Share
বাংলাদেশে মাদ্রাসাগুলোতেয শিশু নির্যাতন ও বলাৎকারের ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি এখন মহামারি আকার ধারণ করেছে। প্রতি সপ্তাহেই অন্তত ডজনখানেক ঘটনা গণমাধ্যমে আসছে সারাদেশ থেকেই। অথচ প্রতিবারই প্রশ্ন ওঠে কিন্তু উত্তর মেলে না যে কেন মাদ্রাসাগুলোতেই বারবার এমন ঘটনা ঘটছে!
উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের দেখতে হবে এই শিক্ষাব্যবস্থার আদর্শিক ভিত্তির দিকে। যেখানে সাধারণ বিদ্যালয়গুলোতে যৌন নিপীড়ন ঘটলে প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে দায়ী করা হয় সেখানে কওমী মাদ্রাসার ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও গভীর। কারণ এই মাদ্রাসাগুলোর মূল আদর্শিক উৎস যে বইগুলোতে নিহিত সেখানেই যৌন বিকৃতির প্রতি এক ধরনের আধ্যাত্মিক বৈধতা দেওয়া হয়েছে।
প্রথমেই আসা যাক “তাযকিরাতুর রশীদ” গ্রন্থের কথা। দ্বিতীয় খণ্ডের ২৮৭ পৃষ্ঠায় দেওবন্দের সহপ্রতিষ্ঠাতা মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী স্বয়ং নিজের মুখে বলছেন যে তিনি স্বপ্নে দেখেছেন তারই সহকর্মী ও দারুল উলুম দেওবন্দের অপর প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা মুহাম্মদ কাসেম নানুতুবী নারীর বেশে তার সামনে এসেছেন এবং তাদের মধ্যে বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে। এরপর গাঙ্গুহীর উদ্ধৃতি “স্বামী-স্ত্রী যেমন একে অন্যকে ফায়দা দেয়, আমরাও পরস্পর ফায়দা পাচ্ছিলাম।” এখানে “ফায়দা” শব্দটি আরবি “ইস্তিমতা” বা “মুত’আ” থেকে আগত যার অর্থ যৌন উপভোগ। অর্থাৎ গাঙ্গুহী স্বপ্নে তার সহকর্মীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের কথা বলছেন এবং সেটাকে আধ্যাত্মিক লাভ হিসেবে উপস্থাপন করছেন।
সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এই ঘটনা কোনো সমালোচনার জন্ম দেয়নি বরং দেওবন্দের অন্দরমহলে এটি “কারামত” বা আধ্যাত্মিক অলৌকিকত্ব হিসেবে প্রচারিত হয়েছে। “তাযকিরাতুর রশীদ” গ্রন্থের লেখক মাওলানা আসগর হুসাইন দেওবন্দি এই ঘটনাকে গাঙ্গুহীর আধ্যাত্মিক উচ্চতার প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ যে ঘটনা একজন সাধারণ মানুষের চোখে সুস্পষ্ট সমকামী কামনার প্রকাশ সেটি এই ধারার আলেমদের কাছে হয়ে গেছে পুণ্যের বিষয়।
এবার আসা যাক আশরাফ আলী থানভীর “হেকায়েতে আউলিয়া” গ্রন্থের সেই ঘটনায়। এই গ্রন্থে থানভী লিখেছেন একবার এক বিশাল সমাবেশে ছাত্রদের সামনে রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী মাওলানা কাসেম নানুতুবীকে খাটে শুয়ে পড়তে বলেন। নানুতুবী প্রথমে লজ্জা পান ও অস্বীকৃতি জানান। কিন্তু গাঙ্গুহী জোর করলে তিনি শুয়ে পড়েন। এরপর গাঙ্গুহী তার পাশে শুয়ে তার বুকের ওপর হাত রাখেন “ঠিক সেভাবেই যেভাবে একজন আশিক তার প্রেমিকার বুকের ওপর হাত রাখে হৃদয়ের সন্তুষ্টির জন্য।” যখন নানুতুবী প্রতিবাদ করে বলেন লোকজন কী বলবে তখন গাঙ্গুহীর উত্তর “লোকজনের যা ইচ্ছা তা বলতে দাও।”
এই ঘটনার ভাষ্য অত্যন্ত স্পষ্ট। প্রকাশ্যে ছাত্রদের সামনে দুই পুরুষের মধ্যে এই ধরনের শারীরিক ঘনিষ্ঠতা এবং তাতে একজন পক্ষের সুস্পষ্ট অস্বস্তি সত্ত্বেও জোর করা। এটি যদি আধুনিক আইনের চোখে দেখি তাহলে এটি যৌন নিপীড়নেরই একটি রূপ। কেউ অস্বীকৃতি জানালেও জোর করে তার শরীর স্পর্শ করা এবং তাতে কোনো অপরাধবোধ না থাকা বরং একে আধ্যাত্মিক শিক্ষা হিসেবে প্রচার করা। আশরাফ আলী থানভী এই ঘটনাকে তার বইয়ে “মাশায়েখদের ভালোবাসার নমুনা” হিসেবে লিখেছেন যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
