Share
২০২৬ সালের আগস্টে বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে বড় কৌতুকটা হয়ে গেল এই যে, প্রেমের নাটক-সিনেমা বন্ধে আইনি নোটিশ পাঠাচ্ছে সেই মহল, যাদের শাসনামলে ধর্ষণ, বলাৎকার আর নারী নির্যাতনের ফাইলগুলো ধামাচাপা দেওয়াই এখন রাষ্ট্রীয় নীতি।
যে বিএনপি-জামাত জোট ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত ক্ষমতায় থেকে সারাদেশকে জঙ্গিবাদের ল্যাবরেটরি বানিয়েছিল, সেই জোট ২০২৬ সালে এসে নৈতিকতার দোহাই দেবে, এটা কোন যুক্তিতে মানা যায়? ওই সময়টায় তো দেখা গেছে মসজিদ-মাদ্রাসার ভেতরে শিশুদের ওপর অত্যাচার, আর বাইরে বোমা হামলা। সে সব ফাইল আজও খোলা হয়নি। আজ সেই দলগুলোই সমাজ রক্ষার মহামানব সাজার চেষ্টা করছে, ক্লিন ইমেজ বানাতে চাইছে সিনেমা-নাটকের কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ করে।
নাটক-সিনেমায় প্রেম দেখালে নাকি যুবসমাজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, পরকীয়া বাড়ছে, পড়াশোনায় অমনোযোগী হচ্ছে। কিন্তু বাস্তব সমাজে তো দেখা যাচ্ছে, হিজাব পরা মেয়েটা রাস্তায় নিরাপদ না, ধর্ষণের শিকার হলে বিচার পায় না, আর থানায় গেলে তাকেই বলা হয় ঘরের বাইরে কেন গিয়েছিলে। আদালতের রায়ে ধর্ষক ছাড় পেয়ে যাচ্ছে, আর সরকারি দলের নেতারা আদালত চত্বরে মিছিল করছে। এই সমাজে একজন প্রেমের গল্প দেখে অনৈতিক হবে, কিন্তু একজন মোল্লার ফতোয়ায় মেয়েদের লেখাপড়া বন্ধ হবে, সেটা সংস্কৃতি রক্ষার নামে চলে যাবে?
যে সমাজে প্রেমের গল্পের চেয়ে বড় সমস্যা হলো মসজিদের মাইকে বিদ্বেষ ছড়ানো, মাদ্রাসার ভেতরে শিশু ধর্ষণ, আর ধর্মের দোহাই দিয়ে সংখ্যালঘুদের ঘর পোড়ানো। সেখানে প্রেমের নাটক বন্ধ করলে নৈতিকতা ফিরবে, এই বিশ্বাসটা বড়ই নিষ্পাপ। বরং দেখা যাচ্ছে, যারা এসব নোটিশ দিচ্ছে, তারা নিজেরাই তো চরিত্রের বিচারে অপরাধী।
২০২৬ সালের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম এই প্রশাসনিক ফতোয়া। আজ প্রেমের গল্প বন্ধ হবে, কাল গান বন্ধ হবে, পরশু বই বন্ধ হবে, তারপর মেয়েদের ঘরের বাইরে বের হওয়াটাও অপরাধ হবে। যারা নাটক-সিনেমায় প্রেম দেখে সমাজ নষ্ট হওয়ার কথা বলছে, তারা আসলে চায়, মানুষ যেন বাস্তব সমাজের ধর্ষণ, লুটপাট আর নিপীড়নের খবর নিয়ে ভাবতে না পারে।
আসল সত্যটা হলো, এই নোটিশ যারা পাঠিয়েছে, তারা চায় দেশের সাংস্কৃতিক জায়গাটা দখল করতে। কারণ সংস্কৃতিই পারে সমাজের চোখ খুলে দিতে, মেরুদণ্ড সোজা রাখতে। প্রেমের গল্প তো নিছক ছুতা। আসল লক্ষ্য হলো সেই সব শিল্পী, লেখক, নির্মাতার মুখ বন্ধ করা, যারা এখনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন।
তাই এবার প্রেমের সিনেমা বন্ধের দাবি উঠেছে। পরের ধাপে তারা বলবে, প্রেম তো এখনো রাস্তাঘাটে হচ্ছে, মেয়েরা ভালোবাসছে, ছেলেরা প্রেম করছে। তখন কি রাস্তায় টহল দেবে পুলিশের কোরানের পাখি ব্যাটেলিয়ন? নাকি ২০০১-০৬ এর মতো আবারো জঙ্গিরা ফতোয়া দিয়ে জোর করে বিয়ে, তুলে নিয়ে যাওয়া আর অ্যাসিড নিক্ষেপ শুরু করবে?
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই। এদেশে প্রেমের গল্প দেখানো অপরাধ হবে, আর মসজিদের মাইকে জেহাদের ডাক দেওয়া সংস্কৃতি হবে? মাদ্রাসার ভেতরে শিশু বলাৎকার চাপা থাকবে, আর সিনেমা হলে রোমান্টিক ছবি চললে সমাজ ধ্বংস হয়ে যাবে?
বাংলাদেশ কি সত্যিই সিরিয়া, আফগানিস্তান, পাকিস্তানের পথে হাঁটছে? উত্তরটা এখন সময়েরই হাতে। কিন্তু শিগগিরই হয়তো সেটা আর প্রশ্ন থাকবে না, হয়ে যাবে রোজনামচা।
আরো পড়ুন

