Share
জলাতঙ্ক মানে জলের আতঙ্ক। বাংলা শব্দটার মধ্যেই রোগের পুরো ক্লিনিকাল ছবি এঁকে দেওয়া আছে। একজন মানুষ যদি শুধু শব্দটার অর্থ জানেন, তাহলেও বুঝবেন যে র্যাবিসে আক্রান্ত কোনো প্রাণী পানিতে গিয়ে বসে থাকতে পারে না। পারার কথাই না। কিন্তু বাগেরহাটের খানজাহান আলীর মাজারের দিঘিতে কুমির কর্তৃক কুকুর টেনে নেওয়ার ঘটনায় যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল, তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সাথে মিলে তদন্ত শেষ করে এসে সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন কুকুরটি জলাতঙ্কে আক্রান্ত ছিল।
র্যাবিস একটি নিউরোট্রপিক ভাইরাস। কামড়ের স্থান থেকে পেরিফেরাল নার্ভ বেয়ে স্পাইনাল কর্ড হয়ে এটা ব্রেইনে পৌঁছায়, এবং ব্রেইনস্টেমের মেডুলা অবলংগাটায় গিয়ে গ্লোসোফ্যারিঞ্জিয়াল আর ভেগাস নার্ভের কন্ট্রোল সেন্টারকে হাইপার সেন্সিটিভ করে তোলে। ফলে তরল পদার্থ গলার কাছে আসলেই ব্রেইন গলার পেশিগুলোকে এমন তীব্রভাবে সংকুচিত করার নির্দেশ দেয় যে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। এই যন্ত্রণা এতটাই তীব্র যে মস্তিষ্কের লিম্বিক সিস্টেম পানিকে সরাসরি বিপদ হিসেবে চিহ্নিত করে ফেলে। মানে পানি দেখলেই, পানির শব্দ শুনলেই আক্রান্ত প্রাণী আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। পানির কাছে যাওয়া তো দূরের কথা।
এই মৌলিক বিষয়টা না জেনে, বা জেনেও পরোয়া না করে, একটা সরকারি তদন্ত কমিটি এই তথ্য দাঁড় করালো। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরও সাথে ছিল। মানে পশু চিকিৎসার সাথে সম্পর্কিত বিভাগ এই ফাইন্ডিংয়ে আপত্তি করেনি।
এবার আসি এই প্রশাসনের গোড়ার দিকে। ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখে যে ভোট হয়েছে এই দেশে, সেটাকে নির্বাচন বলার মতো সাহস সম্ভবত আয়োজকদেরও নাই। দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো বাইরে, জনগণ ভোটকেন্দ্রে যায়নি, প্রতিযোগিতা ছিল না কোনো অর্থেই। জিয়াউর রহমান সেনানিবাসে বসে যে দল তৈরি করেছিলেন, সেই বিএনপি এই পরিস্থিতিতে ক্ষমতায় বসে আছে। তাদের মন্ত্রিপরিষদ আছে, মন্ত্রী আছে, দপ্তর আছে, গাড়ি আছে, প্রটোকল আছে। শুধু জবাবদিহিতা নাই, কারণ যাদের কাছে জবাব দিতে হবে সেই জনগণ এই সরকার বাছাই করেনি।
এই সরকারের অধীনে থাকা প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতর থেকেই এই তদন্ত কমিটি বের হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিসিএস ক্যাডার। রাষ্ট্রের টাকায় পড়াশোনা, রাষ্ট্রের বেতনে চাকরি, রাষ্ট্রের ক্ষমতায় চলাফেরা। আর এই মানুষটি র্যাবিস আক্রান্ত কুকুর পানিতে বসে থাকার গল্প বিশ্বাস করে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। আর্টস না কমার্স না সায়েন্স, সেই বিতর্ক আপাতত থাক। কিন্তু জলাতঙ্ক শব্দটার বাংলা অর্থ বোঝার জন্য কোনো বিভাগের সার্টিফিকেটও লাগার কথা না।
সমস্যাটা শুধু এই একটা ঘটনায় না। সমস্যা হলো এই প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে যেখানে দায়িত্বজ্ঞান আর মেধার চেয়ে আনুগত্য আর পরিচিতি বড় হয়ে যায়। যে সরকার গণরায় ছাড়া ক্ষমতায় এসেছে, সে সরকার প্রশাসনে কাকে বসাবে, কার মতামতকে গুরুত্ব দেবে, কীভাবে তদন্ত পরিচালনা করবে, তার একটা ধরন থাকে। সেই ধরনেরই ফসল হলো এই প্রতিবেদন।
খানজাহান আলীর দিঘির কুমির একটা কুকুর খেয়েছে। এটা হয়তো ব্যাখ্যার দাবি রাখে। কিন্তু সেই ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে র্যাবিসের বেসিক প্যাথোফিজিওলজি না জানা লোকজন দিয়ে কমিটি বানানো হয়েছে, আর সেই কমিটি এমন তথ্য দিয়েছে যেটা মেডিকেল সায়েন্সের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এটা শুধু অজ্ঞতা না। এটা হলো জনগণের কাছে মিথ্যা বলার অভ্যাস, যেই অভ্যাস বছরের পর বছর ধরে এই প্রশাসনিক কাঠামো আর এই রাজনৈতিক বলয়ের ভেতরে লালিত হয়েছে।
আরো পড়ুন