এবার তৃতীয় প্রমাণটি দেখি। “আশরাফুস সাওয়ানেহ” প্রথম খণ্ডের ৬৪ পৃষ্ঠায় থানভীর নিজের খলিফা খাজা আজিজুল হাসান গৌরী লিখেছেন যে তিনি একবার তার দাঈ থানভীকে বলেছিলেন “আমার একটি অদ্ভুত আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। আমি যদি নারী হতাম তাহলে আপনাকে বিয়ে করতে পারতাম।” উত্তরে থানভী বলেন “এই ভাবনার জন্য তুমি সওয়াব পাবে।”
এটি কোনো সাধারণ কথাবার্তা নয়। একজন ছাত্র তার দাঈয়ের প্রতি তার যৌন আকর্ষণের কথা স্বীকার করছে। “আমি যদি নারী হতাম তাহলে আপনাকে বিয়ে করতাম” এই বাক্যটির অর্থ অত্যন্ত স্পষ্ট। এখানে বিবাহ মানে যৌন সম্পর্কের বৈধতা। অর্থাৎ ছাত্রটি বলছে সে তার দাঈয়ের সাথে যৌন সম্পর্ক করতে চায় যদি সে নারী হতো। আর পীর সাহেব তাতে সায় দিয়ে বলছেন এই ভাবনা পুণ্যের কাজ। একজন সুস্থ মানসিকতার শিক্ষকের উচিত ছিল এমন মন্তব্য শুনে ছাত্রকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো বা অন্তত এই ধরনের চিন্তাকে নিরুৎসাহিত করা। কিন্তু থানভী তাকে উল্টো পুরস্কারের আশ্বাস দিচ্ছেন।
এবার প্রশ্ন হলো এই তিনটি ঘটনা থেকে আমরা কী শিক্ষা পাই। প্রথমত, দেওবন্দের শীর্ষস্থানীয় তিনজন নেতা যাদের একজন স্বপ্নে নিজের সহকর্মীর সাথে যৌন সম্পর্কের কল্পনা করছেন এবং সেটাকে আধ্যাত্মিক লাভ বলছেন। দ্বিতীয়জন প্রকাশ্যে শিষ্যের শরীর স্পর্শ করছেন জোর করে এবং তৃতীয়জন তার শিষ্যের সমকামী আকাঙ্ক্ষাকে পুণ্য বলে আখ্যা দিচ্ছেন। এই তিনজনই দেওবন্দ আন্দোলনের স্তম্ভ। গাঙ্গুহী ও নানুতুবী তো দারুল উলুম দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতাই। আর আশরাফ আলী থানভী হচ্ছেন বিংশ শতাব্দীর দেওবন্দের সবচেয়ে প্রভাবশালী আলেম যাকে অনেকে “হাকিমুল উম্মত” বা “উম্মতের আধ্যাত্মিক চিকিৎসক” বলে ডাকে।
এবার বুঝতে হবে কওমী মাদ্রাসার শিক্ষাব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে। এই মাদ্রাসাগুলোতে ছাত্রদের প্রথম দিন থেকেই শেখানো হয় যে তাদের শিক্ষক ও পীর-মাশায়েখরা “মাহবুব” বা আল্লাহর প্রিয় বান্দা। তারা যা করেন তা সবই সঠিক। তাদের কোনো কাজের সমালোচনা করা মানে আল্লাহর সমালোচনা করা। এই অন্ধ আনুগত্যের সংস্কৃতির মধ্যেই তৈরি হয় নিপীড়নের উর্বর ভূমি। একজন ছাত্র যখন দেখে তার আদর্শ পুরুষদের জীবনীতেই সমকামী সম্পর্ক বা তার প্রতি সহানুভূতি পুণ্য হিসেবে স্বীকৃত তখন একজন শিক্ষকের পক্ষে ছাত্রকে যৌন নিপীড়ন করা নৈতিকভাবে কঠিন কিছু নয়। কারণ তার কাছে এটা “মাশায়েখদের সুন্নত” বা “পীরের ভালোবাসার প্রকাশ” হিসেবে যুক্তিযুক্ত হয়ে যায়।
অধিকন্তু কওমী মাদ্রাসাগুলোর পাঠ্যক্রমে যৌন শিক্ষা বা শিশু সুরক্ষা বিষয়ক কোনো কিছুই নেই। বরং “কিতাবুল বুয়ু” বা কেনাবেচার অধ্যায়ে দাসীদের সাথে যৌন সম্পর্কের বৈধতা শেখানো হয়। অথচ শিশু সুরক্ষা, সহমতের ভিত্তিতে যৌন সম্পর্ক, যৌন নিপীড়ন কী এবং তা থেকে বাঁচার উপায় এসব নিয়ে একটি অধ্যায়ও নেই। এর ফলে ছাত্ররা জানেই না যে তাদের সাথে যা ঘটছে তা অপরাধ এবং এর বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদের অধিকার আছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই মাদ্রাসাগুলোর জবাবদিহিতার অভাব। কওমী মাদ্রাসাগুলো সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে নয় বরং “বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া কওমিয়া” নামক একটি বেসরকারি বোর্ডের অধীনে চলে। এই বোর্ডের নিজস্ব কোনো শিশু সুরক্ষা নীতি নেই, নেই কোনো অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা। বলাৎকারের ঘটনা ঘটলে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ সাধারণত বিষয়টি ধামাচাপা দেয় এবং ভুক্তভোগী ছাত্রকে হয় নির্বাসনে পাঠায় নয়তো চুপ থাকার জন্য চাপ দেয়। যে শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসে তাকে সাধারণত বদলি করে অন্য মাদ্রাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয় যেখানে সে আবার নতুন শিকার খুঁজে নেয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী তাদের ক্ষমতার সময়ে কওমী মাদ্রাসাগুলোর স্বায়ত্তশাসন আরও বাড়ানোর পক্ষে কাজ করেছে। ২০০১-২০০৬ সালে জামায়াতের প্রভাবে কওমী মাদ্রাসার সনদকে সরকারি স্বীকৃতির সমমান দেওয়ার জন্য অধ্যাদেশ আনা হয় যার ফলে এই মাদ্রাসাগুলো রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতার বাইরে থেকে যায় আরও বেশি। অথচ এই সময়েই মাদ্রাসাগুলোতে শিশু নির্যাতনের ঘটনা বাড়তে থাকে। ইসলামি শিক্ষার নামে যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো চলে সেগুলোতে ইসলামের নামেই শিশুদের নিরাপত্তা বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে আর ধর্মীয় রাজনীতি তার পৃষ্ঠপোষকতা করছে।
মনে রাখতে হবে ইসলামের মূল শিক্ষা কখনোই শিশু নির্যাতন বা যৌন নিপীড়নকে সমর্থন করে না। কুরআন ও হাদিসে শিশুদের প্রতি দয়া, তাদের সুরক্ষা ও শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো ইসলামের এই মানবিক শিক্ষাকে যারা বিকৃত করেছে তারাই আজ ধর্মীয় শিক্ষার অভিভাবকত্ব করছে। রাসূল (সা.) বলেছেন “যে ব্যক্তি আমাদের ছোটদের স্নেহ করে না সে আমাদের দলভুক্ত নয়।” অথচ এই হাদিসের প্রকৃত শিক্ষা কওমী মাদ্রাসার কারিকুলামে অনুপস্থিত।
অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান শুধু এটুকুই নয় যে তারা সন্তানদের কওমী মাদ্রাসা থেকে সরিয়ে আনুক বরং বড় আহ্বান হলো তারা যেন ধর্মীয় শিক্ষার নামে চলা এই অনাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। সন্তানকে কুরআন শেখানো, নামাজ শেখানো, নৈতিকতা শেখানো ভালো কাজ কিন্তু তা এমন প্রতিষ্ঠানে নয় যেখানে সন্তানের শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে। মসজিদে, বাড়িতে, কমিউনিটি সেন্টারে বিকল্পভাবে ইসলামি শিক্ষার ব্যবস্থা করা যেতে পারে যা হবে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও শিশুবান্ধব।
রাষ্ট্রকেও এই বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সকল মাদ্রাসা, তা কওমী হোক বা আলিয়া, সরকারি নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে। শিশু সুরক্ষা নীতি বাধ্যতামূলক করতে হবে। অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য স্বাধীন কমিশন গঠন করতে হবে। যৌন নিপীড়নের অভিযুক্ত শিক্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আর সর্বোপরি মাদ্রাসার পাঠ্যক্রম থেকে ওই সব বিতর্কিত বই বাদ দিতে হবে যেগুলোতে সমকামিতা বা যৌন বিকৃতিকে আধ্যাত্মিকতার নামে বৈধতা দেওয়া হয়েছে।
মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের বলাৎকারের শিকার হওয়ার ঘটনা শুধু একটি আইনি সমস্যা নয় এটি একটি গভীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংকট। যে সমাজের ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থার আদর্শিক উৎসেই যৌন বিকৃতির প্রতি সহানুভূতি আছে সে সমাজের সন্তানরা কখনোই নিরাপদ নয়। ধর্মকে ব্যবহার করে মানুষের ওপর আধিপত্য বিস্তারের এই সংস্কৃতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি। নইলে প্রতি বছরই আরও অসংখ্য শিশু নিপীড়িত হবে আর আমরা প্রশ্ন করতে থাকব কেন এমন হয়।
আরো পড়ুন

