Share
বাংলাদেশে ধর্ম নিয়ে ব্যবসায়ী ও উগ্রপন্থী মোল্লাদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং কুখ্যাত শরীয়াপন্থি রাজনীতির বিরুদ্ধে জনগণের মনোভাব দ্রুততার সাথে বদলে যাচ্ছে। ধর্মের দোহাই দিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে দেওয়া এবং মাদরাসা-মক্তবকেন্দ্রিক স্বার্থ হাসিলের যে প্রথা মোল্লাশ্রেণি বছরের পর বছর টিকিয়ে রেখেছিল, জনগণ আজ তা স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করছে। সালাহুদ্দিন মাসউদের মতো সুবিধাভোগী মোল্লাদের বিতর্কিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট এবং সেখানে সাধারণ নেটিজেনদের গণপ্রতিরোধের মাধ্যমে এই সত্যটি উন্মোচিত হয়েছে।
সম্প্রতি ‘ইসলামিক নেতৃত্ব বা হুজুরদের দিকনির্দেশনা না থাকলে সমাজ অচল হয়ে পড়বে’—এমন মনোভাব প্রকাশ করে একটি ফেসবুক পোস্ট দেন সালাহুদ্দিন মাসউদ। সেখানে তিনি সাধারণ মানুষকে কটাক্ষ করে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, মাদরাসা-মক্তব ও হুজুরদের অনুপস্থিতিতে সমাজ বিপদে পড়বে। তবে প্রতিক্রিয়া হয়েছে ঠিক উল্টো। চার হাজার একশটিরও বেশি কমেন্টে জনগণ এক বাক্যে হুজুর ও মোল্লাদের একচেটিয়া দখলদারিত্বমুক্ত একটি নতুন বাংলাদেশকে স্বাগত জানিয়েছে। নেটিজেনদের সিংহভাগই মন্তব্য করেছেন যে, ধর্মীয় শিক্ষা পরিবার নিজ দায়িত্বে গ্রহণ করবে এবং এর মাধ্যমে কোমলমতি বাচ্চারা উগ্রবাদের ঝুঁকিমুক্ত হয়ে নিরাপদে বেড়ে উঠবে। মোল্লাশ্রেণি যে ভেবেছিল হুজুরবিহীন সমাজের কল্পনায় মানুষ আতঙ্কে কান্নাকাটি করবে, তার বিপরীতে জনগণ মন্তব্য করেছে: “আলহামদুলিল্লাহ, কী সুন্দর ও নিরাপদ দেশ হবে!” এটি কেবল একটি ফেসবুক পোস্টের প্রতিক্রিয়া নয়, বরং মোল্লা ও ধর্মব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে এক অনানুষ্ঠানিক জনমত জরিপ।
জনগণের এই ক্ষোভ মূলত ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে নয়, বরং ধর্মের ওপর মোল্লা ও দালাল শ্রেণির অন্যায় ঠিকাদারির বিরুদ্ধে। শিক্ষা ও পারিবারিক সংস্কৃতির মাধ্যমে ধর্মচর্চার সিদ্ধান্ত জনগণ এখন নিজেদের হাতেই রাখতে চায়। এতদিন ধরে সালাফিপন্থী ও জামায়াত-শিবিরের মতো মৌলবাদী দলগুলো ধর্মকে যেভাবে ভয় দেখানোর হাতিয়ার বানিয়েছিল, সচেতন জনগণ আজ তা ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে।
শুধু বাংলাদেশেই নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্ব জুড়েই এই উগ্রপন্থী মোল্লাদের বিরুদ্ধে জনবিস্ফোরণ ও সুনির্দিষ্ট পরিবর্তনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। মনসুর মোয়াদেলের দীর্ঘমেয়াদী আন্তর্জাতিক গবেষণা (২০০০-২০২০) অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের কর্তৃত্ববাদী শাসকরা গণতান্ত্রিক দাবি দমন করলেও সাধারণ মানুষ শরিয়াপন্থি রাজনীতির কবল থেকে বেরিয়ে উদারনৈতিক মূল্যবোধের দিকে ঝুঁকে পড়েছে:
