Share
মার্চ ২০২৬। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে মাস দেড়েক হলো। এই সময়ের মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় একটা ঘোষণা দিয়েছে যেটা দেখতে উদার, শুনতে ন্যায়সংগত, কিন্তু একটু গভীরে গেলেই এদের আসল বাটপারিটা বোঝা যায়।
দেশের সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা ভাতা পাবেন। মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত, বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ, চার্চের যাজক, সবার জন্য সরকারি ভাতা। কাগজে দেখলে মনে হয় বেশ সুন্দর উদ্যোগ। কিন্তু একটু হিসাব করলেই বোঝা যায়, এটা আসলে সাম্যের নামে বৈষম্যকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া।
মসজিদ পাবে মাসে দশ হাজার টাকা। মন্দির, বৌদ্ধ বিহার, চার্চ পাবে আট হাজার। সরকার বলছে, মসজিদে তিনজন কর্মী বলে বেশি। যুক্তিটা শুনে মাথা ঘুরে। কারণ মাথাপিছু হিসাব একদম এক। ইমাম পাচ্ছেন পাঁচ হাজার, পুরোহিতও পাচ্ছেন পাঁচ হাজার। মুয়াজ্জিন পাচ্ছেন তিন হাজার, সেবায়েতও পাচ্ছেন তিন হাজার। তাহলে পার্থক্য কোথায়? পার্থক্য হলো মসজিদে একজন বেশি আছেন, খাদেম, তার জন্য দুই হাজার বেশি।
এখানে প্রশ্ন উঠছে না কেন মসজিদে খাদেম রাখা হলো। প্রশ্ন উঠছে এই কারণে যে মন্দিরে, বিহারে, চার্চেও তো সহকারী কর্মী থাকেন। সেই হিসাব কি নেওয়া হয়েছে? নাকি ধরেই নেওয়া হয়েছে যে ওই ধর্মগুলোর প্রতিষ্ঠানে দুইজনের বেশি দরকার নেই? রাষ্ট্র যখন নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নেয় যে কোন ধর্মের উপাসনালয়ে কতজন প্রয়োজন, তখন সেটা আর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত থাকে না, সেটা হয় একটা মতামত। আর সেই মতামতটা হলো, ইসলামি প্রতিষ্ঠান একটু বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২ক ধারায় লেখা আছে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এটাও লেখা আছে যে অন্য ধর্মের মানুষেরা সমান অধিকার ও মর্যাদা পাবেন। এই দুটো কথা একসাথে লেখা হয়েছে কারণ রাষ্ট্র চেয়েছিল বলতে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই কাউকে কম দেখা যাবে না। কিন্তু বিএনপি সরকারের এই ঘোষণা সেই চেতনাকে সরাসরি লাথি মারছে। সংবিধান বলছে সমান মর্যাদা, আর সরকার বলছে দুই হাজার কম। দুটো কথা একসাথে সত্যি হওয়ার সুযোগ নেই।
বিএনপির ইতিহাস জানা মানুষদের কাছে অবশ্য এটা অবাক করার মতো না। ২০০১ সালের অক্টোবরে নির্বাচনের পরপরই এই দলের ছত্রচ্ছায়ায় সংখ্যালঘুদের উপর যা হয়েছিল, সেটার দলিল আছে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর রিপোর্টে, সংসদের বিবৃতিতে, পত্রিকার পাতায়। বরিশাল, মুন্সিগঞ্জ, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, ঘরবাড়ি জ্বালানো হয়েছে, মন্দির ভাঙা হয়েছে, মানুষকে ভিটেমাটি ছাড়া করা হয়েছে। সেই পাঁচ বছরে বাংলাদেশ থেকে হিন্দু, খ্রীষ্টান, বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর একটা উল্লেখযোগ্য অংশ দেশ ছেড়েছে শুধু বেঁচে থাকার জন্য। সেই দলটাই এখন বলছে, তারা সব ধর্মের মানুষের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করছে। করছে, কিন্তু দুই হাজার কম।
এই দুই হাজার টাকাটা সরকারের বাজেটের কাছে কিছুই না। কিন্তু এই দুই হাজার টাকার মধ্যে দিয়ে রাষ্ট্র একটা বার্তা পাঠাচ্ছে। সেই বার্তাটা হলো, তুমি আছ, কিন্তু কেবলই খাতা-কলমে। আর এই “কেবলই খাতা-কলমে” বার্তাটা যে সম্প্রদায়গুলো দশকের পর দশক ধরে পাচ্ছে, তাদের জন্য এটা নতুন কোনো ঘা না, এটা পুরোনো ক্ষতে আবার লবণের ছিটে।
আরো পড়ুন

