Share
টঙ্গীর ঘটনার পর জুবায়ের আহমেদ তাসরিফ নামের এক মোল্লার বক্তব্যগুলো একসঙ্গে দেখলে একটা জিনিস পরিষ্কার হয়ে যায়। তিনি ছয় বছরের একটা শিশুর পাশে দাঁড়াননি। দাঁড়িয়েছেন দায়ী মোল্লার পাশে, আর সেই দাঁড়ানোর ভাষা এমন যে শুনে নিজের কানকে বিশ্বাস করা কঠিন যে কোনো মানুষ আদৌ এমন ধারণা পোষণ করতে পারে!
শুরুটা ধরা যাক “হুজুর একটা চুম্মা দিয়াই দিলো, তো কি হইসে? এজন্য এমনে পিটাবি?” বাক্যটা থেকে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ছয় বছরের শিশুকে চুমু খেয়েছেন, শিশুর পরিবার সেটাকে নির্যাতন হিসেবে দেখেছে, আর একজন ওয়াজকারী সেটাকে তুচ্ছ করে দিচ্ছেন। অথচ শিশুনির্যাতনের মামলায় শিশুর অনুভূতি, পরিবারের আতঙ্ক আর অভিযোগের গুরুত্বই সবার আগে আসার কথা। কোনটা সামান্য আদর আর কোনটা নির্যাতন, এই রায় দেওয়ার এখতিয়ার আদালতের, তদন্তকারী সংস্থার, দরকার হলে বিশেষজ্ঞের।
মঞ্চে দাঁড়িয়ে “তো কি হইসে” বলে দেওয়ার অধিকার কারও নেই। একজন ধর্মীয় বক্তার কথা হাজার হাজার মানুষ শোনে। তিনি যখন এমন কথা বলেন, তখন তাঁর শ্রোতারা শিখে নেয় যে এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর কিছু নেই। বাচ্চা মেয়ে বা ছেলের গায়ে অনাকাঙ্ক্ষিত হাত পড়লে বাবা-মা যদি ভাবতে শুরু করেন যে চুপ থাকাই নিরাপদ, তাহলে ক্ষতিটা শুধু এই এক শিশুর হয় না।
এরপর আসে প্রতিবাদ জানানো অভিভাবককে নিয়ে বলা কথা। “এরে যদি দশ বার হত্যাও করি, তাও আমার রাগ মিটবেনা”, আবার চব্বিশ ঘণ্টার আলটিমেটাম, না হলে মাঠে নামা, আর শাহজালাল রুমির পিটুনির বিবরণ দিয়ে বলা যে “ভাষা নাই”। এখানে একটা সহজ প্রশ্ন আছে। যাঁর অভিযোগ, তিনি নিজে একটা আইনসম্মত পথেই গিয়েছেন, অর্থাৎ ঘটনাটা প্রকাশ্যে এনেছেন। এখন সেই অভিভাবককে খুনের হুমকি দিলে কি ন্যায়বিচার হয়, নাকি ভবিষ্যতের সব অভিযোগকারীকে একটা বার্তা দেওয়া হয় যে মুখ খুললে মব আপনাকে খুঁজে নেবে? যে সমাজে শিশুর অভিযোগ করতে গেলে মৃত্যুভয় পেতে হয়, সেখানে অপরাধী সবচেয়ে নিরাপদ। আর এই হুমকি এমন একজন দিচ্ছেন, যাঁর কাজই মানুষকে ধৈর্য, ক্ষমা আর আইনের পথ ধরে চলার উপদেশ দেওয়া।
বলাৎকার নিয়ে তাঁর মন্তব্যটা আরও ভয়ংকর। “কোন জায়গা দিয়ে বলাৎকার করসে? কোন জায়গা দিয়ে ধর্ষণ করসে হুজুর? দেখা!” অর্থাৎ প্রমাণ যদি একটা নির্দিষ্ট ধরনের না হয়, তাহলে অভিযোগ বাতিল। এই যুক্তিতে শিশুযৌননিপীড়নের বেশিরভাগ ঘটনাই বাদ পড়ে যায়, কারণ এসব অপরাধ শুরু হয় ঠিক এই ধরনের স্পর্শ, চুমু আর “আদর” দিয়েই, যা বাইরে থেকে নির্দোষ দেখায়। যাঁরা শিশুদের নিয়ে কাজ করেন, তাঁরা বছরের পর বছর ধরে বাবা-মাকে এই সীমারেখাগুলো চিনতে শেখান। আর একজন ওয়াজকারী সেই শিক্ষাকে উল্টে দিয়ে বলছেন, পুরো অপরাধ না ঘটলে কথা বলার কিছু নেই। মাদ্রাসায় বলাৎকারের অভিযোগ এ দেশে নতুন নয়, আর অনেক ঘটনায় ভুক্তভোগীরা সামাজিক চাপে বছরের পর বছর মুখ খোলেননি। এমন বাস্তবতায় এই কথাগুলো অভিযুক্তের পক্ষে সাফাই নয়, ভবিষ্যৎ ভুক্তভোগীর মুখে তালা।
