Share
জীবিত বাবাকে শহীদ দাবি করা থেকে শুরু করে সাড়ে নয় লাখ কোটি টাকার বাজেটকে ৬০০ কোটিতে নামিয়ে আনা, নিজের বক্তৃতাকে কোরবানির সঙ্গে তুলনা করা থেকে এমপি হোস্টেলে মাইক্রোওয়েভ ওভেন চেয়ে সংসদে আর্তনাদ করা। এটা কোনো স্ট্যান্ডআপ কমেডির স্ক্রিপ্ট নয়, এটা জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যদের গত কয়েক মাসের কার্যক্রমের সরল বিবরণ। রাজনীতিতে ভুল হতেই পারে, কিন্তু জামায়াতের এই ভুলগুলো এতটাই নিয়মতান্ত্রিক, এতটাই পুনরাবৃত্তিক যে সেটা আর ভুল থাকে না, হয়ে দাঁড়ায় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।
নীলফামারী-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম চৌধুরী গত ১৪ জুন সংসদে দাঁড়িয়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে তাঁর বাবা ও দাদা যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। সঙ্গে আরও যোগ করেন, তাঁর বাবার সাত ভাইয়ের চারজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, ১১ জন দাদা বীর মুক্তিযোদ্ধা, আর পুরো পরিবারে বীর মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ৪৭ জন। এখানে অসঙ্গতিটা পরিষ্কার, ১৯৮১ সালে জন্ম নেওয়া একজন মানুষ কীভাবে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বাবার সন্তান হতে পারেন? কারণ তাঁর বাবা এখনো বেঁচে আছেন, সুস্থ আছেন। সংসদে দাঁড়িয়ে নিজের জীবিত বাবাকে মৃত দাবি করাটা যে শুধু মিথ্যাচার নয়, সেটা এক ধরনের মানসিক দেউলিয়াত্বের প্রকাশ।
তিন দিন পর যখন সমালোচনার ঝড় ওঠে, তখন মুনতাকিম অতি চতুরতার সঙ্গে বলেন, এটা নাকি “মুখের ভুল” ছিল। তিনি আসলে “বাবার চাচা” বলতে চেয়েছিলেন। প্রশ্ন হচ্ছে, লিখিত বক্তব্যেও কি মুখের ভুল হয়? বক্তৃতার স্ক্রিপ্টেও কি জিভ ফসকায়? আর যদি ভুল হয়েই থাকে, তাহলে সংশোধন করতে তিন দিন কেন লাগল? মুনতাকিমের জবাব, “সংশোধনের একটা প্রক্রিয়া আছে।” অর্থাৎ ভুল স্বীকারে বাধ্য হয়েছেন সমালোচনার চাপে, নতুবা এই প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘায়িত হতো। এই একই ব্যক্তি আবার বলেছেন, “দোয়া করবেন যেন কোনো ভুল না হয়।” রাজনীতিবিদের কাজ প্রমাণভিত্তিক বক্তব্য রাখা, দোয়ার দোকান খোলা নয়।
একই ধারায় কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. আমির হামজা। ৪ জুন সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি প্রস্তাব করেন যে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট কমিয়ে “অন্তত ২০০ বা ৬০০ কোটি টাকা” করা হোক। অর্থনীতি নিয়ে যাদের প্রাথমিক জ্ঞান আছে, তারা জানেন পুরো দেশের বাজেট ৬০০ কোটিতে নামিয়ে আনলে রাষ্ট্রীয় কাঠামো টিকে থাকে না। এটা কোনো বক্তব্য নয়, এটা বিদ্রুপ। অথচ হামজা এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে সতর্কবার্তা পর্যন্ত দিয়ে রাখেন, “নয় হাজার কোটি টাকাই অনেক বেশি।”
