একাত্তরের হিসাব চুকানো যাবে না “আল্লাহ ভালো জানেন” বলে

Share

সংসদের প্রথম দিনেই যুদ্ধাপরাধে ফাঁসি হওয়া জামায়াত নেতাদের জন্য শোকপ্রস্তাব উঠল। চিফ হুইপ নিজে প্রস্তাব আনলেন, স্পিকার পাস করলেন। দেশে তখন জ্বালানির দাম আকাশছোঁয়া, বাজারে আগুন, হামের প্রকোপে শিশু মরছে। কিন্তু সদ্য গঠিত সংসদের প্রথম কাজ হলো এমন মানুষদের জন্য শোক জানানো, যাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গণহত্যায় সহযোগিতার দায়ে দণ্ড দিয়েছে। এটা কোনো ভুল না, কোনো রাজনৈতিক অসতর্কতা না। এটা একটা ঘোষণা।

বিরোধীদলীয় নেতা সংসদে দাঁড়িয়ে বললেন, ১৯৭১ সালে কোন দল কী করেছে তা একমাত্র আল্লাহ ভালো জানেন। এই একটা বাক্যে তিনি পঞ্চাশ বছরের ইতিহাস, লাখো শহীদের রক্ত আর আন্তর্জাতিক আদালতের রায়কে একসাথে ধোঁয়াশায় ঢেকে দিলেন। আল্লাহ ভালো জানেন, এটা ধর্মীয় সত্য। কিন্তু ইতিহাস শুধু আল্লাহর জ্ঞানের উপর ছেড়ে দেওয়ার বিষয় না। রাজাকারের তালিকা আছে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নিজস্ব দলিল আছে, হামিদুর রহমান কমিশনের রিপোর্ট আছে, গণহত্যার সাক্ষী লাখো মানুষ এখনো বেঁচে আছেন। এগুলো কি আল্লাহর ইলমের আওতায় পড়ে, নাকি ইতিহাসের?

জামায়াতের আমির নির্বাচনের আগে ক্ষমা চেয়েছেন। বলেছেন, ১৯৪৭ থেকে এ পর্যন্ত তাদের আচরণে যদি কেউ কষ্ট পেয়ে থাকেন, তাহলে তারা ক্ষমাপ্রার্থী। “যদি কষ্ট পেয়ে থাকেন” এই শব্দগুলো খেয়াল করুন। তিনি বলছেন না যে কষ্ট দেওয়া হয়েছে, বলছেন যদি কেউ কষ্ট পেয়ে থাকেন। অর্থাৎ না-ও পেতে পারেন। ১৯৭১ সালে যে মায়ের সন্তান আলবদরের হাতে খুন হয়েছে, যে মেয়েটা পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্পে আটকে ছিল, যে কৃষক ভিটেমাটি পুড়িয়ে ভারতে পালিয়ে গিয়ে শরণার্থী শিবিরে মারা গেছে, তার কষ্ট পাওয়াটা জামায়াতের আমিরের কাছে একটা “যদি” মাত্র। এই হলো ক্ষমার ভাষা।

বিএনপি নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল বলে দাবি করে। জিয়াউর রহমান বীর উত্তম ছিলেন, মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, এটা সত্য। কিন্তু সেই জিয়াই ক্ষমতায় বসে গোলাম আযমকে দেশে ফিরিয়ে আনলেন, রাজাকারদের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করলেন। আর সেই দলই এখন সংসদে দাঁড়িয়ে ফাঁসি হওয়া যুদ্ধাপরাধীদের জন্য শোক জানাচ্ছে। বীর উত্তমের নাম ভাঙিয়ে যে দল চলে, সেই দলের চিফ হুইপ যুদ্ধাপরাধীর শোকপ্রস্তাব আনছেন, এই দ্বিচারিতার কোনো ব্যাখ্যা বিএনপির কাছে নেই।

২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ভাঙা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে ফ্যাসিবাদের জনক বলা হয়েছে। যে মানুষটা সারা জীবন কারাগারে কাটিয়েছেন, ফাঁসির মঞ্চ থেকে ফিরে এসেছেন, একটা জাতিকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছেন, তাকে ফ্যাসিস্ট বলার মানে হলো পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে দাঁড়ানো। সরাসরি না বললেও কাজে এটাই হচ্ছে। আর ওই একই সময়ে যারা ভাস্কর্য ভাঙছিল, তারা রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছিল, কোনো বাধা পাচ্ছিল না, কোনো মামলা হচ্ছিল না।

ইতিহাস বিকৃতির এই প্রকল্পটা নতুন না। কিন্তু এবার এটা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হচ্ছে। সংসদে যখন যুদ্ধাপরাধীর জন্য শোকপ্রস্তাব ওঠে এবং কেউ থামায় না, তখন বুঝতে হবে এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা না। একাত্তরে যারা হেরেছিল, তারা পঞ্চাশ বছর পর হিসাব বরাবর করতে চাইছে। পতাকা বদলাতে চায়, জাতীয় সংগীত বদলাতে চায়, মুক্তিযুদ্ধকে একটা দলীয় গল্পে পরিণত করতে চায় যাতে সেটাকে অস্বীকার করা যায়। এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো সত্যটা বারবার সামনে আনা। কারণ মিথ্যার পায়ের তলায় মাটি থাকে না যদি সত্যটা বেঁচে থাকে।

আরো পড়ুন

সদ্য প্রকাশিত