মিশর: ২০১১ সালে যেখানে ২৫ শতাংশ মানুষ ইসলামিক সরকারকে “খুব ভালো” ভাবত, ২০২০ সালে তা কমে ১৬ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে শরিয়াহ আইনকে “খুব গুরুত্বপূর্ণ” মনে করা মানুষের হার ২৮ শতাংশ থেকে ১৮ শতাংশে নেমেছে। উল্টোদিকে, ধর্ম ও রাজনীতি পৃথকীকরণের সমর্থন ২০০৭ সালের ৪৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২০ সালে ৮১ শতাংশে এবং পশ্চিমা ধাঁচের শাসনব্যবস্থার সমর্থন ৩০ শতাংশ থেকে ৮২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
ইরাক: ২০০৪ সালে ইসলামিক সরকার ও শরিয়াহ আইনের পক্ষে থাকা যথাক্রমে ৩০ ও ৩৪ শতাংশের হার ২০১১ সালে নেমে দাঁড়িয়েছে ১৫ ও ১৪ শতাংশে। এছাড়া ২০০৪ সালে মাত্র ২৩ শতাংশ মানুষ নিজেকে প্রথমে “ইরাকি” পরিচয় দিত, যা ২০২০ সালে বেড়ে ৬৮ শতাংশে পৌঁছেছে।
সৌদি আরব: শরিয়াহ আইন বাস্তবায়নকে “খুব গুরুত্বপূর্ণ” ভাবা মানুষের হার ২০০৩ সালের ৭৩ শতাংশ থেকে ২০১১ সালে ব্যাপকভাবে কমে ৩৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
তুরস্ক: রাজনৈতিক ইসলামের নিয়ন্ত্রণের মাঝেই মানুষের ধর্মান্ধতা কমেছে। নিজেকে প্রথমে “মুসলিম” ভাবা মানুষের হার ২০০১ সালের ৬৪ শতাংশ থেকে ২০২০ সালে মাত্র ২৪ শতাংশে নেমেছে, এবং “তুর্কি নাগরিক” পরিচয় ৩৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬৩ শতাংশে ঠেকেছে। মসজিদে সপ্তাহে একাধিকবার যাওয়ার হার ১৯ শতাংশ থেকে কমে ১১ শতাংশে নেমে এসেছে।
ইরান: চরমপন্থী মোল্লাতন্ত্রের রাহুগ্রাসে থাকা ইরানে সন্তানদের ধর্মীয় বিশ্বাস থাকা উচিত মনে করা মানুষের হার ৭১ শতাংশ থেকে কমে ৫৫ শতাংশে এসেছে এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা ৫৯ শতাংশ থেকে কমে ৩৬ শতাংশে নেমে এসেছে।
বাংলাদেশেও সালাহুদ্দিন মাসউদের মতো ফতখোর মোল্লাদের প্রতি সাধারণ মানুষের চরম অনাস্থা এবং মধ্যপ্রাচ্যের এই বৈশ্বিক জরিপ একই সত্য ফুটিয়ে তুলছে। মানুষ ধর্মকে ত্যাগ করছে না, কিন্তু জামায়াত-সহ রাজনৈতিক ইসলাম ও উগ্রবাদী মোল্লাদের চাপিয়ে দেওয়া অন্ধ নিয়ন্ত্রণকে ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করছে। দীর্ঘদিন ধরে জামায়াত-শিবির ও প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীগুলো মাদরাসা-মক্তব ও দাওয়াতি কাফেলার অজুহাতে সমাজে যে ভীতি সঞ্চার করত, সচেতন জনগণ এখন তাদের মুখের ওপর জবাব দিচ্ছে—”আমাদের একটি সুন্দর ও উগ্রবাদমুক্ত ভোরের ভয় দেখাবেন না।” মোল্লাদের ফতোয়াবাজি ও একচেটিয়া ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের ইতি টেনে মানুষ আজ নিজেদের স্বাধীন ও সুশীল ভাবমূর্তির দিকেই পা বাড়াচ্ছে।
আরো পড়ুন