পরে যখন গণমাধ্যম এটা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, হামজা প্রথম চেষ্টা করেন গণমাধ্যমের ওপর দোষ চাপাতে। বলেন তিনি নাকি ছয় লাখ কোটি বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভিডিও ফুটেজ স্পষ্ট, কাটছাঁট ছাড়াই তিনি বলেছেন “ছয় শ’ কোটি”। তখন আর পালানোর পথ থাকে না, ফিরে আসেন সেই চেনা অজুহাতে, “মুখের ভুল”। একই ব্যক্তি পরে আবার বলেন, “মানুষের কোনো কাজ নেই” যে এসব নিয়ে কথা বলে। অথচ এই হামজাই আগে মিথ্যা দাবি করেছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন, পরে প্রমাণিত হয় সেটাও মিথ্যা। বলেছিলেন হাজী মুহাম্মদ মুহসিন হলে ১৭ বছর আজান নিষিদ্ধ ছিল, সেটাও সর্বৈব মিথ্যা। ভারতীয় অভিনেত্রী রাশমিকা মান্দানার শারীরিক গঠন নিয়ে করেছিলেন কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য। প্রতিবারই ক্ষমা চান, আবার করেন। এটা অভ্যাস, ভুল নয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান সংসদে দাঁড়িয়ে যে বক্তৃতা দিয়েছেন, সেটা পড়লে যে কেউ হতবাক হবেন। তিনি এমপি হোস্টেলের ফ্ল্যাটে পর্দা লাগেনি, মাইক্রোওয়েভ ওভেন পাননি, ওয়াশিং মেশিন দেওয়া হয়নি, এসবের জন্য সংসদে জোরালো দাবি জানান। একটি জাতীয় সংসদের সদস্যের কাজ আইন প্রণয়ন, নীতি নির্ধারণ, জনগণের প্রতিনিধিত্ব করা। রান্নাঘরের ইলেকট্রনিক্স সরঞ্জাম চেয়ে সংসদ অধিবেশন ব্যয় করা দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ছাড়া আর কিছু নয়। বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ ব্যক্তিগতভাবে ওভেন কিনে দেওয়ার প্রস্তাব দিলে পরদিন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান সেটা তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু প্রশ্নটা এখানে যে, এই সংসদ সদস্য কেন জাতীয় সংসদকে নিজের বাসাবাড়ির অভাব-অভিযোগের মঞ্চ বানিয়েছেন? তিনি পরে যুক্তি দেন, “আমি চাইনি, দেওয়ার কথা ছিল কিন্তু দেওয়া হয়নি।” আরও বলেন, দল শুধু প্লট আর গাড়ি না নেওয়ার কথা বলেছিল, ফ্ল্যাট আর ফ্ল্যাটের জিনিসপত্র না নেওয়ার কথা বলেনি। এই যে প্রতিটি শব্দকে কুচকে কাটার চেষ্টা, নিজের ভোগবাদী দাবিকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য দলের ঘোষণার ফাঁকফোকর খোঁজা, এটাই জামায়াতের আসল চরিত্রকে ফাঁস করে দেয়।
নীলফামারী-১ আসনের মোহাম্মদ আবদুস সাত্তার যা করেছেন, সেটা আরও গুরুতর। তিনি সরকারের সমালোচনা করতে গিয়ে “চালুন” আর “সূঁচ” নিয়ে যে উপমা ব্যবহার করেন, সেটি এতটাই অশ্লীল যে স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমেদকে হস্তক্ষেপ করে সেটি কার্যবিবরণী থেকে বাদ দিতে হয়। স্পিকারকে বলতে হয়, “সংসদে কথা বলার সময় সতর্ক থাকুন। আমরা কোনো অপ্রীতিকর বা অশ্লীল শব্দ শুনতে চাই না।” একজন সংসদ সদস্যকে জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছ থেকে প্রকাশ্যে এমন সতর্কবার্তা শুনতে হয়, এটা শুধু ওই ব্যক্তির নয়, পুরো দলের জন্য লজ্জার। অথচ এই সাত্তার সাহেব গণমাধ্যমের মুখোমুখি পর্যন্ত হননি, পালিয়ে বেড়িয়েছেন।
সংসদের বাইরে জামায়াতের এই বাচনিক গোলযোগ আরও প্রকট। রংপুর-৪ আসনের এটিএম আজম খান যখন দলের সিদ্ধান্তে তাঁর মনোনয়ন অন্য কাউকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হন, তখন এই রাজনৈতিক আত্মত্যাগকে তিনি সরাসরি তুলনা করেন হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর কোরবানি ও পরীক্ষার সঙ্গে। নিজেকে কোনো নবীর স্থানে দাঁড় করানোর এই অহংকার যখন সমালোচিত হয়, তখন ফেসবুক পোস্ট দিয়ে বলেন, এটাও নাকি “মুখের ভুল” ছিল। প্রশ্নটা ধর্মতাত্ত্বিক, একজন সাধারণ মানুষ কীভাবে মুখ ফসকে নিজেকে নবীর কোরবানির সঙ্গে তুলনা করতে পারেন? নাকি এটাই তাঁর মনের আসল অবস্থান, কিন্তু ধরা পড়ার পর “মুখের ভুল” বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা?
