈতিক ও কৌশলগত বাস্তবতায় পরিণত হতে পারে।
এই জায়গাতেই বাংলাদেশের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক কৌশল ছিল ভারসাম্য বজায় রাখা। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান, সৌদি আরব, তুরস্কসহ বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা ধরে রাখা। সেই বাংলাদেশ যদি একটি নির্দিষ্ট সামরিক কাঠামোর অংশ হয়ে যায়, তাহলে তার পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য কতটা অক্ষুণ্ণ থাকবে—সেটিই এখন ভাবার বিষয়।
সরকারের অবস্থান কেন প্রশ্নের মুখে?
সরকারের পক্ষ থেকে মক্কা চুক্তিকে ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে। এমনকি এতে যোগদানের ক্ষেত্রে বড় কোনো ঝুঁকি নেই—এমন বক্তব্যও এসেছে। আমন্ত্রণ এলে বাংলাদেশ বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে বলেও জানানো হয়েছে। কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে ‘ঝুঁকি নেই’ বলা কোনো উত্তর নয়। বরং প্রশ্ন হলো, ঝুঁকি নেই—এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ভিত্তি কী?
সরকার কি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় নিরাপত্তা মূল্যায়ন করেছে?
ভারতের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে, পাকিস্তানের সঙ্গে একই প্রতিরক্ষা কাঠামোয় থাকার কৌশলগত মূল্য কত, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে বাংলাদেশের কী ধরনের দায় তৈরি হতে পারে—এসব কি বিশ্লেষণ করা হয়েছে?
আর যদি করা হয়ে থাকে, তাহলে সেই মূল্যায়ন জনগণের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে না কেন? অন্যের সংঘাত কি একদিন বাংলাদেশের সংঘাত হবে? মক্কা চুক্তি নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখানেই। আজ সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বের বিষয়টি সামনে আছে। কিন্তু আগামীকাল এই দেশগুলোর কোনো একটি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে?
বাংলাদেশ কি তখন সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিরপেক্ষ থাকতে পারবে?
নাকি জোটের রাজনৈতিক বাস্তবতা বাংলাদেশকে কোনো না কোনো অবস্থান নিতে বাধ্য করবে? একটি সামরিক জোটে প্রবেশের আগে এই প্রশ্নের উত্তর জানা অত্যন্ত জরুরি। কারণ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর চুক্তির ব্যাখ্যা করার সময় পাওয়া যায় না; সিদ্ধান্ত নিতে হয় তখনই।
ভারত-পাকিস্তান সমীকরণে বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়াবে?
এই প্রশ্নটি আরও স্পর্শকাতর। পাকিস্তান এই প্রতিরক্ষা কাঠামোর অন্যতম প্রধান অংশীদার। বাংলাদেশ যদি একই সামরিক কাঠামোয় যুক্ত হয়, তাহলে ভারতের কাছে এটি নিছক সৌদি আরব বা তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয় হিসেবে বিবেচিত নাও হতে পারে।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের পরিধি অনেক বিস্তৃত। সীমান্ত, নদীর পানি, বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ, নিরাপত্তা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি স্বার্থ জড়িত।
সেখানে পাকিস্তানের সঙ্গে একই প্রতিরক্ষা কাঠামোয় প্রবেশ করলে ভারতের নিরাপত্তা হিসাব বদলে যেতে পারে। বাংলাদেশের জন্য তাই প্রশ্নটা শুধু ‘চুক্তিতে কী পাওয়া যাবে’ নয়। প্রশ্ন হলো, এর বিনিময়ে বাংলাদেশের কোন কোন কৌশলগত সম্পর্ক ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ভারত-পাকিস্তান সংঘাত হলে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত কী হবে? ধরা যাক, ভবিষ্যতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আবার বড় ধরনের সামরিক সংঘাত শুরু হলো। বাংলাদেশ তখন কী করবে? পাকিস্তানের সঙ্গে একই প্রতিরক্ষা কাঠামোর কারণে কি কোনো অবস্থান নিতে হবে? নাকি ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বাস্তবতা বিবেচনা করে নিরপেক্ষ থাকবে?
যদি নিরপেক্ষ থাকে, তাহলে জোটের অন্য সদস্যদের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর তার কী প্রভাব পড়বে? আর যদি পাকিস্তানের প্রতি কোনো ধরনের কৌশলগত সমর্থন দিতে হয়, তাহলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের নিরাপত্তা সম্পর্ক কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? এই প্রশ্নগুলো কাল্পনিক বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নীতি তৈরি হয় সম্ভাব্য সংকটের কথা মাথায় রেখেই।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের দায়ও কি বাংলাদেশ নেবে?
বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা চায়। কারণ লাখ লাখ বাংলাদেশি সেখানে কাজ করেন, বিপুল প্রবাসী আয় আসে এবং জ্বালানি ও অর্থনীতির সঙ্গে অঞ্চলটির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি ভূরাজনৈতিক সংঘাত বাংলাদেশের যুদ্ধ নয়।
সৌদি আরব, ইরান, তুরস্ক এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তাদের নিজস্ব কৌশলগত বাস্তবতা। বাংলাদেশকে সেই সংঘাতের অংশ বানানোর কোনো কারণ নেই। কিন্তু একটি প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হলে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে।
তখন প্রশ্ন উঠবে—কোনো সদস্য রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংকটে বাংলাদেশের দায় কতটা? রাজনৈতিক সমর্থন দিতে হবে কি না? সামরিক সহযোগিতার প্রয়োজন হবে কি না? গোয়েন্দা বা লজিস্টিক সহায়তার কোনো প্রত্যাশা তৈরি হবে কি না?
এসব বিষয় পরিষ্কার না করে চুক্তিতে যাওয়ার অর্থ হতে পারে ভবিষ্যতের ঝুঁকিকে আজই আমন্ত্রণ জানানো। বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি কি চাপে পড়বে? বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সম্পদগুলোর একটি হলো ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হবে। চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ বাংলাদেশের বাণিজ্য ও রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আবার সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে শ্রমবাজার ও প্রবাসী আয়ের সম্পর্ক রয়েছে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের কোনো একটি নির্দিষ্ট সামরিক বলয়ে ঢুকে পড়া অত্যন্ত সতর্কতার বিষয়। কারণ সামরিক জোট শুধু প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ায় না; এটি রাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থানকেও একটি নির্দিষ্ট দিকে নিয়ে যায়।
চীন-যুক্তরাষ্ট্র-ভারত-পাকিস্তানের জটিল ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশ যদি নিজেই একটি নির্দিষ্ট সামরিক বলয়ের অংশ হয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
বন্ধুত্ব আর সামরিক জোট এক বিষয় নয়: সৌদি আরবের সঙ্গে বন্ধুত্ব বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোও ইতিবাচক হতে পারে। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখারও প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু কোনো দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বের অর্থ এই নয় যে তার নিরাপত্তা কাঠামোর অংশও হতে হবে।
বাংলাদেশের প্রয়োজন সবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখা, কিন্তু কারও সংঘাতের দায় নিজের কাঁধে না নেওয়া। একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বন্ধুত্ব দিয়ে পরিচালিত হতে পারে, কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তার সিদ্ধান্ত নিতে হয় স্বার্থের হিসাব দিয়ে।
সরকারের ‘ঝুঁকি নেই’ বক্তব্যের ব্যাখ্যা কোথায়?
সরকার যদি মনে করে মক্কা চুক্তিতে যোগদানে বাংলাদেশের কোনো বড় ঝুঁকি নেই, তাহলে সেই মূল্যায়নের ভিত্তি জনগণের সামনে স্পষ্ট করা উচিত। কোন ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা হয়েছে? ভারতের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া কী? পাকিস্তানের সঙ্গে একই প্রতিরক্ষা কাঠামোয় থাকার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী?
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সম্ভাব্য দায় কতটা? কোন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সামরিক সহযোগিতা দিতে বাধ্য হবে? কোন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সেই সহযোগিতা প্রত্যাখ্যান করতে পারবে? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার পরও বাংলাদেশের নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা থাকবে কি না?
এই প্রশ্নগুলোর সুস্পষ্ট উত্তর ছাড়া শুধু ‘সুযোগ তৈরি হবে’ কিংবা ‘ঝুঁকি নেই’ বলা যথেষ্ট নয়।
জাতীয় নিরাপত্তা কোনো পরীক্ষার বিষয় নয়: একটি আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করা হয়তো একদিনের সিদ্ধান্ত। কিন্তু তার রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব বহু বছর ধরে থাকতে পারে। আজকের সিদ্ধান্ত আগামী দিনের সরকারকেও বহন করতে হয়। আজ যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হবে, ভবিষ্যতের কোনো সংকটে সেটিই বাংলাদেশের সামনে বাধ্যবাধকতা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তাই মক্কা চুক্তির প্রশ্নে আবেগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা মূল্যায়ন, কূটনৈতিক হিসাব, সামরিক বাধ্যবাধকতার স্পষ্ট ব্যাখ্যা এবং বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন।
শেষ প্রশ্নটা বাংলাদেশের: বাংলাদেশ কি নিজের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্ত নিজের হাতে রাখবে? নাকি এমন একটি সামরিক কাঠামোর অংশ হবে, যেখানে আগামী দিনের কোনো সংঘাতের রাজনৈতিক ও কৌশলগত দায়ও বাংলাদেশের সামনে এসে দাঁড়াতে পারে? বন্ধুত্ব চাই। সহযোগিতা চাই। সবার সঙ্গে সুসম্পর্কও চাই।
কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের বিনিময়ে কোনো সামরিক দায় নয়। মক্কা চুক্তিতে যাওয়ার আগে তাই সরকারের কাছে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন একটাই—বাংলাদেশ এতে কী পাবে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, বাংলাদেশ কী হারানোর ঝুঁকি নিচ্ছে? কারণ ভুল কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষতি শুধু একটি সরকারকে নয়, অনেক সময় পুরো রাষ্ট্রকে বহন করতে হয়।
আরো পড়ুন