সাংবাদিকদের নিয়ে তাঁর কথাও একই ধারার। যিনি ক্যামেরা নিয়ে দৌড় দিয়েছেন, তাঁর সম্পর্কে বলা হয়েছে, তিনি দৈনিক তিনটা মেয়ের সঙ্গে শোয়। প্রশ্ন সোজা: এই তথ্য তিনি পেলেন কোথায়? কোনো প্রমাণ দেননি, নামও না, শুধু একটা গোটা পেশার মানুষের চরিত্রে কাদা ছুড়েছেন। ইসলামেই কারও সম্পর্কে ব্যভিচারের অভিযোগ প্রমাণ ছাড়া তোলা গুরুতর অপরাধ বলে গণ্য, কুরআনে এর জন্য কঠিন শাস্তির কথা আছে। আলেম পরিচয়ে যিনি মঞ্চে ওঠেন, তাঁর তো এই বিধান সবচেয়ে ভালো জানার কথা। তার ওপর এটা যুক্তিও নয়। সাংবাদিক যদি সত্যিই চরিত্রহীন হন, তাতে হুজুরের অভিযোগ মিথ্যা হয়ে যায় না। ঘটনা সত্য কি না, সেটা যাচাই হবে প্রমাণে, বক্তার ঘৃণায় নয়। আবার বলাৎকারকে ঢাকতে গিয়ে “সাংবাদিকরা তো দৈনিক তিনটা মেয়ে…” বলাটা দুই ধরনের সম্পর্ককে এক পাল্লায় মাপা। সম্মতির সম্পর্ক আর শিশু বা কিশোরের ওপর জোর খাটানো একই জিনিস নয়, এটা বোঝার জন্য ধর্মীয় পাণ্ডিত্য লাগে না, সাধারণ বিবেকই যথেষ্ট।
“পতিতালয়ে গিয়ে ধরস না কেন” কথাটাও একই রকম। এর মানে দাঁড়ায়, অন্য জায়গায় অপরাধ আছে বলে এই জায়গার অপরাধ নিয়ে প্রশ্ন তোলা চলবে না। এই যুক্তি যে কোনো অপরাধীর হাতে সবচেয়ে সস্তা ঢাল। আর “হুজুররা তোদের কী করসে, লাগাইসে কোনোদিন?” বলে যে প্রশ্নটা ছুড়েছেন, তার উত্তর দিয়েছে খোদ মাদ্রাসাপড়ুয়া শিশুদের নিয়ে প্রকাশিত অসংখ্য সংবাদ। আলেম সমাজের একটা অংশ এই অভিযোগ বছরের পর বছর অস্বীকার করে এসেছে, আর এই মন্তব্য সেই অস্বীকারেরই একটা নতুন রূপ।
এই লোকের সঙ্গে আরেকটা পুরোনো কীর্তি আছে। দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে মেরে ফেলার পর তিনি লাইভে এসে সেই হত্যাকাণ্ডকে বাহবা দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ। পরে সমালোচনা তীব্র হলে ভিডিওটা মুছে ফেলেন। মুছে ফেলা আসলে কোনো অনুতাপ নয়, শুধু প্রমাণ সরানো। তিনি ক্ষমা চাননি, ভুল স্বীকারও করেননি, শুধু ভিডিওটা অদৃশ্য করে দিয়েছেন। একজন মানুষকে ভিড়ের হাতে খুন হতে দেখে আনন্দ প্রকাশ করা আর আজ একজন শিশুর অভিভাবককে একই পরিণতির হুমকি দেওয়া, এই দুটোর মধ্যে ধারাবাহিকতা না দেখাটাই বরং কঠিন।
এত কিছুর পরও লোকটা জেলের বাইরে কেন? হত্যার হুমকি, সাংবাদিকদের চরিত্রহনন, শিশুনির্যাতনকে হালকা করে দেওয়া, একটা পুরোনো হত্যাকাণ্ডে উল্লাস, সব ভিডিও আকারে রয়েছে। অন্য কোনো সাধারণ নাগরিক ফেসবুকে এর অর্ধেক লিখলে এতদিনে টুনটুনি অনুভূতিতে আঘাতের দায়ে তাঁর নামে মামলা হয়ে যেত। বিএনপি এখন ক্ষমতায়, পুলিশ তাদের অধীনে। জামায়াতে ইসলামী সংসদে ক্ষমতার ভাগীদার। দুই পক্ষই ভোটের হিসাবে মাদ্রাসা আর ওয়াজ মাহফিলের বিশাল শ্রোতাকে হাতে রাখতে চায়। এই হিসাবের কারণেই কি আইন এখানে অনুপস্থিত? ইসলামি সংগঠনগুলো, মাদ্রাসা বোর্ডের কর্তারা আর নামী মুফতিরা ছোটখাটো বিষয়ে ফতোয়া আর বিবৃতিতে ভরিয়ে দেন, অথচ একজন শিশুর পক্ষে একটা পরিষ্কার বাক্য বলতে তাঁদের গলা শুকিয়ে যায়। যে আলেমরা অশ্লীলতা আর অনৈতিকতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে সরব, তাঁদের কাছে একটা ছয় বছরের শিশুর নিরাপত্তা কি অপ্রাসঙ্গিক বিষয়?
ধর্মের অবমাননা আসলে কোথায় হচ্ছে, সেটা ভেবে দেখার সময় এসেছে। যিনি ধর্মের নামে গালি দেন, হুমকি দেন, নির্যাতনের শিকার শিশুর পরিবারকে খুনের ভয় দেখান আর তারপর ওয়াজের মঞ্চে উঠে নীতির কথা শোনান, তিনি ইসলামের আলো ছড়াচ্ছেন না। তিনি ইসলামকে মানুষের ঘৃণার জায়গায় নিয়ে যাচ্ছেন। আর যাঁরা জানেন এটা ঘটছে অথচ চুপ আছেন, তাঁরা সেই ঘৃণার শরিক। তবে এটা নিশ্চিত যে, জাহান্নামের উদ্বোধন যদি কাউকে দিয়ে হয়, তাহলে সেটা এই ধরনের লোকদের দিয়েই হবে।
আরো পড়ুন