বরগুনার জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি শামীম আহসানের কীর্তিটাও মনে রাখার মতো। তিনি দাবি করেছিলেন, জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির নির্বাচনে জেতার আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসু নাকি ছিল “মাদকের আখড়া” ও “বেশ্যালয়”। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, ডাকসুর ইতিহাস, যারা ডাকসুর নেতৃত্বে ছিলেন তাদের সম্পর্কে এমন জঘন্য মন্তব্য করাটা রাজনৈতিক হীনতা তো বটেই, এটা পুরো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কলঙ্কিত করার শামিল। ক্ষোভ যখন তীব্র হলো, তখন তিনি ভিডিও বার্তায় ক্ষমা চাইলেন। ক্ষমা চাওয়াটা ইদানীং জামায়াতের নেতাদের কাছে এমনিতেই দস্তুরে পরিণত হয়েছে।
যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে নকিবুর রহমান টেলিভিশনের টকশোতে বিএনপির আইটি সম্পাদককে “সাইবার সন্ত্রাসী” আখ্যা দিয়েছিলেন। যখন পাল্টা প্রশ্ন আসে প্রমাণ কোথায়, তখন আর কিছুই করার ছিল না, চুপসে গিয়ে শুধু বলতে পারেন “ভাষা অনুপযুক্ত ছিল” এবং নিঃশর্ত ক্ষমা চান। যুক্তি-প্রমাণ ছাড়া কাউকে সন্ত্রাসী বলার রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেখে বোঝা যায়, এরা কতটা দায়িত্বজ্ঞানহীন।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আহসানুল মাহবুব জুবায়ের যখন এসবের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন “মানুষ মাত্রই ভুল হয়”, তখন বিষয়টা আরও পরিষ্কার হয়। ভুল একবার হয়, দুইবার হয়, কিন্তু যখন সেটা হয়ে দাঁড়ায় নিয়মিত ঘটনা, প্রতিটি অধিবেশনের চিত্রনাট্য, তখন সেটাকে ভুল না বলে প্রবণতা বলাই শ্রেয়। তিনি আরও জানান, দল নেতাদের নিয়ে ভাবছে এবং “তাদের দক্ষ করে তোলার জন্য প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে”। অর্থাৎ স্বীকারোক্তি এসে গেছে। জামায়াত নিজেই জানে তাদের সংসদ সদস্যরা সংসদ চালানোর মতো যোগ্য নন, তাদের কথা বলার প্রশিক্ষণ পর্যন্ত দরকার।
কিন্তু এখানেই আসল প্রশ্ন। যেসব মানুষ বাস্ততা যাচাই না করেই বক্তৃতায় শহীদ বানিয়ে দেন জীবিত বাবাকে, যেসব মানুষ দেশের বাজেট আর হোটেলের খাবারের দামে পার্থক্য করতে পারেন না, যেসব মানুষ সংসদের মর্যাদা বুঝতে পারেন না, পর্দা-ওয়াশিং মেশিন চেয়ে সংসদে বক্তৃতা দেন, যারা নিজেদের নবী-রাসুলের কোরবানির সঙ্গে তুলনা করে বসেন, তারা আদৌ কোনো প্রশিক্ষণে শুধরাবেন? এটা প্রশিক্ষণের অভাব নয়, এটা মৌলিক সততার অভাব। এটা বাস্তবতাবোধের চরম ঘাটতি। এটা রাজনৈতিক সংস্কৃতির দারিদ্র্য।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ আইন প্রণয়নের পবিত্র স্থান। সেই জায়গায় এমন সব বক্তৃতা, এমন সব আচরণ গোটা জাতিকে হাসির পাত্র করে তুলছে। আর তার দায় এড়াতে “মুখের ভুল”, “স্লিপ অব টাং”, “সংশোধনের প্রক্রিয়া” নামে যে তামাশা চলছে, তা বন্ধ হওয়া জরুরি। জামায়াতের নেতৃত্ব প্রশিক্ষণের কথা বলতে পারেন, কিন্তু সততা আর বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্ক রাখার কোনো প্রশিক্ষণ হয় না। সেটা চারিত্রিক গুণ, যা এই দলের সংসদ সদস্যদের মধ্যে প্রকটভাবেই অনুপস্থিত।
আরো পড়ুন

